কলকাতার দুর্গাপুজোর মানচিত্রে গত কয়েক বছরে পরিচিত নাম হয়ে উঠেছিল চোরবাগান সর্বজনীন। অভিনব থিম এবং দর্শনার্থীদের ভিড়ের কারণে এই পুজো ক্রমশ নজর কেড়েছিল। কিন্তু এ বার মহাসপ্তমীর সন্ধ্যায় পদপিষ্টের ঘটনায় ১৭ জনের মৃত্যুর খবর সামনে আসার পর সেই পুজোই এখন আলোচনার কেন্দ্রে। দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে তদন্তের পাশাপাশি পুজো কমিটির পরিচালনা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং পুলিশের প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
চোরবাগানের পুজোকে ঘিরে বিতর্ক অবশ্য দুর্ঘটনার আগেই শুরু হয়েছিল। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর পুজো কমিটির কর্তৃত্বে পরিবর্তন আসে। পুরনো উদ্যোক্তা জয়ন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের জায়গায় নতুন কমিটি দায়িত্ব নেয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। নতুন কমিটির সঙ্গে বিজেপির একাধিক নেতার যোগ থাকার কথাও সামনে এসেছে। তবে কমিটির পরিবর্তনের সঙ্গে দুর্ঘটনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে, এমন কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো তথ্য এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
পুরনো কমিটির বিদায়, নতুন কমিটির হাতে পুজোর দায়িত্ব
চোরবাগান সর্বজনীন পুজোর উত্থানের সঙ্গে জয়ন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম জড়িয়ে রয়েছে। তিনি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাই কার্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ছিলেন। রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পরে পুজোর দায়িত্ব থেকে তাঁকে সরে যেতে হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এলাকাবাসীর দাবির কথা জানিয়ে নতুন কমিটির হাতে পুজোর পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় বলে দাবি।
নতুন কমিটিতে উত্তর কলকাতা জেলা বিজেপি সভাপতি তমোঘ্ন ঘোষের নাম মুখ্য উপদেষ্টা হিসেবে রয়েছে। জোড়াসাঁকোর বিজেপি বিধায়ক বিজয় ওঝা চেয়ারম্যান এবং দেবদীপ অধিকারী মুখ্য পৃষ্ঠপোষক হিসেবে যুক্ত বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। দেবদীপ অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভাইপো বলেও উল্লেখ রয়েছে।
এই পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়। পুরনো কমিটির সদস্যদের কীভাবে সরানো হয়েছিল, সিদ্ধান্তটি কতটা স্বচ্ছ ছিল এবং নতুন কমিটি কীভাবে দায়িত্ব পেল—সেই প্রশ্নও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা নির্ধারণ করতে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ও নথি যাচাই প্রয়োজন।
খুঁটিপুজো থেকে শিল্পী বদল, বদলে যায় আয়োজনের ধরন
রাজ্যে পালাবদলের পরে পুজোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন জয়ন্ত বন্দ্যোপাধ্যায় বলে অভিযোগ। পুরনো কমিটির তরফে ক্লাবঘরের দেওয়ালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ছবি আঁকানো হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু তাতেও পুজোর দায়িত্ব তাঁর হাতে থাকেনি।
ক্লাবঘরটি জায়গা জবরদখল করে তৈরি হয়েছিল—এমন অভিযোগের ভিত্তিতে কলকাতা পুরসভা সেটি ভেঙে দেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এই ঘটনাও পুজো ঘিরে বিতর্কের অংশ হয়ে ওঠে।
পুজোর খুঁটিপুজো নিয়েও বিরোধ তৈরি হয়েছিল। পুরনো কমিটির খুঁটিপুজোয় সনাতন ধর্মের অপমান করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে নতুন কমিটির তরফে ফের খুঁটিপুজোর আয়োজন করা হয়। সেখানে বিজেপির বর্ষীয়ান কাউন্সিলর মীনাদেবী পুরোহিত উপস্থিত ছিলেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
পুজোর শিল্পীতেও পরিবর্তন আসে। জয়ন্ত বন্দ্যোপাধ্যায় দায়িত্ব দিয়েছিলেন সুব্রত মৃধাকে। নতুন কমিটি শিল্পী হিসেবে নিয়ে আসে সুশান্ত পালকে। তাঁর পরিকল্পনায় তৈরি হয় এ বছরের ‘অরব’ থিম। ইংরেজি ‘বিয়ন্ড সাউন্ড’ ভাবনার সঙ্গে যুক্ত এই থিমে শব্দের পরিচিত পরিসর পেরিয়ে নীরবতার গভীরে পৌঁছনোর ধারণা তুলে ধরা হয়েছিল।
নতুন থিম দর্শনার্থীদের মধ্যে সাড়া ফেলেছিল বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। সমাজমাধ্যমেও পুজোটি নিয়ে আগ্রহ বাড়ছিল। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মণ্ডপে ভিড় জমতে থাকে। শনিবার সন্ধ্যায় বৃষ্টির মধ্যে সেই ভিড়ের চাপ থেকেই ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে।
পুলিশের বক্তব্য ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বৃষ্টির মধ্যে দর্শনার্থীদের ভিড় এবং প্রবেশের জন্য হুড়োহুড়ির কথা উঠে এসেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের কয়েক জন সরু প্রবেশ ও বেরোনোর পথ এবং পর্যাপ্ত আলো না থাকার অভিযোগও করেছেন। তবে ঠিক কোন পরিস্থিতিতে ভিড় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তা তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হতে পারে।
এই ঘটনায় ১৭ জনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। আহতদের হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। দুর্ঘটনার পরে মণ্ডপে দর্শনার্থীদের প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঘটনাটি ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সরু গলি, প্রবেশ ও বেরোনোর পথ নিয়ে অভিযোগ
