ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (Indian Medical Association)-এর পশ্চিমবঙ্গ শাখার নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই প্রকাশ্যে আসছে সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ। এবার আইএমএ-র সংবিধানের বৈধতা নিয়ে সরাসরি থানায় অভিযোগ দায়ের হল। সিউড়ি শাখার সম্পাদক দেবাশিস দেবাংশী অভিযোগ করেছেন, রাজ্য শাখার সংবিধান সংশোধনের দাবি তুলে যে নিয়মে নির্বাচন ও সংগঠনের কাজ চলছে, তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগের নিশানায় রয়েছেন রাজ্য আইএমএ-র সম্পাদক তথা প্রাক্তন সাংসদ চিকিৎসক শান্তনু সেন।
প্রতি দু’বছর অন্তর আইএমএ-র রাজ্য শাখার নির্বাচন হয়। ২০২৪ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এ বার ফের ভোটপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সম্পাদক পদে শান্তনু-ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত চিকিৎসক অশোক নন্দীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দেবাশিস। ভোট যত এগোচ্ছে, দুই শিবিরের সংঘাতও তত প্রকাশ্যে আসছে।
বিতর্কের সূত্রপাত দেবাশিসের কয়েকটি নির্বাচনী প্রচার সংক্রান্ত পোস্টকে কেন্দ্র করে। আইএমএ-র রাজ্য শাখার সদস্যদের গ্রুপে শান্তনু সেনকে নিশানা করে তাঁর পোস্টের পর গত ২০ সেপ্টেম্বর তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়। ওই নোটিসে রাজ্য শাখার সংবিধানের ৩০ নম্বর পাতার ১৩ নম্বর ধারার উল্লেখ করা হয়েছিল বলে দেবাশিসের দাবি।
এর পরেই ওই ধারার বৈধতা নিয়ে তিনি আইএমএ-র সর্বভারতীয় নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ করেন বলে জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, আইএমএ-র সর্বভারতীয় সম্পাদক শর্বরী বসু ই-মেলে তাঁকে জানিয়েছেন, ২০১২ সালের পর পশ্চিমবঙ্গ শাখার সংবিধানে কোনও সংশোধন হয়নি। সেই বক্তব্যকেই সামনে রেখে সিউড়ি থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন দেবাশিস।
দেবাশিসের অভিযোগ, ২০১৪ সালে সংবিধান সংশোধন হয়েছে—এই দাবি করেই গত কয়েক বছর ধরে রাজ্য শাখার কাজ ও নির্বাচন পরিচালিত হয়ে আসছে। তাঁর দাবি, ২০১২ সালের সংবিধানের সঙ্গে বর্তমানে ওয়েবসাইটে থাকা সংবিধানের একাধিক জায়গায় পার্থক্য রয়েছে।
এই পার্থক্যের উদাহরণ হিসেবে তিনি মনোনয়ন ফি এবং ভোটের ব্যালট পাঠানোর পদ্ধতির কথা তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের সংবিধানে বিভিন্ন পদের মনোনয়ন ফি ছিল ২,০০০, ১,৫০০ এবং ১,০০০ টাকা। বর্তমানে ওয়েবসাইটে থাকা তথাকথিত ২০১৪ সালের সংশোধিত সংবিধানে সেই অঙ্ক বেড়ে হয়েছে যথাক্রমে ৫,০০০, ৩,০০০ এবং ২,০০০ টাকা। একই ভাবে ব্যালট পাঠানোর ক্ষেত্রেও পুরনো ও বর্তমান ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে বলে তাঁর দাবি।
দেবাশিসের বক্তব্য, ২০১২ সালের সংবিধান অনুযায়ী ব্যালট শাখা সম্পাদকদের কাছে পৌঁছনোর কথা থাকলেও সংশোধিত সংবিধানের দাবি সামনে রেখে ২০১৪ সাল থেকে সংশ্লিষ্ট শাখার কাউন্সিল সদস্যদের কাছে ব্যালট পাঠানো হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, এই পরিবর্তনের ভিত্তিই প্রশ্নের মুখে।
