বিশ্বকর্মা পুজো ২০২৬: কবে, কখন পুজো? জানুন তিথি, শুভক্ষণ, নিয়ম ও পৌরাণিক কাহিনি

১৭ সেপ্টেম্বর বিশ্বকর্মা পুজো। কন্যা সংক্রান্তির সময়, পুজোর শুভক্ষণ, যন্ত্রপাতি পুজোর নিয়ম এবং দেবশিল্পী বিশ্বকর্মাকে ঘিরে প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনি জানুন।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

বিশ্বকর্মা পুজো ২০২৬ কবে? ১৭ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার আরাধনা হবে। বাংলা ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩। সংক্রান্তির সময়, পুজোর শুভক্ষণ, নিয়ম এবং বিশ্বকর্মার পৌরাণিক পরিচয় জেনে নিন।

কারখানা, গ্যারাজ, ওয়ার্কশপ থেকে শুরু করে ছোট-বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান—বিশ্বকর্মা পুজোর দিনে যন্ত্রপাতি ও কর্মক্ষেত্র সেজে ওঠে নতুন সাজে। বাঙালির কাছে এই পুজো শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কাজ, কারিগরি দক্ষতা, যন্ত্র এবং পেশার প্রতি শ্রদ্ধার একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য।

- Advertisement -

২০২৬ সালে বিশ্বকর্মা পুজো পড়েছে ১৭ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার, বাংলা ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩। এই দিনই সূর্য সিংহ রাশি থেকে কন্যা রাশিতে প্রবেশ করে, অর্থাৎ কন্যা সংক্রান্তি। পঞ্জিকা অনুযায়ী এই সৌর সংক্রান্তির দিনেই বিশ্বকর্মা পুজো পালিত হয়।
[বিশ্বকর্মা পুজোয় কেন গাড়ি-মেশিনের পুজো হয়? দেবশিল্পীর সঙ্গে যন্ত্রের সম্পর্ক জানুন]
[বিশ্বকর্মা পুজোয় কেন ঘুড়ি ওড়ানো হয়? বাঙালির প্রিয় এই রীতির পিছনে কী ইতিহাস]
[বিশ্বকর্মা আসলে কে? দেবতাদের এই শিল্পীর হাতে তৈরি হয়েছিল কোন কোন স্থাপত্য ও অস্ত্র]

এক নজরে বিশ্বকর্মা পুজো ২০২৬

তারিখ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বৃহস্পতিবার
বাংলা তারিখ: ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩
কন্যা সংক্রান্তি: সকাল ৭টা ৫৮ মিনিট নাগাদ
পুজোর প্রচলিত সময়: সকাল থেকে মধ্যাহ্ন
বিশেষ গুরুত্ব: যন্ত্রপাতি, গাড়ি, কর্মস্থল ও কারিগরি সরঞ্জামের পুজো

বিশ্বকর্মা পুজো ২০২৬ কবে?

২০২৬ সালের বিশ্বকর্মা পুজো নিয়ে কোথাও ১৭ সেপ্টেম্বর, আবার কোথাও ১৮ সেপ্টেম্বরের উল্লেখ দেখা যাচ্ছে। এর কারণ বিভিন্ন বাংলা পঞ্জিকায় গণনার পার্থক্য। বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুযায়ী ১৭ সেপ্টেম্বরই বিশ্বকর্মা পুজোর দিন। একই তারিখ দেখাচ্ছে দ্রিক পঞ্চাঙ্গও।

বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুযায়ী, ১৭ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩-এ শ্রীশ্রী বিশ্বকর্মা পুজো হবে। ওই দিন ভাদ্র শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথি সকাল প্রায় ১০টা ৪৮ মিনিট পর্যন্ত থাকবে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বিশ্বকর্মা পুজোর দিন নির্ধারণ সাধারণ চন্দ্রতিথির ভিত্তিতে নয়; সূর্যের রাশি পরিবর্তন বা সংক্রান্তির সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।

- Advertisement -

বিশ্বকর্মা পুজোর শুভক্ষণ কখন?

কলকাতার সময় অনুযায়ী কন্যা সংক্রান্তির মুহূর্ত ১৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টা ৫৮ মিনিটে। দ্রিক পঞ্চাঙ্গ অনুযায়ী কন্যা সংক্রান্তির পুণ্যকাল সকাল ৭টা ৫৮ মিনিট থেকে দুপুর ২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত এবং মহাপুণ্যকাল সকাল ৭টা ৫৮ মিনিট থেকে ১০টা পর্যন্ত।

অন্যদিকে, বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত পঞ্জিকার তথ্য অনুযায়ী ১৭ সেপ্টেম্বর মাহেন্দ্রযোগ রয়েছে সকাল ৭টা ৪ মিনিটের মধ্যে এবং পরে সকাল ১০টা ১৯ মিনিট থেকে দুপুর ১২টা ৪৪ মিনিট পর্যন্ত। তাই পঞ্জিকা অনুসরণ করে অনেকেই সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে পুজোর আয়োজন করেন।

তবে পুজোর নির্দিষ্ট মুহূর্ত স্থানীয় পঞ্জিকা, স্থান এবং পুরোহিতের পরামর্শ অনুযায়ী ঠিক করা যেতে পারে।

বিশ্বকর্মা পুজো কেন করা হয়?

হিন্দু ঐতিহ্যে বিশ্বকর্মা-কে দেবশিল্পী বা দেবতাদের স্থপতি ও কারিগর হিসেবে মানা হয়। স্থাপত্য, নির্মাণ, কারিগরি দক্ষতা এবং সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে রয়েছে।

এই কারণেই বিশ্বকর্মা পুজোর সঙ্গে যন্ত্রপাতি ও কর্মস্থলের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। কারখানার মেশিন, গ্যারাজের গাড়ি, লেদ মেশিন, বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম, নির্মাণের যন্ত্র—সবকিছুকে পরিষ্কার করে পুজো করা হয়। শিল্পী, কারিগর, মেকানিক, ইঞ্জিনিয়ার, নির্মাণকর্মী এবং বিভিন্ন পেশার মানুষ নিজেদের কাজের সাফল্য ও নিরাপত্তার জন্য বিশ্বকর্মার আরাধনা করেন।

বিশ্বকর্মার পৌরাণিক পরিচয় কী?

বিশ্বকর্মার পরিচয় একমাত্র একটি পুরাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বৈদিক সাহিত্যে ‘বিশ্বকর্মা’ নামটি সৃষ্টিশক্তি ও বিশ্বনির্মাণের ধারণার সঙ্গে যুক্ত। পরবর্তী মহাকাব্য ও পুরাণের ধারায় তিনি দেবতাদের স্থপতি ও কারিগর হিসেবে আরও সুস্পষ্ট রূপ পান।

মহাভারতের বিভিন্ন বর্ণনায় বিশ্বকর্মাকে দেবতাদের স্থপতি ও অসংখ্য শিল্পকলার অধিকারী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। রামায়ণ ও পুরাণের বিভিন্ন কাহিনিতেও তাঁর নির্মাণশৈলী এবং দেবতাদের জন্য বিভিন্ন স্থাপত্য ও অস্ত্র তৈরির কথা পাওয়া যায়।

প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনিতে তাঁর সঙ্গে দ্বারকা, লঙ্কা, ইন্দ্রের সভা, দেবতাদের বিভিন্ন প্রাসাদ এবং নানা দিব্যাস্ত্র ও যান নির্মাণের কাহিনি যুক্ত হয়েছে। তবে কোন সৃষ্টি কোন গ্রন্থে কীভাবে বর্ণিত হয়েছে, তা নিয়ে বিভিন্ন পুরাণ ও আঞ্চলিক ঐতিহ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই এগুলিকে পৌরাণিক বিশ্বাস ও কাহিনি হিসেবেই দেখা উচিত।

বিশ্বকর্মা পুজোয় যন্ত্রপাতির পুজো কেন?

বিশ্বকর্মা পুজোর সবচেয়ে পরিচিত রীতি হল কাজের সরঞ্জাম এবং যন্ত্রপাতির পুজো।

একজন কারিগরের কাছে তাঁর হাতুড়ি, ছেনি বা মেশিন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই একজন মেকানিকের কাছে তাঁর গ্যারাজের সরঞ্জাম, একজন কারখানার কর্মীর কাছে উৎপাদনের মেশিন এবং একজন ইঞ্জিনিয়ারের কাছে তাঁর প্রযুক্তিগত কাজের উপকরণ গুরুত্বপূর্ণ।

সেই কাজের মাধ্যমকেই বিশ্বকর্মার প্রতীকী আশীর্বাদের সঙ্গে যুক্ত করে পুজো করার রীতি তৈরি হয়েছে। তাই পুজোর আগে মেশিন ও যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করা, ফুল-মালা দিয়ে সাজানো এবং পুজো করা বহু কর্মস্থলের পরিচিত ছবি।

বিশ্বকর্মা পুজোয় কী কী নিয়ম মানা হয়?

