বিশ্বকর্মা পুজো মানেই শরতের নীল আকাশে রংবেরঙের ঘুড়ি। কিন্তু দেবশিল্পীর আরাধনার সঙ্গে ঘুড়ির সম্পর্ক তৈরি হল কীভাবে? পুরাণের কাহিনি, কলকাতার পুরনো সংস্কৃতি ও বাংলার শিল্পাঞ্চলের ইতিহাসে মিলছে এই প্রশ্নের নানা সূত্র।
বিশ্বকর্মা পুজোর দিন সকাল হলেই বাংলার বহু শহর ও মফস্সলের আকাশ বদলে যায়। নীল আকাশের বুকে দেখা যায় পেটকাটি, চাঁদিয়াল, মোমবাতি, বগ্গা-সহ নানা ধরনের ঘুড়ি। কোথাও চলে ঘুড়ির লড়াই, কোথাও আবার ছাদে ছাদে পরিবারের সঙ্গে ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসব।
বিশ্বকর্মা পুজো আর ঘুড়ি—দুটি যেন বাংলার উৎসব সংস্কৃতিতে বহুদিন ধরেই একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু এই সম্পর্কের নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক শুরু কোথায়, তা নিয়ে একক ও নিশ্চিত মত নেই। বরং পৌরাণিক বিশ্বাস, কলকাতার বাবু সংস্কৃতি, শিল্পাঞ্চলের উৎসব এবং শরতের অনুকূল আবহাওয়া—সব মিলিয়েই এই রীতি জনপ্রিয় হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে উঠে আসে।
[বিশ্বকর্মা পুজোয় কেন গাড়ি-মেশিনের পুজো হয়? দেবশিল্পীর সঙ্গে যন্ত্রের সম্পর্ক জানুন]
[বিশ্বকর্মা পুজো ২০২৬: কবে, কখন পুজো? জানুন তিথি, শুভক্ষণ, নিয়ম ও পৌরাণিক কাহিনি]
বিশ্বকর্মা পুজোয় ঘুড়ি ওড়ানো হয় কেন?
সবচেয়ে প্রচলিত ব্যাখ্যাটি পাওয়া যায় বিশ্বকর্মার সঙ্গে আকাশযান নির্মাণের পৌরাণিক কাহিনিতে।
বিভিন্ন ধর্মীয় কাহিনি ও লোকবিশ্বাসে বিশ্বকর্মাকে দেবতাদের স্থপতি ও নির্মাতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তাঁর তৈরি নানা দিব্য স্থাপত্য ও যান নিয়ে পুরাণে কাহিনি রয়েছে। সেই বিশ্বাস থেকেই একটি প্রচলিত ধারণা তৈরি হয়েছে—দেবতাদের জন্য বিশ্বকর্মার নির্মিত উড়ন্ত রথ বা আকাশযানকে স্মরণ করেই তাঁর পুজোর দিনে আকাশে ঘুড়ি ওড়ানো হয়।
তবে এই ব্যাখ্যাকে সরাসরি ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশ্বকর্মা পুজোর সঙ্গে ঘুড়ি ওড়ানোর রীতির নির্দিষ্ট উৎস নিয়ে গবেষণামূলকভাবে সর্বসম্মত প্রমাণ নেই। বরং এটি পৌরাণিক ব্যাখ্যা ও লোকাচারের অংশ হিসেবে প্রচলিত।
বাংলায় এই রীতির শুরু কবে?
