বিশেষ প্রতিবেদন: পুজোর মরশুমে সাধারণ মানুষের খরচের বোঝা কমাতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রায় দুই কোটি পরিবারের কাছে ভর্তুকির মাধ্যমে চিনি, ময়দা ও সুজি পৌঁছে দেওয়ার বিশেষ রেশন প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এই প্রকল্পে এক কেজি চিনি ৩০ টাকা, এক কেজি ময়দা ১৯ টাকা এবং ৫০০ গ্রাম সুজি দেওয়ার কথা। কিন্তু সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার এই উদ্যোগেই চিনির বরাত বণ্টন ও সরবরাহ নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। সূত্রের দাবি, সুন্দরলাল চোপড়ার ভাগে পড়েছে ১৫ হাজার মেট্রিক টন চিনির বরাত, যার মধ্যে ৮ হাজার মেট্রিক টন এখনও সরবরাহ হয়নি। অন্যদিকে, ন্যাকফ ইন্ডিয়া লিমিটেডকে (NACOF India Limited) ৩,২০০ মেট্রিক টন চিনির বরাত দেওয়া হয়েছে বলে খবর। প্রশ্ন উঠছে, ন্যাকফের তুলনায় সুন্দরলাল চোপড়ার যোগ্যতা কী বেশি ছিল? কোন মাপকাঠিতে তাঁকে এত বিপুল পরিমাণ চিনির বরাত দেওয়া হল?
২০২৬ সালের ১৮ অগস্ট পশ্চিমবঙ্গ অত্যাবশ্যকীয় পণ্য সরবরাহ নিগমের (West Bengal Essential Commodities Supply Corporation Limited) তরফে পুজোর বিশেষ রেশন প্যাকেজের জন্য চিনির দরপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। সূত্রের দাবি, মোট ছ’টি সংস্থা দরপত্র জমা দিয়েছিল। প্রাথমিক পর্যায়ে চারটি সংস্থা বরাত পাওয়ার দৌড়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত ন্যাকফ, শ্রেষ্ঠ প্রোডাক্টস প্রাইভেট লিমিটেড (Sresth Products Pvt Ltd) এবং সুন্দরলাল চোপড়াকে বরাত দেওয়া হয়। এই বরাত বণ্টনে কোন সংস্থার যোগ্যতা কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছিল, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।
সূত্রের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ন্যাকফের বরাতের পরিমাণ ৩,২০০ মেট্রিক টন, শ্রেষ্ঠ প্রোডাক্টসের ১,৮০০ মেট্রিক টন এবং সুন্দরলাল চোপড়ার ১৫ হাজার মেট্রিক টন। এই হিসাব সত্য হলে, বাকি দুই সংস্থার তুলনায় সুন্দরলাল চোপড়ার বরাতের পরিমাণ অনেকটাই বেশি। ন্যাকফের মতো সংস্থাকে যদি ৩,২০০ মেট্রিক টন চিনির দায়িত্ব দেওয়া হয়ে থাকে, তা হলে সুন্দরলাল চোপড়ার সংস্থাকে ১৫ হাজার মেট্রিক টনের বরাত দেওয়ার পিছনে কী যুক্তি ছিল? তাঁর সংস্থার আর্থিক সক্ষমতা, সরবরাহের পরিকাঠামো এবং অতীতের কাজের অভিজ্ঞতা কীভাবে বিচার করা হয়েছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
বরাতের পরিমাণের পাশাপাশি সরবরাহের অগ্রগতি নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। সূত্রের দাবি, সুন্দরলাল চোপড়ার বরাদ্দের মধ্যে ৮ হাজার মেট্রিক টন চিনি এখনও সরবরাহ করা হয়নি। অন্যদিকে, ন্যাকফ ও শ্রেষ্ঠ প্রোডাক্টস মিলিয়ে ৫ হাজার মেট্রিক টন চিনি নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ করেছে বলে জানা গিয়েছে। ন্যাকফের দায়িত্বে ছিল কলকাতা উত্তর ও দক্ষিণ, ব্যারাকপুর, বাঁকুড়া, খড়্গপুর এবং ঝাড়গ্রাম এলাকায় চিনি পৌঁছে দেওয়া। শ্রেষ্ঠ প্রোডাক্টসের দায়িত্ব ছিল মুর্শিদাবাদ জেলা। ওই এলাকাগুলিতে রেশনে চিনির বণ্টন হয়েছে বলে সূত্রের দাবি।
এখানেই সামনে আসছে সুন্দরলাল চোপড়ার পূর্ব অভিজ্ঞতার প্রশ্ন। সূত্রের দাবি, তিনি মালদহ পর্যন্ত চিনি সরবরাহ করেছেন। দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে অতীতে সরকারি খাদ্যসামগ্রী সরবরাহের কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর সংস্থার ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এত বড় বরাত পাওয়ার ক্ষেত্রে অতীতের সরবরাহের রেকর্ড, পণ্য সংগ্রহের ক্ষমতা, পরিবহণ ব্যবস্থা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরবরাহ সম্পূর্ণ করার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। ন্যাকফের তুলনায় সুন্দরলাল চোপড়ার সংস্থার যোগ্যতা বেশি ছিল কি না, তা বুঝতে দরপত্রের মূল্যায়নের মানদণ্ড এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির কাজের রেকর্ড সামনে আসা প্রয়োজন।
