মৌসুমি বায়ু কী? বর্ষাকাল কীভাবে আসে, জানুন বৈজ্ঞানিক কারণ

মৌসুমি বায়ু কী এবং কীভাবে তৈরি হয়? দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর আগমন, বর্ষাকাল, বৃষ্টিপাত ও ভারতের আবহাওয়ায় এর প্রভাব জানুন।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

ভারতে বর্ষাকাল শুরু হলেই আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাসে বারবার শোনা যায় ‘মৌসুমি বায়ু’ বা Monsoon-এর কথা। কৃষি, জলসম্পদ, অর্থনীতি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন—সবকিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে মৌসুমি বায়ু। কিন্তু মৌসুমি বায়ু কী? এটি কীভাবে তৈরি হয় এবং কেন প্রতি বছর বর্ষাকাল নিয়ে আসে? এই প্রশ্নের উত্তর জানলে আবহাওয়ার অনেক জটিল বিষয় সহজে বোঝা যায়।

বিজ্ঞানীদের মতে, স্থলভাগ ও সমুদ্রের তাপমাত্রার পার্থক্যের কারণে বায়ুর দিক পরিবর্তন হয়। এই ঋতুভিত্তিক বায়ুপ্রবাহকেই মৌসুমি বায়ু বলা হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের বার্ষিক বৃষ্টিপাতের একটি বড় অংশ এই মৌসুমি বায়ুর উপর নির্ভরশীল।

মৌসুমি বায়ু কী?

মৌসুমি বায়ু বা Monsoon হল এমন একটি বায়ুপ্রবাহ, যা ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের দিক পরিবর্তন করে।

‘Monsoon’ শব্দটি আরবি শব্দ “Mausim” থেকে এসেছে, যার অর্থ ঋতু। প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে বায়ুর গতিপথ বদলে যাওয়ার কারণেই এই নামকরণ।

ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার আবহাওয়ায় মৌসুমি বায়ুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

মৌসুমি বায়ু কীভাবে তৈরি হয়?

গ্রীষ্মকালে সূর্যের তাপে ভারতীয় উপমহাদেশের স্থলভাগ দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে ভারত মহাসাগরের জল অপেক্ষাকৃত ধীরে গরম হয়। ফলে স্থলভাগে নিম্নচাপ এবং সমুদ্রে তুলনামূলক উচ্চচাপ তৈরি হয়।

এই চাপের পার্থক্যের কারণে সমুদ্র থেকে আর্দ্রতাভরা বাতাস স্থলভাগের দিকে প্রবাহিত হয়। এই বায়ুপ্রবাহই দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু নামে পরিচিত।

ভারতে মৌসুমি বায়ু কবে আসে?

সাধারণত প্রতি বছর জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে মৌসুমি বায়ু ভারতের কেরল উপকূলে প্রবেশ করে।

এরপর ধীরে ধীরে এটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

সাধারণ সময়সূচি অনুযায়ী—

  • কেরল: জুনের প্রথম সপ্তাহ
  • পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারত: জুনের মাঝামাঝি
  • পশ্চিমবঙ্গ: জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ
  • দিল্লি ও উত্তর ভারত: জুনের শেষ সপ্তাহ থেকে জুলাইয়ের শুরু
মৌসুমি বায়ু কী? বর্ষাকাল কীভাবে আসে, জানুন বৈজ্ঞানিক কারণ
মৌসুমি বায়ু কী? বর্ষাকাল কীভাবে আসে, জানুন বৈজ্ঞানিক কারণ

মৌসুমি বায়ুর দুটি শাখা

আরব সাগর শাখা

এই শাখা আরব সাগর থেকে আর্দ্রতা সংগ্রহ করে পশ্চিমঘাট, মহারাষ্ট্র, গুজরাট ও উত্তর ভারতের দিকে এগিয়ে যায়।

বঙ্গোপসাগর শাখা

এই শাখা বঙ্গোপসাগর থেকে জলীয়বাষ্প নিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারত, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার এবং উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত ঘটায়।

মৌসুমি বায়ু কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ভারতের প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি কৃষিজমি সরাসরি বর্ষার বৃষ্টির উপর নির্ভরশীল।

ভালো মৌসুমি বায়ু হলে—

  • কৃষি উৎপাদন বাড়ে
  • জলাধার ভরে ওঠে
  • ভূগর্ভস্থ জলের স্তর উন্নত হয়
  • পানীয় জলের সংকট কমে

মৌসুমি বায়ু দুর্বল হলে কী হয়?

যদি মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়, তাহলে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টি হতে পারে।

এর ফলে—

  • খরার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে
  • কৃষিক্ষেত্রে ক্ষতি হতে পারে
  • পানীয় জলের সংকট দেখা দিতে পারে
  • তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে পারে

মৌসুমি বায়ু ও এল নিনোর সম্পর্ক

এল নিনো পরিস্থিতিতে অনেক সময় ভারতের মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে।

ফলে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এই কারণেই আবহাওয়াবিদরা প্রতি বছর এল নিনো ও লা নিনার পরিস্থিতির উপর বিশেষ নজর রাখেন।

মৌসুমি বায়ুর প্রত্যাবর্তন কাকে বলে?

সেপ্টেম্বর মাসের শেষ থেকে অক্টোবরের মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু ধীরে ধীরে ভারত থেকে সরে যেতে শুরু করে।

এই প্রক্রিয়াকে মৌসুমি বায়ুর প্রত্যাবর্তন বা Retreating Monsoon বলা হয়।

এই সময় দক্ষিণ ভারতের কিছু অঞ্চলে আবার বৃষ্টিপাত দেখা যায়।

বিজ্ঞানীরা কীভাবে মৌসুমি বায়ুর পূর্বাভাস দেন?

আবহাওয়া দফতর স্যাটেলাইট, Doppler Radar, সমুদ্রের তাপমাত্রা, বায়ুচাপ এবং বিভিন্ন আবহাওয়া মডেলের তথ্য বিশ্লেষণ করে মৌসুমি বায়ুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে।

ভারতীয় আবহাওয়া দফতর (IMD) প্রতি বছর মৌসুমি বায়ুর আগমন, অগ্রগতি এবং বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা সম্পর্কে পূর্বাভাস প্রকাশ করে।

মৌসুমি বায়ু হল দক্ষিণ এশিয়ার আবহাওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। স্থলভাগ ও সমুদ্রের তাপমাত্রার পার্থক্যের ফলে তৈরি হওয়া এই বায়ুপ্রবাহই প্রতি বছর ভারতে বর্ষাকাল নিয়ে আসে। কৃষি, জলসম্পদ এবং অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ায় মৌসুমি বায়ু সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সম্পর্কিত প্রতিবেদন

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন