নজরবন্দি ব্যুরো: দু’দিন ধরে গণনার পর অবশেষে প্রকাশিত হল পঞ্চায়েত ভোটের ফলাফল। যদিও আদালতের রায়েই চূড়ান্ত হবে জয় পরাজয়ের হিসেব। সে যত কাণ্ডই হোক না আদালতে, রাজ্যের প্রতিটা জেলায় একাধিপত্য বজায় রেখে পঞ্চায়েত রাজ নিজেদের দখলেই রাখল শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। মানুষের বিশ্বাস যে এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর থেকে পুরোপুরি সরে যায়নি, তা আরও একবার প্রমাণিত। তবে, একটা বিষয় ঠিক যে, রাজ্যে এই মুহূর্তে বিরোধী দলের সংখ্যা চার, অন্তত বড়ো দলগুলির নিরিখে। আবার, অন্যান্য ও নির্দল তো আছেই। আর যে কারণে পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছে, বিরোধী ভোট ভাগাভাগিই তৃণমূলের জয়ের চাবিকাঠি।
আরও পড়ুন: শূন্য তকমা নিয়েই পঞ্চায়েতে লড়াই, লোকসভার আগে জমি তৈরি সিপিআইএমের


আগামী বছর লোকসভার আগে কেন্দ্রে বিজেপি বিরোধী জোটের যে সম্ভাবনা এখন থেকে উদয় হচ্ছে, সেখানে তৃণমূল সিপিএম এবং কংগ্রেস হাত ধরাধরি করবে বলে আপাতভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেও রাজ্যে কিন্তু টক্কর চলছেই দুই গোষ্ঠীর। তিন দল মিলে দুই গোষ্ঠী বলার কারণ বাংলায় সিপিএম কংগ্রেস বিধানসভা থেকেই পরস্পরকে সমর্থন করে চলেছে। এখন, রাজ্যের যে কোনও ভোটে বিরোধীদের লক্ষ্য তৃণমূলকে হারানো। আর সেটাই বিরোধীদের একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ। কিন্তু বিপুল জনপ্রিয় নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলকে হারানোটা ঠিক সম্ভব হচ্ছে না কী কারণে? আগেই যে কথা বলা হল, রাজ্যে এই মুহূর্তে বড়ো বিরোধী দলের সংখ্যাটা চার। সিপিএম কংগ্রেস আইএসএফ একসঙ্গে আছে আর একক ভাবে রয়েছে বিজেপি। এই যে ক্ষুদ্র রাজ্যে এত বিরোধী দল সেটাই কোথাও গিয়ে তৃণমূলের পক্ষে চলে যাচ্ছে বলে করছে রাজনৈতিক মহল।

বিরোধী ভোট যে এই ভাবে ভাগাভাগি হচ্ছে এর আঁচ আগেই টের পেয়েছিল সিপিআইএম। যে কারণেই একুশের বিধানসভার আগে একসাথে তিন দল মিলে মহাজোট তৈরি করা হয়েছিল। যদিও লাভ হয়নি সেক্ষেত্রেও। সিপিএমের মনে হয়েছিল, আলাদা আলাদা করে সেই যখন একটি দলেরই বিরোধিতা করতে হবে তাহলে একসাথে করাই ভালো। শেষমেশ গণতন্ত্রে শাসক নির্ধারণ হবে সংখ্যা মেনেই। তাই সংখ্যাকে বাড়ানোর পরিকল্পনা ছিল তাঁদের। অন্যদিকে, বিজেপি একাই লড়াই করে ২০১৯ লোকসভা এবং একুশের বিধানসভার পর রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলের তকমা পেয়েছে।


এবারের পঞ্চায়েত ভোটের ফলাফল বলছে, বিজেপির ভোট শতাংশ ২২.৮৮, সিপিএমের ১২.৫৬ এবং কংগ্রেসের ৬.৪২। অন্যান্যদের কথা বাদ দিলেও এই তিন দলের মোট ভোট শতাংশ কিন্তু ৪১.৮৬, সেখানে তৃণমূলের ভোট শতাংশ ৫১.১৪। তাহলে ব্যবধান থাকলেও তা কী খুব বেশী? এটা কিন্তু ভাববার বিষয়। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনেও কিন্তু মোদী তথা বিজেপি জিতেছিল ৩০ শতাংশের কিছু বেশী ভোট পেয়েই। বাকী সব ভোট ভাগাভাগি হয়ে গিয়েছিল বিরোধীদের মধ্যেই। তাই শাসক অনেক ক্ষেত্রেই চায় বিরোধী থাকুক, সংখ্যায় কিছুটা বেশি থাকুক। একমাত্র একটি বিরোধী দলই অনেক সময় বেশি চাপে ফেলে, অন্তত ভোটের অঙ্কে। ২০১১ নির্বাচনে বামেদের বিপক্ষে তৃণমূলের একক উত্থান তারই প্রমাণ।

রাজ্যে বিরোধী দল হিসেবে একই অবস্থানে থাকলেও বিজেপির সঙ্গে হাত মেলানোর কোনও সম্ভাবনাই নেই বাম এবং কংগ্রেসের এ কথা এতদিনে স্পষ্ট। আইএসএফ-ও যে সে পথে যাবে না তা বলাই বাহুল্য। তার মানে এটাই দাঁড়ায় যে, রাজ্যে মূলত বিরোধী গোষ্ঠী দুটি। একদিকে, একক বিজেপি, কেন্দ্রের ক্ষমতা, আর্থিক আনুকল্যে যারা বেশ ভারী প্রতিপক্ষ, আর অন্যটি, বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ জোট। তাহলে এই বিরোধী ভোট ভাগাভাগি হতে বাধ্য। কারণ, সব দলেরই কিছু নিজস্ব সমর্থন থাকবেই। মানুষের আদর্শ। তাঁদের বিশ্বাস কোনও দলের প্রতি থাকলে সেটাকে বদলানো সম্ভব হয়। সিপিএম কংগ্রেস নিজেদের মধ্যে আসন সমঝোতা করলেও রাজ্যে বিজেপির সঙ্গে আপোশ করবে না কেউই। তার ওপর রয়েছে বামের ভোট রামে কিংবা রামের ভোট বামের মতো নানান নির্বাচন পরবর্তী তত্ত্ব।

আগামী বছর আবার লোকসভা নির্বাচন। সেখানেও তৃণমূলের জয়ী চাইবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কেন্দ্রে বিজেপির বিরোধিতা করলেও রাজ্যে বাম কংগ্রেস তৃণমূলের সঙ্গে থাকবে তা বোধহয় বিশ্বাসযোগ্য নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবার যেভাবে কেন্দ্রে নিজেকে প্রমাণ করতে চাইছেন তাতে তৃণমূলও রাজ্যের বিজেপি বিরোধী দলগুলির সঙ্গে কতটা আপোশ করবে তা সন্দেহজনক। সেখানে আবার ভোট ভাগাভাগি হলে কেন্দ্রের শাসক হিসেবে বিজেপি লাভবান হবে। তবে, রাজ্যের ভোটে বিরোধী ভোট যতদিন এভাবে ভাগাভাগি হবে, আরও সুদীর্ঘ হবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসন, সেটা কার্যত নিশ্চিত।
বিরোধী ভোট ভাগাভাগিই তৃণমূলের জয়ের চাবিকাঠি, বলছে পর্যবেক্ষণ