তবে অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন শান্তনু সেন। তাঁর বক্তব্য, তিনি সম্পাদক হওয়ার আগে মাত্র ১৫৬ জন শাখা সম্পাদকের কাছে ব্যালট পাঠানো হত। পরে নিয়ম পরিবর্তন করে রাজ্য কাউন্সিলের ৭৭০ জন সদস্যের প্রত্যেকের কাছে ব্যালট পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাঁর মতে, এই পদ্ধতিই বেশি গণতান্ত্রিক।
শান্তনুর আরও প্রশ্ন, যে সংবিধানের বৈধতা নিয়ে এখন অভিযোগ তোলা হচ্ছে, সেই সংবিধান মেনেই তো অভিযোগকারী দেবাশিস সিউড়ি শাখার পদাধিকারী হয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, গত ১২ বছর ধরে ওই সংবিধানের ভিত্তিতেই সদস্য এবং বিভিন্ন পদাধিকারী নির্বাচিত হয়েছেন। সেই নির্বাচিত সদস্যদের ভোটেই আইএমএ-র কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও নির্বাচিত হয়েছে। ফলে এতদিন ব্যবহৃত ওই সংবিধানকে এখন কীভাবে অবৈধ বলা যায়, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
শান্তনু পাল্টা অভিযোগও করেছেন দেবাশিসের বিরুদ্ধে। তাঁর দাবি, এক আত্মীয়ের সঙ্গে তাঁর পরিবারের এক সদস্যের পরিচয় ব্যবহার করে অনুমতি ছাড়াই একটি ফোনালাপ রেকর্ড করা হয়েছিল এবং পরে সেটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় দেবাশিসের বিরুদ্ধে তিনিও পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছেন বলে জানিয়েছেন প্রাক্তন সাংসদ।
অভিযোগটি গ্রহণ করা হলেও সেটি এখনই এফআইআর হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। বীরভূম জেলা পুলিশের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তবে এফআইআর করা হবে কি না, তা তদন্তের পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযোগের সঙ্গে আইএমএ-র ১৭৩টি শাখার নির্বাচনী বৈধতার প্রশ্নও জড়িয়ে রয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে আইএমএ-র সর্বভারতীয় শাখার সঙ্গেও কথা বলার প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি তদন্তের এখতিয়ার স্বাস্থ্য দফতর বা অন্য কোনও স্বাস্থ্য সংস্থার মধ্যে পড়ে কি না, সেটিও বিবেচনা করা হবে।
আইএমএ-র রাজ্য শাখার সংবিধান নিয়ে এই নতুন বিতর্ক এমন সময়ে সামনে এল, যখন সংগঠনের নির্বাচন ঘিরে এর আগেও একাধিক অভিযোগ উঠেছে। সেপ্টেম্বরেই কলকাতা শাখা ও বঙ্গীয় শাখার মধ্যে আর্থিক অনিয়ম এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রকাশ্যে বিরোধের খবর সামনে এসেছিল। কলকাতা শাখার তরফে প্রায় ১ কোটি ৫২ লক্ষ টাকা তছরুপের অভিযোগ তোলা হয়েছিল এবং শান্তনু সেনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন করা হয়েছিল; শান্তনু অবশ্য সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন।
ফলে এবারের সংবিধান বিতর্ককে আলাদা কোনও ঘটনা হিসেবে দেখার পাশাপাশি আইএমএ-র রাজ্য শাখার চলমান সাংগঠনিক সংঘাতের সাম্প্রতিক অধ্যায় হিসেবেও দেখা হচ্ছে। তবে সিউড়ি থানায় দায়ের হওয়া অভিযোগের সত্যতা বা সংবিধান সংশোধনের বৈধতা নিয়ে এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। পুলিশের তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নথিপত্র যাচাইয়ের পরই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
আইএমএ-র বঙ্গীয় শাখার ওয়েবসাইটে বর্তমানে একটি ‘Constitution’ বিভাগ রয়েছে। সেখানে সংগঠনের রাজ্য শাখার তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।



