ভোটের ফল ঘোষণার পর কেটে গিয়েছে দু’দিন। কিন্তু রাজ্যের একের পর এক জেলায় এখনও থামেনি উত্তেজনা, হামলা, ভাঙচুর আর রাজনৈতিক সংঘর্ষের খবর। কলকাতা থেকে ক্যানিং, আসানসোল থেকে খড়্গপুর— বিভিন্ন প্রান্তে অশান্তির আবহের মধ্যেই এবার কড়া বার্তা দিল নির্বাচন কমিশন ও পুলিশ প্রশাসন। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার নির্দেশ দিয়েছেন, কোথাও হিংসা বা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটলেই অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেফতার করতে হবে। একই সঙ্গে রাজ্যের প্রায় সব জেলাতেই সাংবাদিক বৈঠক করে পুলিশ প্রশাসন জানিয়ে দিল, রাজনৈতিক পরিচয় না দেখে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বুধবার সকাল থেকেই রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে নতুন করে উত্তেজনার খবর সামনে আসে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং পশ্চিমের নারায়ণপুর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় ব্যাপক অশান্তির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ, স্থানীয় এক প্রাক্তন তৃণমূল নেত্রী বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর তাঁর নেতৃত্বে এলাকায় হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। তৃণমূল সমর্থকদের বাড়িতে হামলার অভিযোগও উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ গেলে তাদের গাড়িতেও হামলা হয় বলে অভিযোগ। ঘটনায় অন্তত ২০ জনকে আটক করেছে পুলিশ। আটক করা হয়েছে ওই প্রাক্তন নেত্রী রহিমা লস্কর ওরফে বেবিকেও।


এ দিকে, কলকাতার তপসিয়া ও তিলজলায় অশান্তির ঘটনায় জোড়া এফআইআর দায়ের করেছে কলকাতা পুলিশ। ইতিমধ্যেই ৪০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। একই দিনে লালবাজারে সাংবাদিক বৈঠক করে কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দ স্পষ্ট জানান, “গুজবে কান দেবেন না, শান্তি বজায় রাখুন।” তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক মিছিলে জেসিবি ব্যবহার করা যাবে না। কোনও মালিক যদি এই ধরনের কাজে জেসিবি ভাড়া দেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভোট-পরবর্তী অশান্তি রুখতে জেলায় জেলায় পুলিশ প্রশাসনও সক্রিয় হয়েছে। হাওড়ায় জেলাশাসক, পুলিশ কমিশনার ও গ্রামীণ পুলিশ সুপার যৌথ সাংবাদিক বৈঠক করে জানান, জেলার বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। উদয়নারায়ণপুরের খুনের ঘটনায় মূল অভিযুক্ত-সহ দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রতিটি থানায় সর্বদলীয় বৈঠক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দ্রুত পদক্ষেপের জন্য ‘কুইক রেসপন্স টিম’ মোতায়েন রাখা হয়েছে।
উত্তরবঙ্গেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত। কোচবিহারে অশান্তির ঘটনায় ইতিমধ্যেই ২০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জলপাইগুড়িতে গ্রেফতার করা হয়েছে ৩৬ জনকে। অন্য দিকে, বাঁশদ্রোণী থেকে শুভ ঘোষ ওরফে বাবলু নামে এক দুষ্কৃতীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাঁর বাড়ি থেকে আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।


আসানসোল শিল্পাঞ্চলেও পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হচ্ছে। মঙ্গলবার রাত থেকে কুলটি, রানিগঞ্জ, জামুড়িয়া, বারাবনি-সহ একাধিক এলাকায় তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছে। আসানসোল কোর্ট মোড়ে একটি দলীয় কার্যালয়ে আগুন লাগানোর ঘটনায় পাশের একটি কেকের দোকানেও আগুন ছড়িয়ে পড়ে। কয়েকটি এলাকায় দলীয় কার্যালয় গেরুয়া রঙে রাঙিয়ে দেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। যদিও বিজেপি নেতৃত্ব এই সমস্ত ঘটনার দায় অস্বীকার করেছে। তাঁদের দাবি, কিছু দুষ্কৃতী বিজেপির নাম ব্যবহার করে অশান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে।
খড়্গপুর গ্রামীণ বিধানসভা এলাকাতেও তৃণমূল কার্যালয়ে হামলার অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি যাতে আরও অবনতি না হয়, তার জন্য প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার রাজ্যের মুখ্যসচিব, ডিজি, কলকাতার পুলিশ কমিশনার এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর শীর্ষ আধিকারিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন।







