সমুদ্রের উপর তৈরি হওয়া শক্তিশালী ঝড়গুলির মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর হল ঘূর্ণিঝড়। প্রতি বছর বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরে একাধিক ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়, যার প্রভাবে পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু-সহ উপকূলবর্তী বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি দেখা যায়। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় কী, কেন তৈরি হয় এবং এটি কতটা বিপজ্জনক—সেই বিষয়ে অনেকেরই পরিষ্কার ধারণা নেই।
আধুনিক আবহাওয়া প্রযুক্তির কারণে এখন ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস অনেক আগেই পাওয়া যায়। তবুও শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের কারণে প্রাণহানি, ঘরবাড়ি ধ্বংস, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং বন্যার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই ঘূর্ণিঝড় সম্পর্কে সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ঘূর্ণিঝড় কী?
ঘূর্ণিঝড় (Cyclone) হল সমুদ্রের উপর তৈরি হওয়া একটি শক্তিশালী নিম্নচাপজনিত ঝড়, যার কেন্দ্রে বায়ুচাপ অত্যন্ত কম থাকে এবং চারপাশের বাতাস সেই কেন্দ্রের দিকে ঘূর্ণায়মানভাবে প্রবাহিত হয়।
উত্তর গোলার্ধে ঘূর্ণিঝড় সাধারণত ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে ঘোরে। এই ঝড়ের সঙ্গে প্রবল বৃষ্টি, ঝোড়ো হাওয়া, জলোচ্ছ্বাস এবং বজ্রবিদ্যুৎ দেখা দিতে পারে।
ঘূর্ণিঝড় কীভাবে তৈরি হয়?
ঘূর্ণিঝড় তৈরির জন্য কয়েকটি বিশেষ আবহাওয়াগত শর্ত প্রয়োজন হয়।
- সমুদ্রের জলের তাপমাত্রা সাধারণত ২৬.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হতে হয়।
- প্রচুর জলীয় বাষ্প থাকতে হয়।
- বায়ুমণ্ডলে নিম্নচাপ তৈরি হতে হয়।
- বাতাসের গতিবেগ ও দিকের উপযুক্ত পরিবর্তন থাকতে হয়।
সমুদ্রের উষ্ণ জল থেকে বিপুল শক্তি সংগ্রহ করে নিম্নচাপ ধীরে ধীরে গভীর নিম্নচাপ, তারপর ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে।
ঘূর্ণিঝড়ের বিভিন্ন স্তর কী?
ভারতীয় আবহাওয়া দফতর (IMD) ঘূর্ণিঝড়কে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করে।
- Low Pressure Area (নিম্নচাপ)
- Depression (ডিপ্রেশন)
- Deep Depression (গভীর নিম্নচাপ)
- Cyclonic Storm (ঘূর্ণিঝড়)
- Severe Cyclonic Storm
- Very Severe Cyclonic Storm
- Extremely Severe Cyclonic Storm
- Super Cyclonic Storm
ঝড় যত শক্তিশালী হয়, তার ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনাও তত বেড়ে যায়।
ঘূর্ণিঝড় কতটা বিপজ্জনক?
ঘূর্ণিঝড় শুধুমাত্র প্রবল বাতাসের জন্য বিপজ্জনক নয়। এর সঙ্গে একাধিক ঝুঁকি জড়িত থাকে।
- ঘণ্টায় ১০০-২০০ কিলোমিটার বা তার বেশি বেগের হাওয়া
- প্রবল বৃষ্টিপাত
- জলোচ্ছ্বাস
- উপকূল প্লাবিত হওয়া
- গাছ ও বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়া
- ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া
- যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া
অনেক ক্ষেত্রে জলোচ্ছ্বাসই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ঘূর্ণিঝড়ের সময় কী করবেন?
ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কতা জারি হলে দ্রুত প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
- আবহাওয়া দফতরের আপডেট নিয়মিত অনুসরণ করুন।
- প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলুন।
- প্রয়োজনীয় খাবার, পানীয় জল ও ওষুধ মজুত রাখুন।
- মোবাইল ও পাওয়ার ব্যাংক চার্জ করে রাখুন।
- গুরুত্বপূর্ণ নথি জলরোধী ব্যাগে সংরক্ষণ করুন।
- নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র সম্পর্কে আগে থেকে জেনে রাখুন।
- ঘরের দরজা-জানালা শক্তভাবে বন্ধ রাখুন।
ঘূর্ণিঝড়ের সময় কী করা উচিত নয়?
- সমুদ্র বা নদীর ধারে যাওয়া
- ঝড় দেখতে বাইরে বের হওয়া
- বিদ্যুতের তার স্পর্শ করা
- গুজব ছড়ানো বা বিশ্বাস করা
- প্রশাসনের নির্দেশ অমান্য করা
এই ভুলগুলি প্রাণঘাতী হতে পারে।
Cyclone Warning বা ঘূর্ণিঝড় সতর্কতা কী?
ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনা তৈরি হলে IMD বিভিন্ন স্তরের সতর্কতা জারি করে।
- Yellow Alert – সতর্ক থাকুন
- Orange Alert – প্রস্তুত থাকুন
- Red Alert – অবিলম্বে ব্যবস্থা নিন
এই সতর্কতাগুলি মানুষকে আগাম প্রস্তুতির সুযোগ করে দেয়।
পশ্চিমবঙ্গে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব কেন বেশি?
পশ্চিমবঙ্গের উপকূলীয় অবস্থানের কারণে বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব প্রায়শই রাজ্যে পড়ে।
বিশেষ করে দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর, উত্তর ২৪ পরগনা এবং সুন্দরবন এলাকায় ঝুঁকি বেশি থাকে। আমফান, ইয়াস, রেমালের মতো ঘূর্ণিঝড়গুলি এর উদাহরণ।
ঘূর্ণিঝড় একটি শক্তিশালী প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও আধুনিক পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং সচেতনতার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। তাই ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কতা জারি হলে আতঙ্কিত না হয়ে সরকারি নির্দেশ মেনে চলা এবং আগাম প্রস্তুতি নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।



