পশ্চিমবঙ্গের সরকারি কর্মচারীদের জন্য সপ্তম পে কমিশন (7th Pay Commission) গঠনের প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগোল। শুক্রবার নবান্নের তরফে কমিশনের ‘শর্তাবলি ও কার্যপরিধি’ বা Terms of Reference প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে শুধু বেতন কাঠামো নয়, ন্যূনতম বেতন, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, মহার্ঘ ভাতা (DA), বাড়িভাড়া ভাতা, অবসরকালীন সুবিধা এবং কেরিয়ার অ্যাডভান্সমেন্ট—একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নতুন করে পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নতুন সরকারের প্রথম বাজেটেই সপ্তম পে কমিশন গঠনের ঘোষণা করা হয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) এবং অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত (Swapan Dasgupta) সেই ঘোষণা করেন। নবান্নের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ২০২৬ সালের ১৮ মে মুখ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে সপ্তম রাজ্য পে কমিশন গঠনের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়।
এ বার কমিশনের কাজের পরিধি স্পষ্ট করে দিল রাজ্য সরকার। ন্যূনতম বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে পাঁচ সদস্যের পরিবারকে ভিত্তি হিসেবে ধরার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে দৈনিক ৩৪৯০ ক্যালোরি পুষ্টির প্রয়োজনীয়তাকে ন্যূনতম বেতন নির্ধারণের অন্যতম মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করতে বলা হয়েছে। এত দিন ব্যবহৃত ২৭০০ ক্যালোরির পুরনো ভিত্তির বদলে এই নতুন মানদণ্ড কতটা কার্যকর করা যায়, তা খতিয়ে দেখবে কমিশন।
সরকারি কর্মীদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়গুলির একটি হতে পারে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব। বর্তমানে ৩ শতাংশ হারে যে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হয়, সেটিকে অন্তত ৫ শতাংশ করার বিষয়টি কমিশনের বিবেচনায় রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন পে-ম্যাট্রিক্স তৈরির বিষয়েও সুপারিশ দিতে বলা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে রাজ্যের বেতন কাঠামোর ফারাক কমানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। একই ‘পে লেভেল’-এর ক্ষেত্রে সর্বভারতীয় সমতা আনার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি সময়ের সঙ্গে অপ্রচলিত বা অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাওয়া বেতনস্তরগুলিকে একত্রিত করা যায় কি না, তাও পর্যালোচনা করবে কমিশন। এর ফলে ভবিষ্যতে বেতন কাঠামো সংক্রান্ত জটিলতা ও মামলা কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
মহার্ঘ ভাতা বা DA নিয়েও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব। সর্বভারতীয় উপভোক্তা মূল্যসূচক বা AICPI-এর ভিত্তিতে ডিএ নির্ধারণের সংজ্ঞা কী হবে, তা খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট নিয়মে নিয়মিত ডিএ প্রদানের জন্য একটি ‘Standing Order’ চালু করার বিষয়ে কমিশন সুপারিশ করতে পারে।
সপ্তম পে কমিশন ঠিক কোন তারিখ থেকে কার্যকর হবে, সেই বিষয়টিও এখনও আলোচনার পর্যায়ে। পাশাপাশি বাড়িভাড়া ভাতা, পরিবহণ ভাতা, শিশুদের শিক্ষাভাতা, হস্টেল ভর্তুকি-সহ বিভিন্ন ভাতার পরিমাণ ও নিয়ম কেন্দ্রীয় পে কমিশনের কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুনর্বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। বাড়িভাড়া ভাতার ঊর্ধ্বসীমা সংক্রান্ত বিধিনিষেধও নতুন করে খতিয়ে দেখা হতে পারে।
অবসরকালীন সুবিধার ক্ষেত্রেও একাধিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা রাখা হয়েছে। কমিউটেড পেনশন ১১ বছর পর পুনরুদ্ধারের বিষয়টি পর্যালোচনার পাশাপাশি অবসরের সময় ছুটি নগদীকরণ এবং ৩০ জুন অবসর নেওয়া কর্মীদের একটি অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার প্রস্তাবও কমিশনের কার্যপরিধিতে রয়েছে।
ক্যারিয়ার অ্যাডভান্সমেন্ট স্কিমেও বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে ৮, ১৫ এবং ২৪ বছরের তিনটি ধাপের পরিবর্তে ৫, ৮, ১২, ১৮ এবং ২৪ বছরের পাঁচ ধাপের কাঠামো চালুর বিষয়টি বিবেচনা করতে বলা হয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন চাকরিতে থাকা কর্মীদের বেতন ও কেরিয়ার অগ্রগতির ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সরকারি কর্মীদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সুবিধাও কমিশনের আলোচনার বাইরে থাকছে না। স্বাস্থ্য প্রকল্পে ক্যাশলেস বা নগদহীন চিকিৎসা পরিষেবা সম্প্রসারণ, চিকিৎসকদের ফি বৃদ্ধি এবং কর্মী ও পেনশনভোগীদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর বিষয়েও সুপারিশ চাওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, সপ্তম পে কমিশনের কার্যপরিধি শুধুমাত্র বেতন বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বেতন কাঠামো থেকে ডিএ, ইনক্রিমেন্ট, ভাতা, পদোন্নতি, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং অবসরকালীন সুবিধা—সরকারি চাকরির প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দিকই পর্যালোচনার আওতায় আসছে। মুখ্যমন্ত্রী ২০২৭ সালে সপ্তম পে কমিশন কার্যকর করার লক্ষ্য জানিয়েছেন। ফলে এখন কমিশনের সুপারিশ এবং তার ভিত্তিতে রাজ্য সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে কয়েক লক্ষ সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগী।



