পড়ুয়া নেই, স্কুলও কি বদলাবে? ৪১৩৩ প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ খতিয়ে দেখছে রাজ্য

UDISE+ তথ্যে রাজ্যের ৪১৩৩টি স্কুলে কোনও পড়ুয়া নেই। এবার জমি, ভবন ও পরিকাঠামোর ভবিষ্যৎ খতিয়ে দেখবে জেলাস্তরের কমিটি, পাশাপাশি শিক্ষক বণ্টনেও বদল আসছে।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থায় এবার বড়সড় পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ। সাম্প্রতিক UDISE+ ২০২৫-২৬ তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যে ৪১৩৩টি স্কুলে কোনও পড়ুয়া নথিভুক্ত নেই। অথচ ওই স্কুলগুলির সঙ্গে ১৯,৫০২ জন শিক্ষকের নাম যুক্ত রয়েছে। এই বৈপরীত্যের মধ্যেই পড়ুয়াশূন্য স্কুলগুলির জমি, ভবন এবং অন্যান্য পরিকাঠামোর ভবিষ্যৎ খতিয়ে দেখতে জেলাস্তরে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্কুলশিক্ষা দফতর।

স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন জানিয়েছেন, এই পদক্ষেপের অর্থ কোনওভাবেই একসঙ্গে সব পড়ুয়াশূন্য স্কুল বন্ধ করে দেওয়া নয়। বরং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের বাস্তব পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে কোথাও স্কুল ফের চালু করা সম্ভব কি না এবং কোথাও স্কুলের জমি বা ভবন অন্য জনস্বার্থমূলক কাজে ব্যবহার করা যায় কি না, তা দেখা হবে।

৪১৩৩ স্কুলের পরিকাঠামো নিয়ে কী পরিকল্পনা?

সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী, জেলাশাসকের নেতৃত্বে কমিটি তৈরি করে পড়ুয়াশূন্য স্কুলগুলির সরেজমিনে পরিস্থিতি যাচাই করা হবে। জমি, ভবন, অন্যান্য পরিকাঠামো, শারীরিক অবস্থা এবং স্থানীয় প্রয়োজন—সব দিক খতিয়ে দেখে রিপোর্ট তৈরির কথা বলা হয়েছে।

কোনও স্কুলের ভবন যদি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকে, তাহলে সেটিকে অন্য কোনও জনস্বার্থমূলক কাজে ব্যবহার করা যায় কি না, সেই সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা অন্য কোনও সরকারি কিংবা সামাজিক পরিষেবামূলক কাজে পরিকাঠামো ব্যবহারের সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে।

অর্থাৎ, পড়ুয়াশূন্য স্কুলের জমি বা ভবন সরাসরি পরিত্যক্ত না রেখে স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী তার বিকল্প ব্যবহার করা যায় কি না, সেটাই এখন পর্যালোচনার অন্যতম বিষয়।

সব পড়ুয়াশূন্য স্কুল কি বন্ধ হবে?

এখানেই রাজ্যের অবস্থান স্পষ্ট। কোনও স্কুলে পড়ুয়া কম বা শূন্য হলেই সেটি বন্ধ করে দেওয়া হবে না। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকা, কম জনবসতি কিংবা আশপাশে বিকল্প বিদ্যালয় না থাকার মতো পরিস্থিতি থাকলে স্কুল চালু রাখার সম্ভাবনাই আগে খতিয়ে দেখা হবে।

অন্যদিকে, একই এলাকায় পাশাপাশি একাধিক স্কুল থাকলে এবং তার মধ্যে কোনওটিতে পড়ুয়ার চাপ বেশি থাকলেও অন্যটিতে দীর্ঘদিন কোনও পড়ুয়া না থাকলে, সেই স্কুলগুলির ভবিষ্যৎ নতুন করে পর্যালোচনা করা হতে পারে।

এর ফলে স্কুলের সংখ্যা কমানোই একমাত্র লক্ষ্য নয়। বরং কোথায় স্কুল প্রয়োজন, কোথায় শিক্ষক প্রয়োজন এবং কোথায় অব্যবহৃত পরিকাঠামো রয়েছে—এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনা করে স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনর্বিন্যাস করার পরিকল্পনা রয়েছে।

PPP মডেল নিয়ে কী অবস্থান?

