চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে ১৭ মৃত্যু: মাইকে ঘোষণা, সংকীর্ণ গেটই কি বিপর্যয়ের কারণ?

উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজো মণ্ডপে পদপিষ্টের ঘটনায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মাইকে ঘোষণা, ভিড়ের চাপ, সংকীর্ণ গেট ও বৃষ্টির ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

মহাসপ্তমীর সন্ধ্যায় উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজো মণ্ডপে ভয়াবহ পদপিষ্টের ঘটনায় অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই বিপর্যয়ের পর প্রাথমিকভাবে ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, মণ্ডপের প্রবেশ ও বেরোনোর পথের পরিসর এবং মাইকে ঘোষণার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, প্রাথমিক পুলিশি তথ্য অনুযায়ী, মণ্ডপে মাইকে ঘোষণা হওয়ার পর দর্শনার্থীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি শুরু হয়। স্বেচ্ছাসেবকদের বাঁশি বাজানোর পর পরিস্থিতি আরও বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠে বলে তিনি জানিয়েছেন।

তবে এই মুহূর্তে মাইকে ঘোষণা বা বাঁশি বাজানোই যে দুর্ঘটনার একমাত্র কারণ, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। পুলিশ ও প্রশাসন একাধিক দিক খতিয়ে দেখছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যেও উঠে এসেছে সংকীর্ণ রাস্তা, বিপুল ভিড়, বৃষ্টি এবং ভিড় সামলানোর ব্যবস্থার ঘাটতির অভিযোগ।

সংকীর্ণ গেট ও বিপুল ভিড়, বাড়ছিল চাপ

স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশের দাবি, চোরবাগান পুজোমণ্ডপে ঢোকার রাস্তার মুখ থেকেই প্রচুর মানুষের ভিড় জমেছিল। প্রবেশপথের কাছে রাস্তা সংকীর্ণ হয়ে যাওয়ায় দর্শনার্থীদের চলাচলে সমস্যা তৈরি হয় বলে অভিযোগ। মণ্ডপ থেকে বেরোনোর গেটও যথেষ্ট প্রশস্ত ছিল না বলে দাবি করেছেন কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী।

প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে, মণ্ডপের বাইরে অপেক্ষারত দর্শনার্থী এবং ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা মানুষের চলাচলের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে একসঙ্গে বহু মানুষ এগোতে থাকলে ধাক্কাধাক্কি ও পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। চোরবাগানের ক্ষেত্রেও প্রবেশ ও বেরোনোর পথের বিন্যাস এবং মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক চোখে পড়েনি এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা কার্যকর ছিল না। তবে এই অভিযোগগুলির সত্যতা এখনও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

মাইকে ঘোষণা ও বাঁশি বাজানো নিয়ে কী বললেন মুখ্যমন্ত্রী?

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রবল ভিড়ের মধ্যে পুজোমণ্ডপে মাইকে একটি ঘোষণা করা হয়েছিল। তার পরেই দর্শনার্থীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি শুরু হয়। ভিড় নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে কেউ বাঁশি বাজিয়েছিলেন বলেও প্রাথমিক পুলিশি তথ্যের ভিত্তিতে তিনি জানিয়েছেন।

মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে এই ঘটনাক্রম উঠে এলেও ঘোষণায় ঠিক কী বলা হয়েছিল, তা কীভাবে দর্শনার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক বা তাড়াহুড়ো তৈরি করেছিল এবং বাঁশি বাজানোর সঙ্গে বিশৃঙ্খলার সম্পর্ক কী—এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনও সামনে আসেনি। তাই ঘোষণাকেই একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করার আগে তদন্তের ফলের অপেক্ষা করা প্রয়োজন।

বৃষ্টিতে পরিস্থিতি কি আরও জটিল হয়ে ওঠে?

প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশের বক্তব্য, ঘটনার সময়ে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে। প্রবল ভিড়ের মধ্যে বৃষ্টি থেকে বাঁচতে বা দ্রুত নিরাপদ জায়গায় পৌঁছতে দর্শনার্থীদের মধ্যে তাড়াহুড়ো শুরু হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিপুল ভিড়ের মধ্যে চলাচলের জায়গা সীমিত থাকলে হঠাৎ মানুষের গতিবিধি বদলে যাওয়া বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তবে চোরবাগানে ঠিক কীভাবে ভিড়ের চাপ তৈরি হয়েছিল, কতক্ষণ ধরে পদপিষ্টের পরিস্থিতি চলেছিল এবং কোন পর্যায়ে উদ্ধারকাজ শুরু হয়, তা নির্দিষ্টভাবে জানতে তদন্তের তথ্য প্রয়োজন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশ পুলিশের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সাহায্য সময়মতো পাওয়া যায়নি বলেও অভিযোগ করেছেন। অন্যদিকে, কলকাতা পুলিশের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ঘটনার পর পুলিশ, দমকল, বিপর্যয় মোকাবিলা দল এবং চিকিৎসাকর্মীদের মোতায়েন করা হয়েছিল। আহতদের কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