চিনির ক্রয়মূল্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দরপত্র সংক্রান্ত তথ্যের উল্লেখ করে কেজিপ্রতি ৫৯ টাকা ৩০ পয়সা দরে চিনি কেনার কথা বলা হচ্ছে। অথচ রেশন গ্রাহকদের কাছে সেই চিনি কেজিপ্রতি ৩০ টাকায় পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে ক্রয়মূল্য, সরবরাহের খরচ এবং সরকারি ভর্তুকির হিসাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাজারদরের তুলনায় ক্রয়মূল্য বেশি হয়ে থাকলে তার কারণ কী, তা জানাও প্রয়োজন। তবে বাজারদর ও সরকারি ক্রয়মূল্যের তুলনা করতে গেলে চিনির মান, পরিবহণ, সরবরাহের শর্ত এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচও বিবেচনায় নিতে হবে।
চিনির পাশাপাশি ময়দা সরবরাহ নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। আকশ ফুড (Akash Food) এবং কেপিসি ফ্লাওয়ার মিল (KPC Flower Mill)-এর মতো সংস্থা ময়দা সরবরাহের দায়িত্ব পেয়েছিল বলে সূত্রের খবর। বিভিন্ন জায়গায় ময়দার গুণমান ঠিক না থাকায় নমুনা বাতিল হয়েছে বলেও অভিযোগ। কোন সংস্থার নমুনা বাতিল হয়েছিল, কতগুলি নমুনা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি এবং তার পরে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ করা হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। খাদ্যসামগ্রীর গুণমান নিশ্চিত করতে নমুনা পরীক্ষার ফল এবং বাতিলের কারণ জানা জরুরি।
ময়দা সরবরাহের ক্ষেত্রে রাধাকৃষ্ণ ফ্লাওয়ার মিলের (Radha Krishna Flour Mill) নামও উঠে এসেছে। সংস্থাটির সঙ্গে বনগাঁর কালীবাবুর যোগসূত্র এবং অতীতে রেশন দুর্নীতির অভিযোগের প্রসঙ্গ সামনে এসেছে। তবে অতীতের অভিযোগের ভিত্তিতে বর্তমান সরবরাহে অনিয়ম হয়েছে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। বর্তমান প্রকল্পে সংস্থার যোগ্যতা, সরবরাহ করা ময়দার নমুনার পরীক্ষার ফল এবং গুণমানের অভিযোগের ভিত্তিতে নেওয়া পদক্ষেপই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
পুজোর বিশেষ রেশন প্যাকেজের উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষকে উৎসবের সময়ে কম দামে খাদ্যসামগ্রী দেওয়া। সেই প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ চিনি কেনা হচ্ছে সরকারি অর্থে। ফলে বরাত বণ্টন, নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ এবং খাদ্যসামগ্রীর গুণমান—প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা জরুরি। একটি সংস্থাকে কত পরিমাণ বরাত দেওয়া হয়েছে, সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তি কী ছিল এবং বরাদ্দ করা পণ্য সময়মতো পৌঁছেছে কি না, তার হিসাব স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা ঘোষণা করেছেন। সেই অবস্থানের প্রেক্ষিতে পুজোর রেশন প্যাকেজে চিনির বরাত ও সরবরাহ নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাব গুরুত্বপূর্ণ। কোনও সংস্থাকে বেশি পরিমাণ বরাত দেওয়া নিজে থেকে দুর্নীতির প্রমাণ নয়। কিন্তু বরাতের ভিত্তি, সরবরাহের ঘাটতি এবং গুণমান নিয়ে অভিযোগের ব্যাখ্যা প্রয়োজন। সরকারি অর্থে পরিচালিত জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া ও সরবরাহের হিসাব প্রকাশ্যে থাকলে সাধারণ মানুষও প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি বুঝতে পারবেন।
এখন মূল প্রশ্ন, ন্যাকফের বরাত ৩,২০০ মেট্রিক টনে সীমিত থাকলেও সুন্দরলাল চোপড়ার সংস্থাকে ১৫ হাজার মেট্রিক টন চিনির বরাত দেওয়া হল কোন যোগ্যতার ভিত্তিতে? তাঁর সংস্থার পূর্ব অভিজ্ঞতা, আর্থিক সক্ষমতা এবং সরবরাহের পরিকাঠামো কীভাবে মূল্যায়িত হয়েছিল? একই সঙ্গে ৮ হাজার মেট্রিক টন চিনি এখনও সরবরাহ হয়নি বলে যে অভিযোগ উঠেছে, তার ভিত্তি কী? এই প্রশ্নগুলির উত্তর দিতে দরপত্রের মূল্যায়ন, চূড়ান্ত বরাতপত্র এবং সরবরাহের হিসাব সামনে আসা প্রয়োজন।