পড়ুয়াশূন্য স্কুলগুলিকে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা PPP মডেলে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন রিপোর্টে এই সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। তবে স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মনের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনও নির্দিষ্ট স্কুলকে এখনও PPP মডেলে দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

অন্যদিকে, জেলাস্তরের যাচাইয়ের মাধ্যমে কোন স্কুল পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব এবং কোন সম্পত্তি বিকল্প জনস্বার্থমূলক কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে, সেই বিষয়ে রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে। ফলে PPP-সহ সম্ভাব্য বিভিন্ন ব্যবহারের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করা হবে।

১৯ হাজার শিক্ষকের তথ্য ঘিরেও প্রশ্ন

পড়ুয়াশূন্য স্কুলের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষকের সংখ্যা নিয়েও বড় প্রশ্ন উঠেছে। UDISE+ ২০২৫-২৬ তথ্য অনুযায়ী, এই ধরনের ৪১৩৩টি স্কুলে ১৯,৫০২ জন শিক্ষকের নাম রয়েছে। একই সময়ে রাজ্যে ৬৭৬৯টি স্কুলে মাত্র একজন করে শিক্ষক রয়েছেন এবং সেখানে মোট ২,২৯,৫৬৯ জন পড়ুয়া পড়াশোনা করছে।

তবে স্কুলশিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, এই তথ্যের একটি অংশে অসঙ্গতি থাকতে পারে। বিশেষ করে কিছু বেসরকারি স্কুল UDISE পোর্টালে শিক্ষকদের তথ্য আপলোড করলেও পড়ুয়াদের তথ্য ঠিকমতো আপলোড করেনি। ফলে সংশ্লিষ্ট স্কুলগুলি ‘শূন্য-ভর্তি’ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। এই ধরনের তথ্যগত অসঙ্গতি দূর করার প্রক্রিয়াও চলছে।

শিক্ষকদের বণ্টনেও বদলের ভাবনা

শুধু পড়ুয়াশূন্য স্কুলের ভবিষ্যৎ নয়, শিক্ষক বণ্টনের ভারসাম্য ফেরানোও সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। যেখানে পড়ুয়া নেই বা শিক্ষকের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি, সেখান থেকে শিক্ষককে শিক্ষক-ঘাটতি থাকা স্কুলে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। পড়ুয়াশূন্য স্কুলের প্রধান শিক্ষকদেরও প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য স্কুলে সরানোর উদ্যোগের কথা জানা গিয়েছে।

একদিকে কয়েক হাজার স্কুলে কোনও পড়ুয়া নেই, অন্যদিকে বহু স্কুলে একজন শিক্ষককে বিপুল সংখ্যক পড়ুয়ার দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে—এই বৈপরীত্য দূর করতেই শিক্ষক বণ্টনে নজর দেওয়া হচ্ছে।

স্কুলশিক্ষামন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, চলতি শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা গেলে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে স্কুলগুলিতে শিক্ষক ঘাটতি অনেকটাই মেটানোর লক্ষ্য রয়েছে। ফলে পড়ুয়াশূন্য স্কুলের পরিকাঠামোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণের পাশাপাশি শিক্ষক নিয়োগ ও বণ্টনের উপরও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থায় এখন দুটি সমান্তরাল সমস্যা সামনে এসেছে—একদিকে পড়ুয়াশূন্য বা কম-ভর্তি স্কুল, অন্যদিকে শিক্ষক-ঘাটতিতে থাকা বিদ্যালয়। রাজ্যের নতুন উদ্যোগে প্রতিটি স্কুলের বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করে কোথাও পুনরুজ্জীবন, কোথাও শিক্ষক পুনর্বণ্টন এবং কোথাও পরিকাঠামোর বিকল্প ব্যবহারের পথ খোঁজা হচ্ছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সেই সমীক্ষার রিপোর্টই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে চলেছে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন