তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে তৈরি হওয়া নজিরবিহীন রাজনৈতিক সংকটে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে দলের নেতৃত্বের ভরসার জায়গাগুলিতে। যাঁদের উপর ভর করে বছরের পর বছর বিভিন্ন জেলার সংগঠন সামলেছে দল, যাঁরা একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত ছিলেন, তাঁদেরই একাংশকে দেখা গেল ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিক্ষুব্ধ শিবিরে।
বুধবার বিধানসভায় ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থন নিয়ে নতুন রাজনৈতিক ব্লক গঠনের দাবি সামনে আসতেই স্পষ্ট হয়ে যায়, এই শিবিরে শুধু নবীন মুখ নন, রয়েছেন তৃণমূলের বহু পুরনো ও অভিজ্ঞ নেতাও। তাঁদের উপস্থিতি রাজনৈতিক মহলে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
সবচেয়ে আলোচিত নামগুলির মধ্যে রয়েছেন মধ্যমগ্রামের বিধায়ক রথীন ঘোষ। রাজ্যের প্রাক্তন খাদ্যমন্ত্রী হিসেবে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। সূত্রের খবর, উত্তর ২৪ পরগনার একাধিক বিধায়কের সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে সম্প্রতি তাঁর বাসভবনেও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছিল।
বিক্ষুব্ধ শিবিরে যোগ দেওয়া আরেক গুরুত্বপূর্ণ মুখ হলেন প্রাক্তন মন্ত্রী জাভেদ খান। ২০১১ সালে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর থেকে দীর্ঘদিন মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তাঁর অসন্তোষ প্রকাশ্যে এসেছিল। শেষ পর্যন্ত তিনিও ঋতব্রতদের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।
প্রাক্তন মন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিনহার অবস্থানও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বীরভূমের এই অভিজ্ঞ নেতা প্রকাশ্যেই জানিয়েছেন যে তিনি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে সমর্থন করছেন। ফলে বিক্ষুব্ধ শিবিরের শক্তি আরও বেড়েছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
বীরভূমের আরেক প্রভাবশালী নেতা কাজল শেখের নামও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অনুব্রত মণ্ডল গ্রেফতার হওয়ার পর জেলার সাংগঠনিক দায়িত্ব অনেকটাই তাঁর উপরই নির্ভর করেছিল। সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক এবং জেলা সংগঠন ধরে রাখতে তাঁকে অন্যতম ভরসা হিসেবে দেখতেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই কাজল শেখের অবস্থান পরিবর্তন রাজনৈতিকভাবে বড় বার্তা বহন করছে।
পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশপুরের বিধায়ক শিউলি সাহাও বিক্ষুব্ধ শিবিরের অন্যতম মুখ হয়ে উঠেছেন। নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় থেকে তিনি তৃণমূল নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ছিলেন। ২০১৬ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে কেশপুরের প্রতিনিধিত্ব করা এই নেত্রীর অবস্থান পরিবর্তনও রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে।
শুধু প্রাক্তন মন্ত্রী বা পুরনো নেতারাই নন, বিক্ষুব্ধ শিবিরে রয়েছেন হাওড়ার অরূপ রায়, সমীর পাঁজার মতো অভিজ্ঞ সংগঠকও। পাশাপাশি উত্তর দিনাজপুরের গোলাম রব্বানি এবং মুর্শিদাবাদের আখরুজ্জামানের মতো নেতাদের নামও সামনে এসেছে, যাঁরা নিজ নিজ জেলায় দীর্ঘদিন ধরে দলের সংগঠনকে শক্তিশালী রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই শিবিরে একাধিক সংখ্যালঘু বিধায়কের উপস্থিতি তৃণমূল নেতৃত্বের কাছে আলাদা উদ্বেগের কারণ হতে পারে। কারণ রাজ্যের একাধিক জেলায় সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখতে এই নেতাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
তবে এখনও পর্যন্ত বিক্ষুব্ধ শিবির নিজেদের নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে ঘোষণা করেনি। তাদের দাবি, তারা এখনও তৃণমূলের আদর্শ এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বকে সম্মান করে। কিন্তু বিধানসভার অন্দরে সংখ্যার জোরে নিজেদেরই প্রকৃত তৃণমূল ব্লক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন একটাই— দলের পুরনো ও আস্থাভাজন নেতাদের এমন অবস্থান পরিবর্তন তৃণমূলের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে? তার উত্তর মিলবে আগামী দিনের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহেই।



