ডিগ্রি আছে, চাকরি কোথায়? শিক্ষিত তরুণের বেকারত্বের নেপথ্যে পাঠ্যক্রম থেকে গবেষণা—তিন বড় ফাঁক

শুধু চাকরির সংখ্যা নয়, প্রশ্ন উঠছে ডিগ্রি এবং কর্মসংস্থানের সম্পর্ক নিয়েও। শিক্ষা, শিল্প, গবেষণা ও দক্ষতার মধ্যে তৈরি হওয়া ফাঁকেই কি লুকিয়ে সমস্যার বড় অংশ?

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

অর্ক সানা: একজন তরুণ কলেজে ভর্তি হলেন। তিন-চার বছর পড়াশোনা করে হাতে এল ডিগ্রি। পরিবারের কাছে সেটাই ছিল চাকরির পথে সবচেয়ে বড় সিঁড়ি। কিন্তু ডিগ্রি পাওয়ার পর যখন চাকরির বাজারে ঢুকলেন, তখন দেখা গেল ছবিটা অন্য রকম। যে বিষয় পড়েছেন, সেই বিষয়ে কাজের সুযোগ সীমিত। যে কাজের জন্য নিয়োগ হচ্ছে, সেখানে আবার চাওয়া হচ্ছে অন্য ধরনের দক্ষতা। ফলে ডিগ্রি আছে, কিন্তু চাকরি নেই—অথবা চাকরি আছে, কিন্তু সেই চাকরির সঙ্গে শিক্ষাগত যোগ্যতার সম্পর্ক নেই।

ভারতের শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের সমস্যা এখন আর শুধু বেকারত্বের পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝার মতো জায়গায় নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে উচ্চশিক্ষার ধরন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম, শিল্পের প্রয়োজন, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং শেষ পর্যন্ত কী ধরনের চাকরি তৈরি হচ্ছে—এই গোটা ব্যবস্থাটাই।

২০২৬ সালের অগস্টে প্রকাশিত NITI Aayog-এর Reimagining Skilling for Viksit Bharat@2047 রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভারতে সমস্ত স্নাতকের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩ শতাংশ। স্নাতক মহিলাদের ক্ষেত্রে সেই হার ২০.৪ শতাংশ। রিপোর্টে ব্যবহৃত তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় বেকারত্বের হার ৩.২ শতাংশ। আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল, মাত্র ৮.২৫ শতাংশ স্নাতক এমন কাজে রয়েছেন, যা তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এই একটি পরিসংখ্যানই সমস্যার চরিত্রটা অনেকটা পরিষ্কার করে দেয়। প্রশ্নটা শুধু ‘চাকরি আছে কি নেই’ নয়। প্রশ্ন হল, একজন মানুষ যে শিক্ষা অর্জন করছেন, তার সঙ্গে শ্রমবাজারের প্রয়োজনের কতটা সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে।

ভারতের উচ্চশিক্ষায় সাধারণ ডিগ্রির দিকে ঝোঁক তার একটি বড় উদাহরণ। NITI Aayog-এর রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রায় ৩.৪ কোটি পড়ুয়া স্নাতক স্তরের বিভিন্ন কোর্সে ভর্তি। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১.১৩ কোটি পড়ছেন B.A.। B.A., B.Sc. এবং B.Com মিলিয়ে পড়ুয়ার সংখ্যা ২ কোটির বেশি। রিপোর্টের পর্যবেক্ষণ, এই ধরনের generic degree-র সঙ্গে সরাসরি চাকরির যোগ অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল।