স্থানীয় রীতি ও পরিবারের প্রচলন অনুযায়ী নিয়মে কিছুটা পার্থক্য থাকতে পারে। সাধারণভাবে—

  • পুজোর আগে কর্মস্থল ও যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করা হয়।
  • মেশিন, গাড়ি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সাজানো হয়।
  • বিশ্বকর্মার মূর্তি বা ছবি স্থাপন করা হয়।
  • ফুল, ধূপ, প্রদীপ, ফল ও নৈবেদ্য নিবেদন করা হয়।
  • যন্ত্রপাতিতে চন্দন, সিঁদুর বা পুষ্প অর্পণ করা হয়।
  • কর্মস্থলের কর্মী ও মালিকরা একসঙ্গে পুজোয় অংশ নেন।
  • পুজোর পরে প্রসাদ বিতরণ করা হয়।

বিশেষ করে কারখানা, গ্যারাজ, মেকানিক্যাল ওয়ার্কশপ এবং বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে এই পুজো ঘিরে আলাদা আয়োজন থাকে।

বিশ্বকর্মা পুজো আর ঘুড়ি ওড়ানোর সম্পর্ক কী?

বাংলায় বিশ্বকর্মা পুজো মানেই অনেকের কাছে ঘুড়ি ওড়ানো। বিশেষ করে কলকাতা ও দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় এই দিন ঘুড়ি ওড়ানোর পুরনো জনপ্রিয় রীতি রয়েছে।

বিশ্বকর্মা পুজোর সঙ্গে ঘুড়ি ওড়ানোর সম্পর্কের নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক উৎস নিয়ে একক মত নেই। ফলে এটিকে নিশ্চিতভাবে কোনও একটি পৌরাণিক ঘটনার ফল বলে দাবি করার পরিবর্তে বাঙালির লোকাচার ও উৎসব-সংস্কৃতির অংশ হিসেবে দেখাই বেশি যুক্তিযুক্ত।

তবে কর্মস্থলের পুজো, ছুটির আমেজ, শরতের আকাশ এবং ঘুড়ি—সব মিলিয়ে বিশ্বকর্মা পুজো বাংলার নিজস্ব উৎসব সংস্কৃতিতে একটি আলাদা জায়গা তৈরি করেছে।

২০২৬ সালের বিশ্বকর্মা পুজোর বিশেষ তথ্য

বিষয় তথ্য
পুজোর তারিখ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বার বৃহস্পতিবার
বাংলা তারিখ ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩
সংক্রান্তি কন্যা সংক্রান্তি
সংক্রান্তির সময় সকাল ৭:৫৮ মিনিট
পুণ্যকাল সকাল ৭:৫৮–দুপুর ২:৩০
মহাপুণ্যকাল সকাল ৭:৫৮–১০:০০
পুজোর প্রচলিত সময় সকাল থেকে মধ্যাহ্ন

সময়গুলি পঞ্জিকা ও স্থানভেদে সামান্য পরিবর্তিত হতে পারে। উপরোক্ত সময় কলকাতা-কেন্দ্রিক গণনা ও সংশ্লিষ্ট পঞ্জিকার তথ্যের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বকর্মা পুজো?

বিশ্বকর্মা পুজোর বিশেষত্ব এখানেই যে, এই উৎসবের কেন্দ্রে রয়েছে কাজ এবং সৃষ্টির উপকরণ। ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি এটি শ্রম, দক্ষতা, প্রযুক্তি এবং কারিগরি পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষের কাছে একটি বিশেষ দিন।

কারখানার বিশাল মেশিন থেকে ছোট্ট গ্যারাজের টুলবক্স—নিজের কাজের সরঞ্জামকে সম্মান জানানোর এই রীতিই বিশ্বকর্মা পুজোকে অন্য অনেক উৎসবের থেকে আলাদা করে।

আর বাঙালির কাছে তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় শরতের নীল আকাশ, ঘুড়ি, পাড়ার উৎসব এবং পুজোর আগমনের আবহ। ফলে বিশ্বকর্মা পুজো একদিকে ধর্মীয় আচার, অন্যদিকে বাংলার কর্মসংস্কৃতি ও লোকজ উৎসবেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর