দুর্গাপুজোর আগে পশ্চিমবঙ্গের শিল্পক্ষেত্রে বড় বিনিয়োগের নজরকাড়া খবর হল পূর্ব মেদিনীপুরের হলদিয়ায় ৬০০০ কোটি টাকার ফেনল ও অ্যাসিটোন উৎপাদন প্রকল্প। হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস লিমিটেডের সহযোগী সংস্থা Adplus Polymers & Chemicals-এর অধীনে তৈরি এই প্রকল্পের উদ্বোধন ১৪ অক্টোবর ২০২৬ নির্ধারিত ছিল বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
প্রকল্পটির গুরুত্ব শুধু বিনিয়োগের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়। ফেনল ও অ্যাসিটোন বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক উপাদান। দেশে এই রাসায়নিকের উৎপাদন বাড়লে দেশীয় শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহে সুবিধা হতে পারে এবং আমদানির উপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন কারখানায় বছরে ৩৪৫ কিলোটন ফেনল এবং ২১৫ কিলোটন অ্যাসিটোন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। অর্থাৎ, বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা যথাক্রমে ৩.৪৫ লক্ষ টন ও ২.১৫ লক্ষ টন।
ফেনল ও অ্যাসিটোন এমন দুই রাসায়নিক, যা বিভিন্ন শিল্পের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। ফেনল ব্যবহার হয় ল্যামিনেট, প্লাইউড এবং বিভিন্ন রাসায়নিক পণ্য তৈরিতে। অন্যদিকে, অ্যাসিটোনের ব্যবহার রয়েছে ওষুধশিল্প, ব্যক্তিগত পরিচর্যার সামগ্রী এবং একাধিক শিল্পক্ষেত্রে।
এই দুই রাসায়নিকের দেশীয় উৎপাদন বাড়লে সংশ্লিষ্ট শিল্পগুলির কাঁচামাল সংগ্রহের বিকল্প বাড়তে পারে। বিশেষ করে পূর্ব ভারতের শিল্পাঞ্চলে স্থানীয় সরবরাহের সুযোগ তৈরি হলে পরিবহণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে উৎপাদন বাড়লেই বাজারদর কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম, জ্বালানির খরচ, চাহিদা এবং সরবরাহের ভারসাম্যও রাসায়নিকের দামের উপর প্রভাব ফেলবে।
ভারতের রাসায়নিক শিল্পে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর অন্যতম লক্ষ্য হল গুরুত্বপূর্ণ শিল্প-উপাদানের আমদানি নির্ভরতা কমানো। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ফেনল ও অ্যাসিটোনের চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মেটাতে ভারতকে বিদেশি সরবরাহের উপর নির্ভর করতে হয়।
হলদিয়ার নতুন প্রকল্প পূর্ণ উৎপাদন ক্ষমতায় পৌঁছলে দেশীয় বাজারে এই রাসায়নিকগুলির সরবরাহ বাড়তে পারে। তাতে আমদানি করা পণ্যের বিকল্প তৈরি হওয়ার পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বাড়ানোর সুযোগ থাকবে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও রাসায়নিকের দামে ওঠানামা হলে আমদানিনির্ভর শিল্পগুলি সমস্যায় পড়তে পারে। দেশীয় উৎপাদন সেই ঝুঁকি কিছুটা সামলাতে সাহায্য করতে পারে। তবে প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে উৎপাদন কতটা বাড়ছে, বাজারে চাহিদা কতটা এবং সংস্থাটি কতটা প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য সরবরাহ করতে পারছে, তার উপর।
বড় রাসায়নিক প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এর আশপাশে অনুসারী শিল্প গড়ে ওঠার সম্ভাবনা। ফেনল ও অ্যাসিটোনকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পণ্য, রেজিন, প্লাস্টিক ও শিল্প-উপকরণ তৈরি করা হয়।
হলদিয়ায় উৎপাদন বাড়লে এই ধরনের পণ্য তৈরির জন্য নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে। সংশ্লিষ্ট শিল্পগুলি স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল সংগ্রহের সুবিধা পেলে উৎপাদন পরিকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও আগ্রহ বাড়তে পারে।
তবে নতুন অনুসারী শিল্প কতগুলি তৈরি হবে, কত বিনিয়োগ আসবে কিংবা কত কর্মসংস্থান হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান এখনও এই প্রতিবেদনের তথ্য থেকে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
প্রকাশিত শিল্প-সংক্রান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রকল্পে ভারতের প্রথম on-purpose propylene উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে, যেখানে Olefin Conversion Technology ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি, দেশে বৃহৎ ফেনল উৎপাদন পরিকাঠামোর অন্যতম হিসেবে প্রকল্পটিকে তুলে ধরা হয়েছে।
এই ধরনের প্রযুক্তি নির্দিষ্ট রাসায়নিক উৎপাদনের ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। ফলে প্রকল্পটি হলদিয়ার পেট্রোকেমিক্যাল পরিকাঠামোর সম্প্রসারণের পাশাপাশি দেশের রাসায়নিক সরবরাহ ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
৬০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ এবং বিপুল উৎপাদন ক্ষমতার কারণে হলদিয়ার এই প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গের শিল্প পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রকল্পের ঘোষিত উৎপাদন ক্ষমতা এবং বাস্তবে নিয়মিত উৎপাদনের পরিমাণ এক বিষয় নয়।
কারখানাটি কবে পূর্ণ ক্ষমতায় উৎপাদন শুরু করবে, কতটা দেশীয় চাহিদা মেটাতে পারবে এবং আমদানি নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা আগামী দিনে স্পষ্ট হবে।
হলদিয়ার এই বিনিয়োগের বাস্তব সাফল্য নির্ভর করবে উৎপাদন চালু হওয়া, বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সরবরাহ, পরবর্তী শিল্প বিনিয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলিতে কাঁচামালের চাহিদা বৃদ্ধির উপর।