এই প্রশ্নেরও একেবারে নির্দিষ্ট উত্তর নেই।
একটি প্রচলিত ঐতিহাসিক মত অনুযায়ী, উনিশ শতকের কলকাতা ও বাংলার জমিদার-বাবু সমাজে ঘুড়ি ওড়ানো জনপ্রিয় ছিল। বিশ্বকর্মা পুজোর দিন ঘুড়ি ওড়ানোর সঙ্গে ১৮৫০-এর দশকের কলকাতা ও গ্রামবাংলার কিছু জমিদার পরিবারের উৎসবের সম্পর্কের কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে অন্য একটি ঐতিহাসিক ব্যাখ্যায় বলা হয়, কলকাতায় ঘুড়ি ওড়ানোর জনপ্রিয়তা নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ (Wajid Ali Shah)-এর মেটিয়াবুরুজে আগমনের পর আরও ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৫৬ সালে কলকাতায় এসে তিনি মেটিয়াবুরুজে নিজের সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি করেন, যার মধ্যে ঘুড়ি ওড়ানোও ছিল। বিশ্বকর্মা পুজোর সঙ্গে এই রীতির যোগ কীভাবে তৈরি হল, তা অবশ্য নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।
অর্থাৎ, ঘুড়ি ওড়ানোর সংস্কৃতি কলকাতায় আগে থেকেই ছিল, পরে বিশ্বকর্মা পুজোর সঙ্গে তা বিশেষভাবে জড়িয়ে যেতে পারে—এমন একটি ব্যাখ্যাও রয়েছে।
শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে ঘুড়ির সম্পর্ক
বিশ্বকর্মা পুজো বাংলায় শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়। এটি দীর্ঘদিন ধরে কারখানা, শ্রমিক ও শিল্পসংস্কৃতির সঙ্গেও যুক্ত।
কলকাতা ও হাওড়া থেকে শুরু করে হুগলি নদীর দুই পাড়ের শিল্পাঞ্চলে একসময় বিশ্বকর্মা পুজো ছিল বড় সামাজিক উৎসব। কারখানার মেশিন পরিষ্কার করা, পুজো, শ্রমিকদের আয়োজন এবং তারপর আকাশজুড়ে ঘুড়ি—সব মিলিয়ে তৈরি হত আলাদা উৎসবের পরিবেশ।
একটি পুরনো প্রতিবেদনে ব্যারাকপুর-কল্যাণী শিল্পাঞ্চলের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, কারখানার চিমনির ধোঁয়ার থেকেও ঘুড়ি বেশি উঁচুতে উঠবে—এমন প্রতিযোগিতাও একসময় উৎসবের অংশ ছিল।
এর ফলে বিশ্বকর্মা পুজোর সঙ্গে ঘুড়ি শুধু বিনোদন হিসেবে নয়, শিল্পাঞ্চলের সামাজিক উৎসব হিসেবেও জড়িয়ে পড়ে।
শরতের আকাশও কি একটা কারণ?
অবশ্যই, এর একটি বাস্তব ও প্রাকৃতিক দিকও রয়েছে।
বিশ্বকর্মা পুজো সাধারণত ভাদ্র সংক্রান্তির সময়ে হয়। বর্ষার শেষ পর্ব পেরিয়ে তখন বাংলায় শরতের আবহ শুরু হয়। আকাশ পরিষ্কার হতে থাকে, মেঘের ফাঁকে নীল আকাশ দেখা যায় এবং অনেক সময় ঘুড়ি ওড়ানোর জন্য অনুকূল বাতাসও পাওয়া যায়।
২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে এই আবহাওয়াগত বিষয়টিকেও ঘুড়ি ওড়ানোর জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল—শরতের নীল আকাশ, সাদা মেঘ এবং মৃদু বাতাস ঘুড়ির জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে।
তাই বলা যায়, পৌরাণিক বিশ্বাসের সঙ্গে প্রকৃতিরও একটা সুন্দর সমাপতন রয়েছে।
পেটকাটি, চাঁদিয়াল, মোমবাতি—এত নাম কেন?
বিশ্বকর্মা পুজোর আকাশে শুধু একটি ধরনের ঘুড়ি দেখা যায় না। বাংলার ঘুড়ির নিজস্ব নাম ও নকশার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে।
পেটকাটি, চাঁদিয়াল, মোমবাতি, বগ্গা—এগুলি বাংলার পরিচিত ঘুড়ির বিভিন্ন ধরন। কোথাও আবার স্থানীয় নাম ও নকশার ভিত্তিতে আরও নানা ধরনের ঘুড়ি তৈরি হয়।
আগে পুজোর কয়েকদিন আগে থেকেই ঘুড়ি তৈরির প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেত। বাঁশের কাঠি, কাগজ, আঠা দিয়ে ঘুড়ি বানানোর পাশাপাশি বাড়িতে বাড়িতে সুতোয় মাঞ্জা দেওয়ার চল ছিল। কলকাতা ও দুই ২৪ পরগনার বিভিন্ন এলাকায় এই ঘুড়ির লড়াই একসময় বিশেষ জনপ্রিয় ছিল।
‘ভোকাট্টা’ কেন বিশ্বকর্মা পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে?
