অর্ক সানা: ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর। নয়াদিল্লির ১ নম্বর সফদরজং রোডের বাসভবনে নিজের দুই দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী (Indira Gandhi)। অপারেশন ব্লু স্টারের কয়েক মাসের মধ্যেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই দিনটি এক গভীর মোড় তৈরি করে—প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুর পর দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে অস্থিরতা, শুরু হয় শিখবিরোধী হিংসা এবং দ্রুত ক্ষমতার দায়িত্ব নেন রাজীব গান্ধী।
সকাল তখন প্রায় ৯টা ১০ মিনিট। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন থেকে পাশের ১ নম্বর আকবর রোডের দফতরের দিকে যাচ্ছিলেন ইন্দিরা। পথের ধারে নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন উপ-পরিদর্শক বেয়ন্ত সিং এবং কনস্টেবল সতবন্ত সিং। তাঁদের মধ্যে বেয়ন্ত ইন্দিরার নিরাপত্তার দায়িত্বে দীর্ঘদিন ধরে ছিলেন।
ইন্দিরা গান্ধী তাঁদের সামনে আসতেই বেয়ন্ত নিজের রিভলভার থেকে গুলি চালান। এরপর সতবন্ত তাঁর স্টেনগান থেকে গুলি করেন। আদালতের নথি অনুযায়ী, দু’জনের অস্ত্র থেকে মোট ৩০টি গুলি ছোড়া হয়েছিল। গুরুতর জখম অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন প্রধানমন্ত্রী। গুলির ঘটনায় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আরও এক কর্মীও আহত হন।
তাঁকে দ্রুত নিয়ে যাওয়া হয় দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস (AIIMS)-এ। চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচার করেও তাঁকে বাঁচাতে পারেননি। দুপুর ২টো ২৩ মিনিট নাগাদ ইন্দিরা গান্ধীকে মৃত ঘোষণা করা হয়। বয়স হয়েছিল ৬৬ বছর।
অপারেশন ব্লু স্টারের পর থেকেই বাড়ছিল উত্তেজনা: এই হত্যাকাণ্ডের কয়েক মাস আগে, ১৯৮৪ সালের জুনে পঞ্জাবের অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির চত্বরে সেনা অভিযান চালিয়েছিল ভারতীয় সেনা। ‘অপারেশন ব্লু স্টার’ নামে পরিচিত সেই অভিযানের লক্ষ্য ছিল স্বর্ণমন্দিরে আশ্রয় নেওয়া সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সরানো। অভিযানে মন্দির চত্বরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং বহু মানুষের মৃত্যু ঘটে। শিখ সম্প্রদায়ের একাংশের মধ্যে এই অভিযান গভীর ক্ষোভ তৈরি করেছিল।
ইন্দিরা গান্ধীর নিরাপত্তা নিয়ে সেই সময় উদ্বেগও ছিল। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা শিখ কর্মীদের সরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব উঠেছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বেয়ন্ত সিংকে দায়িত্বে বহাল রাখা হয়েছিল। হত্যাকাণ্ডের পর এই সিদ্ধান্ত নিয়েও আলোচনা হয়।
হত্যাকাণ্ডের পরেই প্রধানমন্ত্রী হলেন রাজীব গান্ধী: ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই দিল্লিতে রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়। তাঁর ছেলে রাজীব গান্ধী তখন পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী প্রচারে ছিলেন। তাঁকে দ্রুত দিল্লিতে ফিরিয়ে আনা হয়। কংগ্রেসের সিদ্ধান্তে সেদিনই তিনি দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা নাগাদ রাষ্ট্রপতি ভবনে শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন ঘটে।
অন্যদিকে, হত্যাকাণ্ডের পর বেয়ন্ত সিংকে নিরাপত্তাকর্মীরা গুলি করে হত্যা করেন। সতবন্ত সিংকে গ্রেফতার করা হয়। পরে আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর ১৯৮৯ সালের ৬ জানুয়ারি সতবন্ত সিং এবং এই ষড়যন্ত্রে দোষী সাব্যস্ত কেহর সিংয়ের ফাঁসি কার্যকর হয়।
ইন্দিরার মৃত্যুর পর শিখবিরোধী হিংসা, প্রাণ হারান হাজার হাজার মানুষ: প্রধানমন্ত্রীর হত্যাকাণ্ডের পর দিল্লি-সহ দেশের একাধিক জায়গায় শিখ সম্প্রদায়ের মানুষের উপর সংগঠিত হামলা শুরু হয়। বাড়িঘর, দোকানপাট ও সম্পত্তিতে আগুন লাগানো, লুটপাট এবং হত্যার ঘটনা ঘটে। বহু মানুষ প্রাণ হারান, অসংখ্য পরিবার ঘরছাড়া হয়।
কেন্দ্রীয় সরকারের হিসাব উদ্ধৃত করে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, মাত্র তিন দিনের মধ্যে প্রায় ৩,৩৫০ জন শিখকে হত্যা করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে প্রায় ২,৮০০ জনের মৃত্যু হয় দিল্লিতে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নথিতেও ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের পর দিল্লি ও দেশের অন্য কয়েকটি জায়গায় শিখদের উপর হামলা, প্রাণহানি এবং সম্পত্তি ধ্বংসের কথা উল্লেখ রয়েছে।
এই হিংসার তদন্তে পরে একাধিক কমিশন ও কমিটি গঠিত হয়। বিচারপতি জি টি নানাবতীর নেতৃত্বে গঠিত কমিশন ২০০৫ সালে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। সেই প্রতিবেদনেও হিংসার সময় প্রশাসনিক ব্যর্থতা, পুলিশের ভূমিকা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচারের প্রশ্ন উঠে আসে।
৩১ অক্টোবর তাই শুধু ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার দিন নয়। এই তারিখের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অপারেশন ব্লু স্টারের পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা, দেশের নেতৃত্বে পরিবর্তন এবং ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী হিংসার ভয়াবহ স্মৃতি। চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে দিনটির গুরুত্ব রয়ে গিয়েছে।