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, অপরিসর গলির মধ্যে এমন একটি পুজোয় বিপুল ভিড় সামলানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ছিল না। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর দর্শনার্থীদের একাংশ মণ্ডপ থেকে বেরোতে চাইছিলেন, অন্য দিকে প্রবেশপথ দিয়ে মানুষের ঢোকা অব্যাহত ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে সংকীর্ণ জায়গায় চাপ বাড়তে থাকে।
বেরোনোর পথের কাছে কয়েকটি সিঁড়ি এবং অসমতল রাস্তা ছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ভিড়ের মধ্যে কেউ পড়ে গেলে অন্যদের পক্ষে সরে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে—এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলে প্রাথমিক অনুমান। তবে প্রবেশ ও বেরোনোর পথের ব্যবস্থাপনা, দায়িত্বে থাকা কর্মীদের উপস্থিতি এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা ঠিক কী ছিল, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের একাংশ উদ্যোক্তাদের গাফিলতির অভিযোগ তুলেছেন। দুর্ঘটনার সময় পুজো কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্তদের দেখা যায়নি বলেও দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে দায়িত্বে থাকা পুলিশকর্মীদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এই অভিযোগগুলির সত্যতা তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।
নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন, মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ
দুর্ঘটনার পরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী থিম পুজোর মণ্ডপে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সরু গলি ও অন্ধকার মণ্ডপের মতো বিষয়গুলির দিকে নজর দেওয়ার কথা বলেন তিনি। অন্য পুজো মণ্ডপগুলিতেও নিরাপত্তা খতিয়ে দেখার জন্য পুলিশ ও দমকলকে নির্দেশ দেওয়ার কথা জানান।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, যেসব মণ্ডপে নিরাপত্তার ঘাটতি পাওয়া যাবে, সেখানে প্রয়োজনীয় সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত দর্শনার্থীদের প্রবেশ বন্ধ রাখা হতে পারে। এই নির্দেশের লক্ষ্য পুজোর বাকি দিনগুলিতে আরও বড় দুর্ঘটনা এড়ানো এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
তবে চোরবাগানের ক্ষেত্রে অনুমোদন, নিরাপত্তা পরিকল্পনা, প্রবেশ ও বেরোনোর পথের ব্যবস্থা এবং দায়িত্ব বণ্টন সংক্রান্ত নথি খতিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ঘটনার আগে কী ধরনের পরিদর্শন হয়েছিল, কোনও ঘাটতি চিহ্নিত করা হয়েছিল কি না এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল কি না—তদন্তে এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া প্রয়োজন।
কুণাল ঘোষের অভিযোগ, বিজেপির প্রতিক্রিয়া
দুর্ঘটনার পর পুজো কমিটির নিয়ন্ত্রণ বদলকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষের অভিযোগ, পুরনো কমিটিকে জোর করে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। নতুন কমিটির সদস্যদের নাম উল্লেখ করে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেন তিনি। কমিটিতে মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপোর যুক্ত থাকার প্রসঙ্গ তুলে তিনি দেবদীপ অধিকারী, বিধায়ক বিজয় ওঝা এবং বিজেপি নেতা তমোঘ্ন ঘোষের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের দাবিও জানিয়েছেন।
কুণাল ঘোষের বক্তব্য রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য। পুজো কমিটির সদস্য হওয়া বা কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার ভিত্তিতে দুর্ঘটনায় কারও দায় প্রমাণিত হয় না। দায় নির্ধারণের জন্য তদন্তে উঠে আসা তথ্য, নিরাপত্তা সংক্রান্ত নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা জরুরি।
অন্য দিকে, পুজো কমিটির ‘হাইজ্যাক’ সংক্রান্ত প্রশ্নে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই বলে মন্তব্য করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এই ঘটনায় বিজেপির সংশ্লিষ্ট পুজো কমিটির অন্য দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিস্তারিত বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্ঘটনার দায় কার, উত্তর দেবে তদন্ত?
চোরবাগান সর্বজনীন পুজোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ, থিমের কারণে বাড়তে থাকা ভিড় এবং সপ্তমীর সন্ধ্যায় পদপিষ্টের ঘটনা—সব মিলিয়ে একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। কিন্তু এই ঘটনাগুলিকে এক করে কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দায়ী করা এখনই সমীচীন নয়।
দুর্ঘটনার আগে ভিড় সামলানোর পরিকল্পনা কী ছিল, প্রবেশ ও বেরোনোর পথ কতটা নিরাপদ ছিল, বৃষ্টির পরিস্থিতিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং পুলিশ-দমকলের সঙ্গে উদ্যোক্তাদের সমন্বয় কেমন ছিল—এই প্রশ্নগুলির উত্তর তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
উৎসবের আনন্দে মানুষের প্রাণহানির মতো ঘটনা যাতে আর না ঘটে, তার জন্য দায় নির্ধারণের পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাস্তব উন্নতিও জরুরি। চোরবাগানের বিপর্যয় তাই শুধু একটি পুজো কমিটির বিতর্ক নয়; বড় জনসমাগমে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে।