এখানেই শিক্ষাব্যবস্থার প্রথম বড় ফাঁকটি দেখা যায়। একটি ডিগ্রি একজন পড়ুয়াকে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার যোগ্যতা দিতে পারে, কিন্তু চাকরির বাজারে প্রয়োজনীয় নির্দিষ্ট দক্ষতা সব সময় তৈরি করে না। NITI Aayog-এর রিপোর্টেও বলা হয়েছে, বর্তমান learning ও delivery model-এর একটি বড় অংশ এখনও অত্যধিক theoretical এবং workplace-এর প্রয়োজনের সঙ্গে যথেষ্ট যুক্ত নয়। practical exposure, proof of work, job-readiness support এবং entrepreneurship pathway-র ঘাটতির কথাও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু দায়টা শুধু পড়ুয়া বা বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়। যে অর্থনীতিতে পড়ুয়ারা প্রবেশ করছেন, সেখানে পর্যাপ্ত সংখ্যায় মানসম্পন্ন চাকরি তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারি চাকরির দিকে বিপুল সংখ্যক তরুণের ছুটে যাওয়ার ঘটনাটি তার একটি লক্ষণ। NITI Aayog-এর রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুলাইয়ের মধ্যে প্রায় ১.৮৬ কোটি আবেদন জমা পড়েছিল মাত্র ৫৫ হাজার সরকারি পদের জন্য। অর্থাৎ, বিপুল সংখ্যক তরুণের কাছে একটি সাধারণ ডিগ্রি হয়ে উঠছে সরকারি চাকরির পরীক্ষায় বসার যোগ্যতা অর্জনের পথ।

এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। সরকারি চাকরির প্রতি আকর্ষণকে শুধু তরুণদের মানসিকতা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে সমস্যাটাকে ছোট করে দেখা হবে। স্থায়ী আয়, সামাজিক নিরাপত্তা এবং চাকরির নিশ্চয়তার মতো বিষয়ও এর সঙ্গে যুক্ত। অন্য দিকে, বেসরকারি ক্ষেত্রে তৈরি হওয়া বহু কাজের বেতন, স্থায়িত্ব বা সামাজিক নিরাপত্তা সেই প্রত্যাশার সঙ্গে মেলে না। ফলে ডিগ্রি নিয়ে চাকরির বাজারে প্রবেশ করেও অনেক তরুণ অপেক্ষা করেন এমন একটি চাকরির জন্য, যেটিকে তাঁরা দীর্ঘমেয়াদি নিরাপদ কর্মসংস্থান বলে মনে করেন।

দ্বিতীয় বড় ফাঁকটি এখানেই—শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থানে যাওয়ার মাঝের সেতুটি দুর্বল।

NITI Aayog-এর রিপোর্টে apprenticeship, industry-integrated programme এবং higher education-এর সঙ্গে শিল্পের যোগাযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। রিপোর্টে প্রস্তাবিত সংস্কারের মধ্যে outcome-linked, industry-backed programme এবং apprenticeship-কে আরও বড় পরিসরে নিয়ে আসার কথা রয়েছে।

অর্থাৎ, কলেজে পড়ার সময়ই যদি একজন পড়ুয়া শিল্পক্ষেত্রের বাস্তব কাজ, internship, apprenticeship এবং নির্দিষ্ট পেশার প্রয়োজনীয় দক্ষতার সঙ্গে পরিচিত হন, তা হলে ডিগ্রি পাওয়ার পরে চাকরির বাজারে তাঁর অবস্থান অন্য রকম হতে পারে। এখন বহু ক্ষেত্রে সেই সংযোগ তৈরি হয় অনেক দেরিতে—চাকরি খোঁজা শুরু করার পরে।

তৃতীয় ফাঁকটি আরও বড়—গবেষণা ও শিল্পের মধ্যে দূরত্ব।

Economic Survey 2025-26 অনুযায়ী, ভারতের Gross Expenditure on Research and Development বা GERD GDP-র মাত্র ০.৬৪ শতাংশ। একই সময়ে আমেরিকায় এই হার ৩.৪৮ শতাংশ, চিনে ২.৪৩ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ৪.৯১ শতাংশ। ভারতের R&D ব্যয়ের মাত্র ৪১ শতাংশ আসে business sector থেকে; চিনে এই অংশ ৭৭ শতাংশ, আমেরিকায় ৭৫ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ৭৯ শতাংশ।

এর সরাসরি অর্থ এই নয় যে গবেষণায় কম খরচ করলেই বেকারত্ব বাড়ে। কিন্তু গবেষণা, প্রযুক্তি, শিল্প এবং উচ্চশিক্ষার মধ্যে শক্তিশালী সম্পর্ক না থাকলে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের জন্য নতুন ধরনের জ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর কাজ তৈরির গতি সীমিত হতে পারে। সেই জায়গাতেই শিক্ষা এবং অর্থনীতির সম্পর্কটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ভারতের সমস্যা তাই শুধু ‘আরও skill training’ নয়। একজন তরুণকে বারবার বলা হচ্ছে দক্ষতা বাড়াতে। কিন্তু দক্ষতা বাড়ানোর পরে তিনি কোথায় কাজ করবেন, সেই প্রশ্নটির উত্তরও একই সঙ্গে তৈরি করতে হবে।

