বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে নিয়ে শেখ হাসিনার মন্তব্য ঘিরে ঢাকা-দিল্লি কূটনৈতিক টানাপোড়েন নতুন মাত্রা পেল। হাসিনার বক্তব্যের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনও সম্পর্ক নেই—স্পষ্ট জানিয়ে দিল নয়াদিল্লি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে বৈধ বলেও অবস্থান পরিষ্কার করেছে ভারত।
দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস’ ক্লাবে বুধবারের অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফের দাবি করেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের মাস’ ডিসেম্বরেই তিনি দেশে ফিরবেন। পাশাপাশি তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারকে ‘অবৈধ’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর এই বক্তব্য ঘিরেই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় ঢাকা।
শুক্রবার ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল (Randhir Jaiswal) সাংবাদিকদের বলেন, ওই সাংবাদিক সম্মেলনের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনও যোগ নেই। তাঁর কথায়, ৫ অগস্টের অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি সংগঠনের উদ্যোগে হয়েছিল। শেখ হাসিনার বক্তব্যের সঙ্গেও নয়াদিল্লি সব ক্ষেত্রে একমত নয় বলে স্পষ্ট করে দেন তিনি।
হাসিনার কোন মন্তব্যের সঙ্গে ভারত একমত নয়, সেই প্রশ্নের জবাবে রণধীর আরও পরিষ্কার করে জানান, বাংলাদেশের বর্তমান নির্বাচিত সরকার সম্পর্কে শেখ হাসিনা যে মন্তব্য করেছেন, তার সঙ্গে ভারত সরকার সহমত পোষণ করে না। অর্থাৎ ঢাকার বর্তমান সরকার সম্পর্কে নয়াদিল্লির অবস্থান নিয়ে কোনও দ্ব্যর্থতা রাখতে চাইল না বিদেশ মন্ত্রক।
এর আগে হাসিনাকে দিল্লিতে সাংবাদিক বৈঠকের সুযোগ দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ উগরে দিয়েছিল বাংলাদেশ সরকার। বুধবারের অনুষ্ঠানের পর ঢাকার তরফে প্রকাশিত দীর্ঘ বিবৃতিতে অত্যন্ত কড়া ভাষায় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে আক্রমণ করা হয়। তাঁকে ‘দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী’, ‘খুনি’ এবং ‘দুষ্কৃতকারী’ বলে উল্লেখ করা হয়।
শুধু হাসিনা নন, তাঁর দল আওয়ামি লিগ (Awami League)-কেও নিশানা করে ঢাকা। মুক্তিযুদ্ধের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়া দলটিকে ‘মাফিয়া সংগঠন’ বলে কটাক্ষ করা হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে হাসিনা এবং আওয়ামি লিগের আর কোনও জায়গা নেই বলেও বিবৃতিতে দাবি করা হয়।
বাংলাদেশের এই তীব্র প্রতিক্রিয়ার পর দিনই বিষয়টি নিয়ে আরও সরব হন সে দেশের বিদেশ মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তাঁর বক্তব্য, শেখ হাসিনার মন্তব্য ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে। ভারতকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায় কি না।
তবে শুক্রবার নয়াদিল্লির বক্তব্যে সেই চাপের মধ্যেও ভারতের অবস্থান স্পষ্ট হয়ে গেল। ভারত সরকার শেখ হাসিনার রাজনৈতিক মন্তব্যকে সমর্থন করছে না, কিন্তু একই সঙ্গে ঢাকার বর্তমান সরকারকেও বৈধ সরকার হিসেবে বিবেচনা করছে—বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্যে সেই বার্তাই উঠে এসেছে।
এরই মধ্যে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ নজর এখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা তারেক রহমান (Tarique Rahman)-এর সম্ভাব্য সাক্ষাতের দিকে। আগামী মাসে নয়াদিল্লিতে হতে চলা ব্রিকস (BRICS) বৈঠকে তারেককে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন মোদী।
ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীও জানিয়েছেন, তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফরের অপেক্ষায় রয়েছে ভারত। যদিও এখনও পর্যন্ত সফর নিয়ে বাংলাদেশের তরফে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। ফলে হাসিনাকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কের মধ্যেই দিল্লি-ঢাকার কূটনৈতিক সমীকরণ কোন দিকে যায়, সেটিই এখন নজরের বিষয়।



