ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের (Syama Prasad Mookerjee) জীবন, রাজনৈতিক ভূমিকা ও আত্মত্যাগ এবার রাজ্যের পাঠ্যক্রমে আরও বিস্তারিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচির মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) জানিয়েছেন, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে স্কুল স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পাঠ্যসূচিতে শ্যামাপ্রসাদকে নিয়ে বিষয়বস্তু রাখা হবে। তাঁর জীবন ও অবদান নিয়ে পৃথক বই প্রকাশের পরিকল্পনাও রয়েছে।
সরকারের এই সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে রয়েছে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের পশ্চিমবঙ্গ গঠনে ভূমিকা, রাষ্ট্রচিন্তা, জাতীয়তাবাদী ভাবনা এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম কেন্দ্রীয় শিল্পমন্ত্রী হিসেবে তাঁর কাজ। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের কাছে এই বিষয়গুলি শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে নিয়মিত চর্চার মধ্যে আনতে চায় রাজ্য সরকার।
১২৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে চলতি বছর জুড়েই শ্যামাপ্রসাদকে কেন্দ্র করে একাধিক কর্মসূচি নিয়েছে রাজ্য সরকার। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই পাঠ্যক্রমে তাঁর জীবন ও কর্মকে গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত সামনে এসেছে। ৬ জুলাই তাঁর জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী স্কুল পাঠ্যসূচিতে তাঁর অবদান অন্তর্ভুক্ত করার কথা জানিয়েছিলেন।
প্রস্তাবিত পাঠ্যবিষয়ের মধ্যে শ্যামাপ্রসাদের পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত ভূমিকা, অখণ্ড ভারতের ভাবনা, রাষ্ট্রপ্রেম, আইনসভায় তাঁর বক্তব্য, শিল্পমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্কের মতো বিষয় জায়গা পেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় স্তরেও তাঁর রাজনৈতিক ও শিক্ষাক্ষেত্রের অবদান নিয়ে পড়াশোনার সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে একটি পৃথক বই প্রকাশের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর সঙ্গে একসময় যুক্ত প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে প্রস্তুত করা একটি বই যৌথভাবে প্রকাশের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি রাজ্যের গ্রন্থাগার দফতরকে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় তাঁর জীবনী নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বই প্রকাশের দায়িত্ব দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
শুধু পাঠ্যবই নয়, শ্যামাপ্রসাদের স্মৃতি সংরক্ষণেও একাধিক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। হুগলির জীরাটে তাঁর পৈতৃক ভিটেকে কেন্দ্র করে স্মারক, গ্রন্থাগার এবং মিউজিয়াম তৈরির পরিকল্পনা আগেই ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকার। সেই প্রকল্পের কাজও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে প্রশাসন।
এর আগে কলকাতায় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫ ফুট উচ্চতার একটি মূর্তি তৈরির ঘোষণাও করেছে রাজ্য সরকার। ১২৫তম জন্মবার্ষিকীকে সামনে রেখে এই প্রকল্পগুলিকে তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণ ও জনমানসে তাঁর অবদান তুলে ধরার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে পাঠ্যক্রমে কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ভূমিকা কীভাবে উপস্থাপন করা হবে, তা নিয়ে শিক্ষামহলে স্বাভাবিকভাবেই আলোচনা তৈরি হয়েছে। শ্যামাপ্রসাদের অবদান পাঠ্যসূচিতে থাকা উচিত বলে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হলেও, শিক্ষকদের একাংশ ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছেন—রাজ্যের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অন্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ভূমিকা কীভাবে এবং কতটা জায়গা পাবে।
সরকারের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে শ্যামাপ্রসাদের ঐতিহাসিক অবদান যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। বর্তমান সরকার সেই ঘাটতি পূরণ করতে চাইছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাস, দেশভাগের সময়কার রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরাই এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
ফলে আগামী শিক্ষাবর্ষে পাঠ্যবইয়ের নতুন অধ্যায়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবন ও কর্ম কতটা বিস্তৃতভাবে জায়গা পায়, সেটিই এখন নজরে। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত তাঁর রাজনৈতিক, শিক্ষাগত ও প্রশাসনিক ভূমিকা পাঠ্যক্রমে ঢোকার ফলে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিহাস পড়ানোর ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে চলেছে।



