বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ তৈরি হয়েছে—বর্ষাকালে আবহাওয়ার খবর দেখলেই প্রায়শই এমন কথা শোনা যায়। কখনও এই নিম্নচাপের জেরে ভারী বৃষ্টি, কখনও আবার ঝোড়ো হাওয়া বা বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়। কিন্তু নিম্নচাপ কী? এটি কীভাবে তৈরি হয় এবং কেন এর প্রভাবে আবহাওয়ার এত বড় পরিবর্তন ঘটে? এই প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি, কারণ ভারতের বর্ষা ও আবহাওয়ার অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক শক্তি হল নিম্নচাপ।
আবহাওয়াবিদদের মতে, বায়ুমণ্ডলের কোনও অঞ্চলে যখন চারপাশের তুলনায় বায়ুচাপ কমে যায়, তখন সেখানে নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়। এই কম চাপের এলাকায় চারদিক থেকে বাতাস প্রবাহিত হতে শুরু করে এবং সেখান থেকেই বৃষ্টি ও ঝড়ের মতো আবহাওয়াগত পরিস্থিতির জন্ম হয়।
নিম্নচাপ কী?
নিম্নচাপ বা Low Pressure Area হল এমন একটি অঞ্চল, যেখানে আশপাশের এলাকার তুলনায় বায়ুচাপ কম থাকে।
প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী, বাতাস সবসময় উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়। ফলে নিম্নচাপের কেন্দ্রে বাতাস জমা হতে থাকে এবং বায়ুমণ্ডলে অস্থিরতা তৈরি হয়।
নিম্নচাপ কীভাবে তৈরি হয়?
সূর্যের তাপে সমুদ্র বা স্থলভাগের কোনও অংশ বেশি উত্তপ্ত হলে সেই অঞ্চলের বাতাস গরম হয়ে উপরে উঠে যায়।
বাতাস উপরে উঠে গেলে নিচের স্তরে চাপ কমে যায়। এই কম চাপের এলাকাই নিম্নচাপ নামে পরিচিত হয়।
ভারতের ক্ষেত্রে বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের উষ্ণ জল নিম্নচাপ তৈরির জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে।
বঙ্গোপসাগরে বারবার নিম্নচাপ তৈরি হয় কেন?
বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বর্ষাকালে তুলনামূলক বেশি থাকে।
উষ্ণ জল থেকে প্রচুর পরিমাণে জলীয়বাষ্প তৈরি হয়। এই আর্দ্রতা ও তাপের মিলিত প্রভাবে বায়ুমণ্ডলে অস্থিরতা সৃষ্টি হয় এবং নিম্নচাপের জন্ম হয়।
এই কারণেই বর্ষাকালে বঙ্গোপসাগরকে নিম্নচাপের আঁতুড়ঘর বলা হয়।

নিম্নচাপ হলে বৃষ্টি হয় কেন?
নিম্নচাপের কেন্দ্রে চারপাশ থেকে আর্দ্রতাভরা বাতাস প্রবেশ করে।
এই বাতাস উপরে উঠে ঠান্ডা হলে জলীয়বাষ্প ঘনীভূত হয়ে মেঘ তৈরি করে। পরবর্তীতে সেই মেঘ থেকে বৃষ্টিপাত শুরু হয়।
নিম্নচাপ যত বেশি শক্তিশালী হয়, সাধারণত বৃষ্টির সম্ভাবনাও তত বাড়ে।
নিম্নচাপ কি সবসময় বিপজ্জনক?
না, সব নিম্নচাপ বিপজ্জনক নয়।
অনেক নিম্নচাপ স্বাভাবিক বর্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বৃষ্টি নিয়ে আসে। তবে কোনও নিম্নচাপ শক্তিশালী হয়ে উঠলে তা গভীর নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে।
তখন ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা বেড়ে যায়।
নিম্নচাপ, গভীর নিম্নচাপ ও ঘূর্ণিঝড়ের পার্থক্য
একটি আবহাওয়াগত ব্যবস্থার শক্তি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেলে তা বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে।
- নিম্নচাপ (Low Pressure Area)
- সুস্পষ্ট নিম্নচাপ (Well Marked Low)
- ডিপ্রেশন (Depression)
- গভীর নিম্নচাপ (Deep Depression)
- ঘূর্ণিঝড় (Cyclonic Storm)
অর্থাৎ প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়ের শুরুই সাধারণত একটি নিম্নচাপ থেকে।
নিম্নচাপের প্রভাবে কী কী হতে পারে?
ভারী বৃষ্টিপাত
নিম্নচাপের সবচেয়ে সাধারণ প্রভাব হল বৃষ্টি।
ঝোড়ো হাওয়া
নিম্নচাপ শক্তিশালী হলে বাতাসের গতিবেগ বৃদ্ধি পায়।
জলাবদ্ধতা
শহরাঞ্চলে দীর্ঘক্ষণ বৃষ্টির ফলে জল জমে যেতে পারে।
বন্যা
নদী ও নিম্নাঞ্চলে বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
বিজ্ঞানীরা কীভাবে নিম্নচাপের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন?
বর্তমানে স্যাটেলাইট, Doppler Radar, সমুদ্র বয়া, আবহাওয়া কেন্দ্র এবং উন্নত কম্পিউটার মডেলের মাধ্যমে নিম্নচাপ পর্যবেক্ষণ করা হয়।
ভারতীয় আবহাওয়া দফতর (IMD) নিয়মিত বুলেটিন প্রকাশ করে নিম্নচাপের অবস্থান, শক্তি ও সম্ভাব্য গতিপথ সম্পর্কে তথ্য জানায়।
নিম্নচাপ হল ভারতের বর্ষা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এটি যেমন প্রয়োজনীয় বৃষ্টি এনে কৃষি ও জলসম্পদকে সমৃদ্ধ করে, তেমনি শক্তিশালী হলে দুর্যোগের কারণও হতে পারে। তাই আবহাওয়ার খবর বুঝতে এবং সতর্ক থাকতে নিম্নচাপ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন।
সম্পর্কিত প্রতিবেদন
-
- ঘূর্ণিঝড় কী? কীভাবে তৈরি হয়, কতটা বিপজ্জনক এবং ঘূর্ণিঝড়ের সময় কী করবেন
- মৌসুমি বায়ু কী? বর্ষাকাল কীভাবে আসে, জানুন বৈজ্ঞানিক কারণ
- লা নিনা কী? ভারতের আবহাওয়ায় এর প্রভাব কতটা, জানুন বিস্তারিত
- এল নিনো কী? ভারতের আবহাওয়ায় এর প্রভাব কতটা, জানুন বিস্তারিত
- কালবৈশাখী কী? কেন হয়, কখন হয় এবং এই ঝড় কতটা বিপজ্জনক?



