**কলকাতা: ** আজ, বৃহস্পতিবার ২৯ অক্টোবর পালিত হচ্ছে করওয়া চৌথ (Karwa Chauth)। স্বামীর দীর্ঘায়ু, সুস্বাস্থ্য ও দাম্পত্য জীবনের মঙ্গল কামনায় এই ব্রত পালন করেন বহু বিবাহিত হিন্দু মহিলা। ভোরে সরগি খেয়ে উপবাস শুরু, সন্ধ্যায় পুজো ও ব্রতকথা পাঠ এবং রাতে চাঁদের দর্শনের পর উপবাস ভাঙা—এই রীতিগুলির মধ্য দিয়েই পালিত হয় উৎসবটি। কলকাতায় আজ চতুর্থী তিথি শুরু হয়েছে রাত ১টা ৬ মিনিটে এবং শেষ হবে রাত ১০টা ৯ মিনিটে। দ্রিক পঞ্চাঙ্গ অনুযায়ী, কলকাতায় পুজোর শুভ সময় বিকেল ৫টা ১ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৬টা ১৭ মিনিট পর্যন্ত। চন্দ্রোদয়ের সম্ভাব্য সময় সন্ধ্যা ৭টা ৪৭ মিনিট।
করওয়া চৌথ ২০২৬: তারিখ ও শুভ সময়
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
রাত ১:০৬ – রাত ১০:০৯
বিকেল ৫:০১ – সন্ধ্যা ৬:১৭
সন্ধ্যা ৭:৪৭
মনে রাখবেন: সময়গুলি কলকাতার স্থানীয় পঞ্জিকা অনুযায়ী। আবহাওয়া ও স্থানীয় গণনার কারণে চাঁদ দৃশ্যমান হওয়ার সময় আলাদা হতে পারে।
করওয়া চৌথ কেন পালন করা হয়?
করওয়া চৌথ মূলত উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত একটি ঐতিহ্যবাহী হিন্দু ব্রত। কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্থী তিথিতে এই উৎসব পালিত হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, বিবাহিত মহিলারা স্বামীর দীর্ঘায়ু, সুস্বাস্থ্য ও সংসারের মঙ্গল কামনায় উপবাস করেন। অনেক পরিবারে অবিবাহিত মহিলারাও নিজেদের পছন্দের জীবনসঙ্গী পাওয়ার কামনায় এই ব্রত পালন করেন।
এই উৎসবের সঙ্গে দাম্পত্যের প্রতি নিষ্ঠা, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং ধর্মীয় বিশ্বাস জড়িয়ে রয়েছে। তবে ব্রত পালনের নিয়ম, উপবাসের ধরন ও পুজোর পদ্ধতি অঞ্চল এবং পরিবারভেদে কিছুটা আলাদা হতে পারে।
করওয়া চৌথের পুজোর নিয়ম: কীভাবে পালন করবেন ব্রত?
করওয়া চৌথে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কয়েকটি প্রচলিত আচার পালন করা হয়। পরিবারের নিজস্ব রীতি অনুযায়ী কিছু পার্থক্য থাকতে পারে।
1. ভোরে সরগি খাওয়া: অনেক পরিবারে শাশুড়ি বউমাকে সরগি দেন। উপবাস শুরুর আগে ফল, মিষ্টি, শুকনো ফল ও অন্যান্য খাবার খাওয়ার রীতি রয়েছে।
2. উপবাস শুরু: সরগি খাওয়ার পর উপবাস শুরু করেন ব্রতীরা। প্রচলিত রীতিতে অনেকে জলও পান করেন না। তবে দীর্ঘক্ষণ জল ও খাবার না খেয়ে থাকা সবার জন্য নিরাপদ নয়।
3. সন্ধ্যায় পুজো: নির্ধারিত সময়ে দেবী পার্বতী, ভগবান শিব ও গণেশের পুজো করা হয়। পুজোর সময় করওয়া বা জলভর্তি পাত্র, প্রদীপ, ফুল, সিঁদুর, মিষ্টি ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করা হয়।
4. ব্রতকথা পাঠ: পুজোর সময় করওয়া চৌথের প্রচলিত ব্রতকথা শোনা বা পাঠ করার রীতি রয়েছে। অনেক জায়গায় মহিলারা একসঙ্গে বসে পুজো করেন।
5. চাঁদের দর্শন ও উপবাস ভাঙা: রাতে চাঁদ উঠলে প্রচলিত রীতি অনুসারে চালুনি দিয়ে চাঁদ এবং পরে স্বামীর মুখ দেখেন অনেকে। চন্দ্রদেবকে অর্ঘ্য নিবেদন করার পর উপবাস ভাঙা হয়।
করওয়া চৌথ পুজোর উপকরণ: কী কী লাগবে?