এই কারণেই শুধু syllabus বদলানো যথেষ্ট হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন বিষয় যোগ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কোন শিল্পে আগামী দিনে কর্মসংস্থান বাড়বে, সেই শিল্পে কী ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন, সেই দক্ষতা কোন পর্যায়ে শেখানো হবে, পড়ুয়ারা কী ভাবে বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা পাবেন এবং সেই প্রশিক্ষণের পরে চাকরির সুযোগ কতটা থাকবে—পুরো chain-টাকে একসঙ্গে দেখতে হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং automation সেই প্রশ্নকে আরও জরুরি করে তুলেছে। NITI Aayog-এর ২০২৬ সালের রিপোর্টে বলা হয়েছে, AI, automation, green transition এবং global supply chain-এর পুনর্গঠন কাজের ধরন দ্রুত বদলে দিচ্ছে। কিছু নতুন কাজ তৈরি হচ্ছে, আবার কিছু পুরনো কাজের প্রয়োজন কমছে।

তাই আগামী দিনের শিক্ষাব্যবস্থায় শুধু ‘একটি ডিগ্রি’ যথেষ্ট হবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। একজন তরুণের কর্মজীবন হয়তো একটি নির্দিষ্ট কোর্স শেষ করার সঙ্গে শেষ হবে না; বরং কাজের সঙ্গে সঙ্গে নতুন দক্ষতা শেখার প্রয়োজন বাড়বে। NITI Aayog-ও lifelong learning এবং education, skilling ও employment-এর মধ্যে আরও শক্তিশালী সংযোগের উপর জোর দিয়েছে।

তবে এখানেও সতর্ক থাকার জায়গা আছে। শিক্ষিত বেকারত্বের পুরো দায়কে syllabus-এর উপর চাপানো যাবে না। কারণ চাকরি তৈরি হওয়া শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির উৎপাদনক্ষমতা, বিনিয়োগ, শিল্পের বিস্তার এবং পরিষেবা ক্ষেত্রের বৃদ্ধির সঙ্গেও যুক্ত। একটি বিশ্ববিদ্যালয় যতই employable graduate তৈরি করুক, অর্থনীতিতে যদি পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন কাজ না থাকে, তাহলে সেই দক্ষ তরুণদেরও প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে।

সুতরাং ভারতের সামনে সমস্যাটি আসলে তিন স্তরের। প্রথমত, কী শেখানো হচ্ছে এবং চাকরির বাজারে কী প্রয়োজন—তার মধ্যে ফাঁক। দ্বিতীয়ত, শিক্ষা শেষ করার আগে শিল্পের সঙ্গে পড়ুয়ার সংযোগ কতটা তৈরি হচ্ছে—তার ঘাটতি। তৃতীয়ত, গবেষণা ও প্রযুক্তিনির্ভর নতুন কর্মসংস্থান তৈরির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প এবং বিনিয়োগের মধ্যে যথেষ্ট সেতু তৈরি হয়েছে কি না।

ডিগ্রির সংখ্যা বাড়ছে। উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সুযোগও বেড়েছে। কিন্তু ডিগ্রি থেকে চাকরিতে যাওয়ার পথটি যদি একই গতিতে শক্তিশালী না হয়, তাহলে কাগজে শিক্ষিত তরুণের সংখ্যা বাড়বে, কিন্তু তাঁদের শিক্ষার অর্থনৈতিক মূল্য পুরোপুরি কাজে লাগানো যাবে না।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা তাই শুধু “ডিগ্রি আছে, চাকরি নেই কেন?” নয়। আসল প্রশ্ন—ডিগ্রি অর্জনের পর একজন তরুণকে যে অর্থনীতিতে প্রবেশ করতে হবে, সেই অর্থনীতি কি তাঁর শিক্ষাকে কাজে লাগানোর মতো যথেষ্ট কাজ তৈরি করছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের syllabus থেকে শুরু করে laboratory, apprenticeship, industry, research funding এবং শেষ পর্যন্ত চাকরির বাজার—সবকিছুকেই একই ছবির অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন