পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর বিজেপি সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট ঘিরে ছিল প্রবল আগ্রহ। সরকারি কর্মীদের ডিএ বৃদ্ধি, নিয়োগ এবং সামাজিক প্রকল্পের পাশাপাশি জেলার ভিত্তিতে উন্নয়ন পরিকল্পনাও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে এবারের বাজেটে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের লক্ষ্য, উন্নয়নের সুবিধা রাজ্যের প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া। সেই লক্ষ্যেই উত্তরবঙ্গ থেকে সুন্দরবন, জঙ্গলমহল থেকে শিল্পাঞ্চল— প্রায় প্রতিটি জেলার জন্য ঘোষণা করা হয়েছে একাধিক প্রকল্প।
উত্তর ২৪ পরগনায় সুন্দরবন এলাকার নদীভাঙন রুখতে ৬০ কিলোমিটার নদীবাঁধ পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পে ১,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
দক্ষিণ ২৪ পরগনায় সাগরদ্বীপের সঙ্গে যোগাযোগ উন্নত করতে মুড়িগঙ্গা সেতু নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হবে। পাশাপাশি ফলতাকে মডেল ব্লক হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। সুন্দরবনের দ্বীপাঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য আরও ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। কুলপি-সহ একাধিক বন্দরের উন্নয়ন এবং মৎস্যচাষে সহযোগিতার ঘোষণাও রয়েছে।
হাওড়া জেলায় পাটশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে নতুন জুট ক্লাস্টার গড়ে তোলার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
নদিয়ার কল্যাণীতে ১,০০০ থেকে ১,৫০০ একর জমিতে নতুন গ্রিনফিল্ড বিমানবন্দর তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। একইসঙ্গে মায়াপুরকে আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে ১,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে।
পূর্ব বর্ধমানে কালনা ও শান্তিপুরের মধ্যে নতুন সংযোগকারী সেতু নির্মাণে ১,২০০ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
পশ্চিম বর্ধমানে দুর্গাপুর-আসানসোল মেট্রো প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন মেডিক্যাল কলেজ এবং দুর্গাপুর, আসানসোল ও পানাগড় অঞ্চলে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
হুগলির ডানকুনিকে মাল্টিমোডাল লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা হবে। ডানকুনি-সুরাট ফ্রেট করিডর এবং ডানকুনি-মগরা করিডর প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
বীরভূমে ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে চার লেনের সেতু নির্মাণের পাশাপাশি ময়ূরাক্ষী নদীর উপর আরও একটি সেতু তৈরির প্রস্তাব রয়েছে। বক্রেশ্বরে ২,০০০ কোটি টাকার মেগা ফ্লোটিং সোলার প্রকল্পও ঘোষণা করা হয়েছে।
পূর্ব মেদিনীপুরে দাদনপাত্রবাড় এলাকায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। নন্দীগ্রাম ও হলদিয়ার মধ্যে সর্বঋতু উপযোগী সেতু নির্মাণে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
পশ্চিম মেদিনীপুরে ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে ১,২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হবে। ফুলচাষিদের সুবিধার জন্য কোলাঘাটে ইন্টিগ্রেটেড ফ্লাওয়ার মার্কেট হাব তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
ঝাড়গ্রামে ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে আদিবাসী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি ১৬০ একর জমিতে টাইগার সাফারি এবং জীবিকাভিত্তিক উন্নয়ন প্রকল্প চালুর কথাও বলা হয়েছে।
বাঁকুড়ায় নবোদয় বিদ্যালয় গড়ে তোলার প্রস্তাব রয়েছে।
পুরুলিয়ায় অযোধ্যা পাহাড়, মুরগুমা, খয়রাবেড়া ও বরন্তীকে নিয়ে সমন্বিত পর্যটন সার্কিট তৈরি করা হবে। উড়ান প্রকল্পের আওতায় নতুন বিমানবন্দর তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
মালদহে আমচাষিদের আয় বৃদ্ধির জন্য ভ্যালু চেইন, হিট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ও ইন্টিগ্রেটেড প্যাক হাউস তৈরিতে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হবে। পাশাপাশি নতুন বিমানবন্দর তৈরির ঘোষণাও রয়েছে।
মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর এলাকায় নদীভাঙন ও বন্যা মোকাবিলায় ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বিড়ি শ্রমিকদের হাসপাতাল আধুনিকীকরণের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।
দক্ষিণ দিনাজপুরে নতুন মেডিক্যাল কলেজ ও টেক্সটাইল পার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। একইসঙ্গে নতুন বিমানবন্দর তৈরির কথাও বলা হয়েছে।
জলপাইগুড়ি ও শিলিগুড়ির মধ্যে মেট্রো পরিষেবা চালুর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হবে।
আলিপুরদুয়ারে নতুন মেডিক্যাল কলেজ এবং প্রধানমন্ত্রী ধনধান্য কৃষি যোজনা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
কোচবিহার বিমানবন্দরের সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দার্জিলিং ও শিলিগুড়ি অঞ্চলে আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম, ইন্ডোর স্টেডিয়াম এবং টি প্রসেসিং সেন্টার তৈরির ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি উত্তরবঙ্গে একটি এইমস, একটি ক্যানসার হাসপাতাল এবং দার্জিলিংয়ে সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
কালিম্পংয়ে নতুন মেডিক্যাল কলেজ এবং পাহাড়ি ঝরনা পুনরুজ্জীবনের জন্য ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
এছাড়াও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, মালদহ, ঝাড়গ্রাম, পূর্ব বর্ধমান এবং বাঁকুড়ায় নবোদয় বিদ্যালয় গড়ে তোলা হবে। কাঁথি, কালিয়াচক, জঙ্গিপুর, সাগর, তুফানগঞ্জ ও ফলতায় নতুন মহিলা কলেজ স্থাপনের পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকার।
প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটে জেলার ভিত্তিক উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিজেপি সরকার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে— উন্নয়নের সুফল শুধু কলকাতা নয়, রাজ্যের প্রতিটি জেলার মানুষের কাছেও পৌঁছে দেওয়াই তাদের লক্ষ্য।




