এল নিনো কী? ভারতের আবহাওয়ায় এর প্রভাব কতটা, জানুন বিস্তারিত

এল নিনো কী? প্রশান্ত মহাসাগরের এই জলবায়ুগত ঘটনা কীভাবে ভারতের বর্ষা, তাপমাত্রা, কৃষি এবং আবহাওয়াকে প্রভাবিত করে জানুন।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

আবহাওয়া সংক্রান্ত খবরের মধ্যে প্রায়ই শোনা যায় ‘এল নিনো’ (El Niño) শব্দটি। বিশেষ করে বর্ষাকাল, খরা বা তাপপ্রবাহ নিয়ে আলোচনা হলে এই শব্দের উল্লেখ বারবার উঠে আসে। কিন্তু এল নিনো আসলে কী? কেন এটি ভারতের আবহাওয়াকে প্রভাবিত করে? এই প্রশ্নের উত্তর জানাটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী জলবায়ুগত ঘটনাগুলির মধ্যে একটি হল এল নিনো।

বিজ্ঞানীদের মতে, প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে যে জলবায়ুগত পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাকেই এল নিনো বলা হয়। এর প্রভাব শুধু সমুদ্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আবহাওয়ার উপরও পড়ে।

এল নিনো কী?

El Niño একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা, যা মূলত মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রজলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বেড়ে গেলে সৃষ্টি হয়।

স্প্যানিশ ভাষায় “El Niño” শব্দের অর্থ “ছোট ছেলে” বা “ঈশ্বরপুত্র”। দক্ষিণ আমেরিকার জেলেরা প্রথম এই উষ্ণ সমুদ্রস্রোতের নাম দিয়েছিলেন।

সাধারণত প্রতি ২ থেকে ৭ বছর অন্তর এল নিনো দেখা দিতে পারে এবং এটি কয়েক মাস থেকে এক বছরেরও বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে।

এল নিনো কীভাবে তৈরি হয়?

স্বাভাবিক অবস্থায় প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম অংশে উষ্ণ জল জমা থাকে এবং পূর্ব অংশ তুলনামূলক ঠান্ডা থাকে।

কিন্তু কোনো কারণে যখন বাণিজ্যিক বায়ু (Trade Winds) দুর্বল হয়ে যায়, তখন উষ্ণ জল পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

এর ফলে সমুদ্রের তাপমাত্রার ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং শুরু হয় এল নিনো পরিস্থিতি।

এল নিনো ও ভারতের সম্পর্ক কী?

ভারতের আবহাওয়ার সঙ্গে এল নিনোর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বা Monsoon মূলত ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রার উপর নির্ভর করে।

এল নিনো তৈরি হলে অনেক সময় ভারতের বর্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বৃষ্টিপাত কম হয়।

ভারতের আবহাওয়ায় এল নিনোর প্রভাব

১. বর্ষা দুর্বল হতে পারে

এল নিনোর সময় অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টি হয়।

ফলে কৃষি, জলাধার এবং পানীয় জলের উপর প্রভাব পড়তে পারে।

২. তাপমাত্রা বৃদ্ধি

এল নিনো বছরে সাধারণত গরম বেশি অনুভূত হয়।

অনেক এলাকায় তাপপ্রবাহের প্রকোপও বেড়ে যেতে পারে।

৩. খরার ঝুঁকি

যদি দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টিপাত কম হয়, তাহলে খরার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

৪. কৃষিতে প্রভাব

ধান, ডাল, সবজি ও অন্যান্য ফসলের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এল নিনো কি সব সময় খারাপ?

সব সময় নয়।

কিছু অঞ্চলে এল নিনোর কারণে অতিরিক্ত বৃষ্টি বা তুলনামূলক অনুকূল আবহাওয়াও দেখা যেতে পারে।

তবে ভারতীয় উপমহাদেশের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে এল নিনোকে দুর্বল বর্ষার অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হয়।

এল নিনো ও লা নিনার পার্থক্য কী?

এল নিনো লা নিনা
সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় সমুদ্রের তাপমাত্রা কমে যায়
বর্ষা দুর্বল হতে পারে বর্ষা শক্তিশালী হতে পারে
তাপমাত্রা বাড়ে তুলনামূলক শীতল পরিস্থিতি তৈরি হয়
খরার ঝুঁকি বাড়ে অতিবৃষ্টির সম্ভাবনা বাড়ে

বিজ্ঞানীরা কীভাবে এল নিনো পর্যবেক্ষণ করেন?

বিশ্বের বিভিন্ন আবহাওয়া সংস্থা স্যাটেলাইট, সমুদ্র বয়া (Buoy), আবহাওয়া মডেল এবং সমুদ্রের তাপমাত্রার তথ্য বিশ্লেষণ করে এল নিনোর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে।

ভারতের আবহাওয়া দফতর (IMD) এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিও নিয়মিত এল নিনো সংক্রান্ত পূর্বাভাস প্রকাশ করে।

এল নিনো কী? ভারতের আবহাওয়ায় এর প্রভাব কতটা, জানুন বিস্তারিত
এল নিনো কী? ভারতের আবহাওয়ায় এর প্রভাব কতটা, জানুন বিস্তারিত

এল নিনো কি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত?

এল নিনো একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনা। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এর প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে বলে অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন।

বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে তাপপ্রবাহ, চরম আবহাওয়া এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের সঙ্গে এল নিনোর প্রভাব আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

এল নিনো হল প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা পরিবর্তনের ফলে তৈরি হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ুগত ঘটনা, যা ভারতের বর্ষা, তাপমাত্রা এবং কৃষিকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে। তাই আবহাওয়া ও জলবায়ু সম্পর্কে জানতে গেলে এল নিনো সম্পর্কে ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি।

সম্পর্কিত প্রতিবেদন

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

বিজ্ঞাপন

আরও খবর