ঘুড়ি ওড়ানো মানেই শুধু আকাশে ঘুড়ি তোলা নয়—ঘুড়ি কাটাকাটি বাঙালির এই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ।
প্রতিপক্ষের ঘুড়ির সঙ্গে সুতোয় লড়াই করে সেটি কেটে দিলে ছাদ থেকে ভেসে আসে সেই চেনা আওয়াজ—
“ভো-কাট্টা!”
তারপর কাটা ঘুড়ির পিছনে ছুটে চলা ছোটদের দল। কলকাতার পুরনো পাড়াগুলিতে বিশ্বকর্মা পুজোর এই দৃশ্য একসময় উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। সময়ের সঙ্গে সেই পাড়ার ছাদভিত্তিক ঘুড়ির সংস্কৃতি অনেক জায়গায় কমেছে, কিন্তু স্মৃতিতে এখনও তার জায়গা যথেষ্ট শক্ত।
এখন কি আগের মতো ঘুড়ি ওড়ে?
সব জায়গায় নয়।
শহুরে জীবনে ছাদের সংখ্যা কমে যাওয়া, ব্যস্ততা, নিরাপত্তাজনিত নানা সমস্যা এবং ঘুড়ি ওড়ানোর ধরনে পরিবর্তনের কারণে কলকাতার অনেক এলাকায় আগের সেই উন্মাদনা আর দেখা যায় না। তবুও বিশ্বকর্মা পুজোর দিন কলকাতা ও বাংলার বিভিন্ন জায়গায় এখনও আকাশে রঙিন ঘুড়ির দেখা মেলে।
অন্যদিকে বাংলার সব জায়গায় যে বিশ্বকর্মা পুজোর দিনই ঘুড়ি ওড়ানো হয়, তাও নয়। যেমন, কিছু এলাকায় পৌষ সংক্রান্তি বা স্থানীয় উৎসবকে কেন্দ্র করেও ঘুড়ি ওড়ানোর ঐতিহ্য রয়েছে।
অর্থাৎ, বিশ্বকর্মা পুজো বাংলায় ঘুড়ি ওড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হলেও সেটিই একমাত্র দিন নয়।
বিশ্বকর্মা পুজো আর ঘুড়ি—এই সম্পর্কের আসল গল্প কী?
আসলে এর কোনও এক লাইনের উত্তর নেই।
একদিকে রয়েছে দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার আকাশযান নির্মাণের পৌরাণিক বিশ্বাস। অন্যদিকে রয়েছে কলকাতার পুরনো বাবু সংস্কৃতি, উনিশ শতকের ঘুড়ি ওড়ানোর জনপ্রিয়তা, শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক সমাজ এবং বিশ্বকর্মা পুজোকে ঘিরে তৈরি হওয়া সামাজিক উৎসব। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ভাদ্র-শেষের নীল আকাশ ও অনুকূল বাতাস।
এই সবকিছুর মিলনেই সম্ভবত বাংলায় তৈরি হয়েছে এমন এক নিজস্ব উৎসব-সংস্কৃতি, যেখানে দেবশিল্পীর পুজোর দিন মাটির কর্মশালা থেকে চোখ উঠে যায় আকাশের দিকে।
তাই বিশ্বকর্মা পুজোর আকাশে ঘুড়ি শুধু রঙিন কাগজের উড়ান নয়। তার সঙ্গে মিশে আছে পুরনো কলকাতা, শিল্পাঞ্চলের স্মৃতি, বাঙালির ছাদ-সংস্কৃতি, প্রতিযোগিতা, শৈশব এবং উৎসবের আবেগ।



