বাঁকুড়ায় পুলিশ ইনস্পেক্টর জয়ন্ত পালের মৃত্যুকে ঘিরে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় শহরের কেঠারডাঙা রেলগেট সংলগ্ন এলাকায় আরণ্যক এক্সপ্রেসের ধাক্কায় মৃত্যু হয় ৪১ বছর বয়সি এই পুলিশ আধিকারিকের। এক প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, চলন্ত ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়েছিলেন জয়ন্ত। অন্যদিকে, পরিবারের সদস্যরা আত্মহত্যার সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
জয়ন্ত পাল বাঁকুড়া পুলিশ লাইনে জেলা গোয়েন্দা বিভাগ (District Intelligence Branch বা DIB)-এর ইনস্পেক্টর পদে কর্মরত ছিলেন। শুক্রবার সন্ধ্যায় কেঠারডাঙা রেলগেটের কাছে রেললাইনের ধারে তাঁর দেহ উদ্ধার হয়। প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, আরণ্যক এক্সপ্রেসের ধাক্কায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে। দেহ উদ্ধার করে বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়।
ঘটনার পর একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করা হয়েছে। দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা অথবা অন্য কোনও কারণ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি জয়ন্তের সহকর্মীদের সঙ্গেও কথা বলা হচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে কী জানা গেল? এই ঘটনায় এক প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য সামনে এসেছে। সুদাম শীট নামে ওই ব্যক্তির দাবি, শুক্রবার বিকেলে তিনি স্টেশন মোড় থেকে কেঠারডাঙার দিকে যাচ্ছিলেন। তাড়াহুড়ো থাকায় সাবওয়ে ব্যবহার না করে রেললাইন পার হচ্ছিলেন তিনি। সেই সময় বাঁকুড়া স্টেশনের দিকে আসছিল আরণ্যক এক্সপ্রেস।
সুদামের দাবি, ট্রেনটি কাছে আসার সময় এক ব্যক্তিকে টলতে টলতে লাইনের দিকে যেতে দেখেন তিনি। এরপর ওই ব্যক্তি চলন্ত ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দেন বলে তাঁর বক্তব্য। পরে জানতে পারেন, মৃত ব্যক্তি পুলিশ ইনস্পেক্টর জয়ন্ত পাল। প্রত্যক্ষদর্শীর এই বক্তব্যের সত্যতা তদন্তে যাচাই করা হচ্ছে।
জয়ন্তের মৃত্যুর ঘটনায় কেন উঠছে প্রশ্ন? কেঠারডাঙা রেলগেটের কাছে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পিছনে রয়েছে এলাকার রেলপথের পরিস্থিতি। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বছরখানেক আগে ওই এলাকায় সাবওয়ে তৈরি করে রেল কর্তৃপক্ষ। তার পরেই পুরনো রেলগেটটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সাধারণ মানুষের রেললাইন পারাপারের জন্য সাবওয়ে ব্যবহারের ব্যবস্থা রয়েছে।
কিন্তু জয়ন্তের দেহ উদ্ধার হয় বন্ধ রেলগেট থেকে প্রায় ৫০ মিটার দূরে। তাড়াহুড়োর কারণে তিনি সাবওয়ে ব্যবহার না করে রেললাইন দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন কি না, তা এখনও জানা যায়নি। তদন্তকারীদের কাছেও এই দূরত্ব এবং ঘটনাস্থলের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আত্মহত্যার তত্ত্ব মানতে নারাজ পরিবার: প্রত্যক্ষদর্শী সুদাম শীটের বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন জয়ন্তের পরিবারের সদস্যরা। ঘটনার খবর পেয়ে বাঁকুড়ায় পৌঁছন তাঁর পরিজনেরা। জয়ন্তের জামাইবাবু রাজীব মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ছোটবেলা থেকেই জয়ন্তের সঙ্গে তাঁর বন্ধুর মতো সম্পর্ক ছিল। দু’জনেই স্থানীয় ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
রাজীবের বক্তব্য, জয়ন্তের জীবনে কোনও সমস্যা থাকলে তিনি নিশ্চয়ই তাঁকে জানাতেন। তাই আত্মহত্যার সম্ভাবনা তিনি মনে করছেন না। তবে জয়ন্ত মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি তিনি। এই বিষয়ে জয়ন্তের স্ত্রী আরও তথ্য দিতে পারবেন বলে জানিয়েছেন তাঁর জামাইবাবু।
৪০ দিনের ছুটির পর কাজে ফিরেছিলেন জয়ন্ত: পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রায় ৪৫ দিন আগে বাঁকুড়ায় যোগ দিয়েছিলেন জয়ন্ত পাল। তবে কাজে যোগ দেওয়ার তিন-চার দিনের মধ্যেই অসুস্থতার কারণে টানা ৪০ দিনের ছুটি নেন তিনি। শুক্রবারই ফের থানায় গিয়ে কাজে যোগ দিয়েছিলেন। তার পরেই রেললাইনে তাঁর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
জয়ন্তের সাম্প্রতিক শারীরিক ও মানসিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছেন তদন্তকারীরা। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গেও কথা বলা হচ্ছে। তাঁর মোবাইল ফোনের তথ্যও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
হাওড়ায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাও উঠে আসছে: জয়ন্ত পালের কর্মজীবনে এর আগেও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি হাওড়ার ঘোষপাড়ায় একটি পেট্রল পাম্পের সামনে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। সেই সময় তিনি হুগলির চণ্ডীতলা থানার আইসি পদে কর্মরত ছিলেন। তাঁর বাঁ হাতে গুলি লেগেছিল।
ওই ঘটনার সময় তাঁর সঙ্গে এক মহিলার উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া অন্য জেলায় যাওয়ার বিষয়টি নিয়েও পুলিশি মহলে আলোচনা হয়। পরে তাঁকে সাময়িকভাবে সাসপেন্ড করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সাসপেনশন প্রত্যাহার হলে তিনি আবার পুলিশি দায়িত্বে ফেরেন। খানাকুল, চণ্ডীতলা ও সিঙ্গুর থানায় দায়িত্ব সামলানোর পর বাঁকুড়ায় যোগ দেন।
বর্তমানে জয়ন্ত পালের মৃত্যুর ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, পরিবারের দাবি, তাঁর কর্মজীবনের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এবং মোবাইল ফোনের তথ্য খতিয়ে দেখছে পুলিশ। শনিবার দুপুরে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। প্রাথমিক রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আরও তথ্য মিলতে পারে বলে তদন্তকারীরা আশা করছেন। তবে এখনও পর্যন্ত পুলিশি তদন্তে খুনের কোনও প্রমাণ বা মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসেনি।