দমকলের নিয়ম ও জরুরি গেট নিয়ে অভিযোগ

পুজোমণ্ডপে অগ্নিনিরাপত্তা ও জরুরি পরিস্থিতিতে বেরিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, মণ্ডপে দমকলের নিয়ম যথাযথভাবে মানা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ঘটনার সময়ে জরুরি বেরোনোর গেট বন্ধ ছিল বলেও দাবি উঠেছে।

এই অভিযোগগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সরকারি পরিদর্শন বা তদন্তের চূড়ান্ত তথ্য প্রকাশের আগে সেগুলিকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। জরুরি গেটের অবস্থান, সেটি খোলা ছিল কি না, মণ্ডপে অনুমোদিত প্রবেশ ও বেরোনোর পথ কতগুলি ছিল এবং সেগুলির ব্যবহারযোগ্যতা কেমন ছিল—এসব বিষয় তদন্তে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

পুজোর মতো বড় জনসমাগমে অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমন, ভিড়ের প্রবাহ এবং স্বেচ্ছাসেবকদের দায়িত্ব নির্দিষ্ট থাকা জরুরি। চোরবাগান-কাণ্ডে এই ব্যবস্থাগুলি যথাযথ ছিল কি না, তার উত্তর তদন্ত থেকেই পাওয়া যাবে।

উদ্যোক্তাদের খোঁজ, তদন্তে ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটি

ঘটনার পর পুজোর উদ্যোক্তাদের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত শুরু হয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, উদ্যোক্তাদের কয়েকজনের খোঁজ চলছে। ভিড় নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, জরুরি গেট এবং মাইকে ঘোষণার বিষয়ে তাঁদের কাছে কী তথ্য রয়েছে, তা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

মুখ্যমন্ত্রী তথা পুলিশমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ কারণ খতিয়ে দেখতে ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করা হবে। ফলে শুধু প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নয়, পুলিশি তথ্য, মণ্ডপের নকশা, নিরাপত্তার ব্যবস্থা এবং ঘটনার সময়কার পরিস্থিতিও পর্যালোচনার আওতায় আসতে পারে।

তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনও ব্যক্তি বা সংস্থাকে চূড়ান্তভাবে দায়ী করা ঠিক হবে না। তবে এই বিপর্যয় জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ, জরুরি বহির্গমন এবং পুজো আয়োজনে নিরাপত্তার গুরুত্বকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

চোরবাগান-কাণ্ডে এখন কোন প্রশ্নগুলির উত্তর প্রয়োজন?

প্রথমত, মাইকে ঠিক কী ঘোষণা করা হয়েছিল এবং সেই ঘোষণার পর দর্শনার্থীদের চলাচলে কী পরিবর্তন ঘটেছিল, তা জানা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, প্রবেশ ও বেরোনোর পথের পরিসর এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে কতজন স্বেচ্ছাসেবক ছিলেন, তা যাচাই করতে হবে। তৃতীয়ত, জরুরি গেট খোলা ছিল কি না এবং দমকলের নিরাপত্তা বিধি মানা হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট হওয়া দরকার।

একই সঙ্গে বৃষ্টির সময় ভিড় সামলানোর জন্য কী ব্যবস্থা ছিল এবং বিপর্যয়ের খবর পাওয়ার পর উদ্ধারকাজ কত দ্রুত শুরু হয়েছিল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ ও প্রশাসনের বক্তব্যের মধ্যে যে বিষয়গুলি যাচাই করা বাকি, সেগুলির উত্তর তদন্তের ফলেই মিলবে।

চোরবাগান সর্বজনীনের পদপিষ্টের ঘটনায় ১৭ জনের মৃত্যু এক গভীর শোকের পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল আহতদের চিকিৎসা, মৃতদের পরিবারকে সহায়তা এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ নিরপেক্ষভাবে নির্ধারণ করা। ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় ঠেকাতে কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঘাটতি ছিল, তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়াও জরুরি।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

Advertisementspot_img

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর