‘বন্দে মাতরম্’ না গাইলেই কি ফৌজদারি শাস্তির মুখে পড়তে হবে? এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে কেন্দ্রীয় সরকারের জবাব চাইল সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court of India)। মঙ্গলবার কর্নাটকি সঙ্গীতশিল্পী টিএম কৃষ্ণের দায়ের করা মামলার শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ জানায়, ধর্মীয় বিশ্বাস বা বিবেকগত আপত্তির কারণে কেউ জাতীয় গান গাইতে অস্বীকার করলে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি পদক্ষেপ না হওয়াই আদালতের প্রত্যাশা।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চে এই মামলার শুনানি হয়। টিএম কৃষ্ণ ২০২৬ সালের সংশোধিত Prevention of Insults to National Honour Act, 1971-এর সাংবিধানিক বৈধতা এবং সরকারি অনুষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম্’-এর ছয়টি স্তবক গাওয়ার নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করেছেন।
শুনানির শুরুতেই বেঞ্চ স্পষ্ট করে দেয়, ‘জাতীয় গান’ হিসেবে ‘বন্দে মাতরম্’-এর মর্যাদা নিয়ে আদালত কোনও বিতর্কে যেতে চাইছে না। জাতীয় প্রতীক এবং তার সরকারি ব্যবহারের পরিধি নির্ধারণ করা নির্বাচিত সরকারের বিষয় বলেই আদালতের পর্যবেক্ষণ। তবে সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে কোনও নাগরিকের উপর ফৌজদারি শাস্তির বিধান জুড়ে দেওয়া যায় কি না, সেটি বিচার করার অধিকার আদালতের রয়েছে।
এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হয়ে উঠেছে ১৯৮৬ সালের বিজো ইমানুয়েল বনাম কেরল সরকার (Bijoe Emmanuel v. State of Kerala) মামলা। ওই মামলায় ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে জাতীয় সঙ্গীত না গাওয়া তিন পড়ুয়ার পক্ষে রায় দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। তাঁরা জাতীয় সঙ্গীতের সময় সম্মান প্রদর্শন করে দাঁড়িয়েছিলেন, কিন্তু নিজেদের ধর্মীয় বিবেকের কারণে গাননি। আদালত তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণকে সমর্থন করেনি।
মঙ্গলবারের শুনানিতে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী সেই পুরনো রায়ের প্রসঙ্গ টেনে জানান, বিজো ইমানুয়েল মামলার আইনি নীতি এখনও বহাল রয়েছে। সেই নীতির আলোকে ধর্মীয় কারণে কেউ ‘বন্দে মাতরম্’ না গাইলে তাঁকে ফৌজদারি পরিণতির মুখে পড়তে হবে না—এমনটাই আদালত প্রত্যাশা করছে। তবে এটি এখনও চূড়ান্ত রায় নয়; সংশোধিত আইনের ক্ষেত্রে ওই সাংবিধানিক সুরক্ষা কী ভাবে কার্যকর হবে, সেটিই মামলার পরবর্তী পর্যায়ে পরীক্ষা করা হবে।
মামলাটি দায়ের করেছেন বিশিষ্ট কর্নাটকি সঙ্গীতশিল্পী টিএম কৃষ্ণ। তাঁর আবেদনে মূলত আপত্তি তোলা হয়েছে ‘বন্দে মাতরম্’-এর ছয়টি স্তবক গাওয়ার বাধ্যবাধকতা এবং সেই সংক্রান্ত আইনি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। তাঁর পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী এস মুরলীধর আদালতে যুক্তি দেন, গানের পরবর্তী স্তবকগুলিতে হিন্দু দেবদেবীর উল্লেখ রয়েছে। ফলে সম্পূর্ণ গানটি বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি ধর্মীয় স্বাধীনতার সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সংঘাতে আসতে পারে বলে তাঁর বক্তব্য।
কৃষ্ণের আবেদনে সংবিধানের ১৪, ১৫(১), ১৯(১)(এ), ২১ এবং ২৫(১) ধারার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, ‘বন্দে মাতরম্’ নিয়ে কেন্দ্রের নতুন ব্যবস্থা কেবল সরকারি অনুষ্ঠানের প্রোটোকল নির্ধারণ করছে না, বরং নাগরিকদের গানের নির্দিষ্ট অংশে অংশগ্রহণে বাধ্য করার পরিস্থিতি তৈরি করছে।
এদিকে কেন্দ্রের পক্ষে সওয়াল করেন সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা। শুনানিতে তিনি মামলাকারীর যুক্তির বিরোধিতা করেন এবং ‘বন্দে মাতরম্’-এর ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যের সময় ‘নকশাল’ প্রসঙ্গ উঠে আসে। এই মন্তব্যের তীব্র আপত্তি জানান মুরলীধর এবং তা প্রত্যাহারের দাবি করেন। এই বাগ্বিতণ্ডার মধ্যেও বেঞ্চ মামলার মূল আইনি প্রশ্নেই গুরুত্ব রাখে।
নতুন আইনি ব্যবস্থার প্রেক্ষিতেই বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৬ সালের সংশোধনের মাধ্যমে ‘বন্দে মাতরম্’-কেও জাতীয় সম্মানের অবমাননা প্রতিরোধ সংক্রান্ত আইনের আওতায় আনা হয়েছে। ‘বন্দে মাতরম্’ গাওয়া আটকানো বা গান চলাকালীন কোনও সমাবেশে ইচ্ছাকৃত ভাবে বিঘ্ন ঘটানোর ক্ষেত্রে ফৌজদারি শাস্তির বিধান রয়েছে। সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, জরিমানা অথবা দু’টিই হতে পারে।
এখানেই আদালতের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পার্থক্য তৈরি হয়েছে—কেউ গান গাইতে অস্বীকার করছেন, আর কেউ অন্যদের গান গাওয়া আটকাচ্ছেন বা অনুষ্ঠানে বিঘ্ন ঘটাচ্ছেন, এই দুই আচরণকে কি একই চোখে দেখা যাবে? মঙ্গলবারের শুনানিতে বেঞ্চ মূলত প্রথম পরিস্থিতিতে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও বিবেকের অধিকারের সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
আদালত কেন্দ্রকে দুই সপ্তাহের মধ্যে তাদের বক্তব্য জানাতে বলেছে। এই পর্যায়ে কোনও চূড়ান্ত রায় দেওয়া হয়নি। ফলে ‘বন্দে মাতরম্’ না গাওয়া সব পরিস্থিতিতে আইনত অপরাধ নয়—এমন কোনও সর্বজনীন সিদ্ধান্তও এখনও দেয়নি সুপ্রিম কোর্ট। বরং সংশোধিত আইনের ফৌজদারি বিধান এবং Bijoe Emmanuel মামলায় স্বীকৃত অধিকার কী ভাবে পাশাপাশি কার্যকর হবে, সেটিই পরবর্তী শুনানিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে চলেছে।