পুজোর আগে প্রয়োজনীয় সামগ্রী গুছিয়ে রাখলে সুবিধা হবে। সাধারণত ব্যবহৃত উপকরণগুলি হল—
-
করওয়া বা মাটির পাত্র এবং জল
-
পুজোর থালা ও প্রদীপ
-
সলতে, ঘি বা তেল
-
সিঁদুর, রোলি, হলুদ ও চাল
-
ফুল, ধূপ ও আগরবাতি
-
ফল, মিষ্টি ও অন্যান্য নৈবেদ্য
-
দেবী পার্বতী, শিব ও গণেশের ছবি বা মূর্তি
-
ব্রতকথার বই
-
চাঁদ দেখার জন্য চালুনি
-
চন্দ্রদেবকে অর্ঘ্য দেওয়ার পাত্র
পরিবারের প্রচলিত পুজোর নিয়ম অনুযায়ী তালিকায় আরও কিছু উপকরণ যোগ হতে পারে।
সরগি কী? কেন ভোরে খাওয়া হয়?
করওয়া চৌথের সঙ্গে সরগির বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। সরগি হল উপবাস শুরুর আগে ভোরে খাওয়া খাবার। বহু পরিবারে শাশুড়ি তাঁর পুত্রবধূকে সরগি দেন। এতে ফল, শুকনো ফল, মিষ্টি, দুধ বা অন্যান্য খাবার থাকতে পারে।
দীর্ঘক্ষণ উপবাসের আগে খাবার খাওয়ার এই রীতি উৎসবের প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে উপবাসের সময় শরীরের প্রয়োজন উপেক্ষা করা উচিত নয়। বিশেষত ডায়াবেটিস, কিডনির সমস্যা, গর্ভাবস্থা বা নিয়মিত ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজন থাকলে দীর্ঘক্ষণ খাবার ও জল না খেয়ে থাকার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। অসুস্থ বোধ করলে জোর করে উপবাস চালিয়ে যাওয়া উচিত নয়।
করওয়া চৌথের ব্রতকথা: প্রচলিত কাহিনি কী?
করওয়া চৌথের সঙ্গে একাধিক লোককথা ও ধর্মীয় আখ্যান প্রচলিত রয়েছে। তার মধ্যে বীরাবতীর কাহিনি বিশেষভাবে পরিচিত। প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, বীরাবতী তাঁর ভাইদের সঙ্গে এক ঘটনার পর চাঁদ ওঠার আগেই চাঁদ উঠেছে বলে মনে করে উপবাস ভেঙেছিলেন। পরে স্বামীর অসুস্থতার খবর পেয়ে তিনি অনুতপ্ত হন এবং নিষ্ঠার সঙ্গে ব্রত পালন করেন। কাহিনির বিভিন্ন সংস্করণে দেবী বা দেবতার কৃপায় তাঁর স্বামীর সুস্থ হয়ে ওঠার কথা বলা হয়।
এই আখ্যান ধর্মীয় বিশ্বাস ও লোকপরম্পরার অংশ। অঞ্চল ও পরিবারভেদে ব্রতকথার বিবরণে পার্থক্য দেখা যায়।
কলকাতায় আজ কখন চাঁদ উঠবে?
কলকাতায় ২৯ অক্টোবর করওয়া চৌথের চন্দ্রোদয়ের সম্ভাব্য সময় সন্ধ্যা ৭টা ৪৭ মিনিট। তবে পঞ্জিকায় দেওয়া চন্দ্রোদয়ের সময় এবং বাস্তবে আকাশে চাঁদ দৃশ্যমান হওয়ার সময় এক নাও হতে পারে। মেঘলা আকাশ থাকলে চাঁদ দেখতে আরও দেরি হতে পারে।
ব্রতীরা স্থানীয় পঞ্জিকার সময় অনুসরণ করতে পারেন। চাঁদ দেখা না গেলে উপবাস ভাঙার নিয়ম নিয়ে পরিবারের প্রচলিত রীতি বা পুরোহিতের পরামর্শ মেনে চলা যেতে পারে।
করওয়া চৌথ ২০২৬: গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন: ২০২৬ সালে করওয়া চৌথ কবে?
উত্তর: ২৯ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার।
প্রশ্ন: কলকাতায় করওয়া চৌথের পুজোর শুভ সময় কখন?
উত্তর: দ্রিক পঞ্চাঙ্গ অনুযায়ী বিকেল ৫টা ১ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৬টা ১৭ মিনিট পর্যন্ত।
প্রশ্ন: কলকাতায় চাঁদ ওঠার সম্ভাব্য সময় কত?
উত্তর: সন্ধ্যা ৭টা ৪৭ মিনিট। আবহাওয়া ও দৃশ্যমানতার কারণে বাস্তবে চাঁদ দেখতে দেরি হতে পারে।
প্রশ্ন: করওয়া চৌথে কীভাবে উপবাস ভাঙা হয়?
উত্তর: প্রচলিত রীতি অনুযায়ী চাঁদ দেখার পর চন্দ্রদেবকে অর্ঘ্য নিবেদন করে উপবাস ভাঙা হয়। পরিবারের রীতি অনুসারে পদ্ধতিতে পার্থক্য থাকতে পারে।
প্রশ্ন: করওয়া চৌথে কি জলও পান করা যায় না?
উত্তর: প্রচলিত কিছু রীতিতে নির্জলা উপবাস করা হয়। তবে তা সবার জন্য নিরাপদ নয়। শারীরিক অসুস্থতা বা বিশেষ স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।



