ইরান যুদ্ধে আমেরিকার ব্যস্ততার মধ্যেই চিনের ডিএফ-১৭ মোতায়েন, তাইওয়ান না লাদাখ—কোন দিকে নিশানা?

চিনের DF-17 হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের গতি, পাল্লা ও গতিপথ বদলানোর ক্ষমতা কেন গুরুত্বপূর্ণ? তাইওয়ান, আমেরিকা ও লাদাখের নিরাপত্তার প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ অর্ক সানার।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

অর্ক সানা: পশ্চিম এশিয়ায় ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের মধ্যে চিনের সামরিক শক্তি প্রদর্শন ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। চিনের সরকারি সংবাদমাধ্যমে সম্প্রচারিত একটি সামরিক তথ্যচিত্রে অন্তত ছ’টি ডিএফ-১৭ (DF-17) হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং সেগুলি বহনকারী লঞ্চার দেখা গিয়েছে বলে জানিয়েছে আনন্দবাজার পত্রিকা। চিনা সামরিক বিশ্লেষকের বক্তব্য, এই দৃশ্য যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে দেশের সামরিক প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেয়। প্রশ্ন উঠছে, আমেরিকার মনোযোগ পশ্চিম এশিয়ায় কেন্দ্রীভূত থাকার সুযোগে তাইওয়ানের উপর চাপ বাড়াতে চাইছে কি বেজিং? ভারতের লাদাখ সীমান্তের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেই বা এই ক্ষেপণাস্ত্র কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা দরকার। সামরিক তথ্যচিত্রে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র দেখা যাওয়া আর নতুন করে ব্যাপক সংখ্যায় সেগুলি মোতায়েনের স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এক নয়। প্রকাশিত ফুটেজে চিনের সামরিক সক্ষমতার কিছুটা ধারণা পাওয়া গেলেও, ঠিক কতগুলি ডিএফ-১৭ কোথায় মোতায়েন করা হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ্যে নেই।

চিনের সরকারি সংবাদমাধ্যম চায়না সেন্ট্রাল টেলিভিশন (CCTV) সম্প্রতি ‘ঝিশেং’ নামে একটি সামরিক তথ্যচিত্র সম্প্রচার করে। তাতে পিপলস লিবারেশন আর্মি রকেট ফোর্সের (PLARF) ক্ষেপণাস্ত্রবাহী যান দেখা যায়। চিনের নৌবাহিনীর সিনিয়র কর্নেল ও সামরিক বিশ্লেষক ঝাং জুনশে ‘গ্লোবাল টাইমস’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, ওই ফুটেজ চিনের ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের ইঙ্গিত দেয়। এটি তাঁর মূল্যায়ন; স্বাধীনভাবে যাচাই করা মোতায়েন-সংক্রান্ত তথ্য হিসেবে একে দেখা উচিত নয়।

ডিএফ-১৭ চিনের কোনও নতুন পরীক্ষামূলক অস্ত্র নয়। ২০১৯ সালের অক্টোবরে বেজিংয়ে সামরিক কুচকাওয়াজে প্রথম প্রকাশ্যে দেখা যায় এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাকে। আমেরিকার প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (CSIS) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল নাগাদ এটি চিনের সামরিক বাহিনীর ব্যবহারে আসে। এটি একটি মাঝারি পাল্লার ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, যার সঙ্গে রয়েছে হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল।

এই প্রযুক্তির বিশেষত্ব শুধু গতি নয়, গতিপথ বদলানোর ক্ষমতাও। রকেট বুস্টার ক্ষেপণাস্ত্রকে নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার পর গ্লাইড ভেহিকল বায়ুমণ্ডলের মধ্যে দিয়ে লক্ষ্যের দিকে এগোয়। উড়ানের এই পর্যায়ে গতিপথ পরিবর্তনের ক্ষমতা থাকায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে তার সম্ভাব্য লক্ষ্য ও গতিপথ আগাম নির্ধারণ করা কঠিন হতে পারে।

CSIS-এর তথ্য অনুযায়ী, ডিএফ-১৭-এর আনুমানিক পাল্লা প্রায় ১,৮০০ থেকে ২,৫০০ কিলোমিটার। তবে ক্ষেপণাস্ত্রের নির্দিষ্ট সংস্করণ, উৎক্ষেপণের স্থান ও অন্যান্য পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে প্রকৃত সক্ষমতা বদলাতে পারে। হাইপারসনিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে ‘আটকানো কঠিন’ এবং ‘আটকানো অসম্ভব’—এই দুই দাবিকে এক করে দেখা ঠিক নয়। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করে রাডার, আগাম সতর্কবার্তা, ইন্টারসেপ্টর এবং আক্রমণের পরিস্থিতির উপর।

ইরানকে ঘিরে সংঘাতের মধ্যে আমেরিকার সামরিক ও কূটনৈতিক মনোযোগ পশ্চিম এশিয়ায় কেন্দ্রীভূত হওয়া স্বাভাবিক। এই পরিস্থিতিতে চিনের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন ওয়াশিংটন ও তার এশীয় মিত্রদের কাছে কৌশলগত বার্তা হতে পারে। তবে শুধু সময়ের মিল দেখে বলা যায় না, ইরান যুদ্ধের সুযোগ নেওয়াই ডিএফ-১৭ প্রদর্শনের একমাত্র উদ্দেশ্য। চিন দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী আধুনিক করছে এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার সামরিক উপস্থিতিকে চ্যালেঞ্জ করার মতো সক্ষমতা গড়ে তুলছে।

এই প্রেক্ষাপটে তাইওয়ান প্রশ্নটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে চিন। অন্যদিকে, দ্বীপটির স্বশাসিত রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে ঘিরে আমেরিকার সঙ্গে বেজিংয়ের দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। ডিএফ-১৭-এর মতো ক্ষেপণাস্ত্র তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য সংঘাতে চিনের আঘাত হানার সক্ষমতা বাড়াতে পারে। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও পরিকাঠামোর জন্যও এই ধরনের অস্ত্র উদ্বেগের কারণ।

তবে তাইওয়ানে হামলার সিদ্ধান্ত শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের উপস্থিতির উপর নির্ভর করে না। চিনের রাজনৈতিক হিসাব, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রস্তুতি, সরবরাহ ব্যবস্থা, আমেরিকার প্রতিক্রিয়া এবং জাপান-সহ আঞ্চলিক শক্তিগুলির অবস্থান—সবই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ডিএফ-১৭-এর প্রদর্শনকে সামরিক সক্ষমতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যায়, কিন্তু তা থেকে আসন্ন হামলার সময় বা সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করা যায় না।

ভারতের উদ্বেগের জায়গাটিও উপেক্ষা করার নয়। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (LAC) ঘিরে দীর্ঘদিনের বিরোধ এবং সীমান্তে দুই দেশের সামরিক পরিকাঠামো বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে চিনের আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ভারতের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। লাদাখ, অরুণাচলপ্রদেশ ও সিকিমের মতো কৌশলগত অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে দিল্লিকে চিনের সামরিক গতিবিধি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হয়।

তবে ডিএফ-১৭-এর আনুমানিক পাল্লা জানলেই নির্দিষ্ট কোনও লঞ্চস্থল থেকে লাদাখের কোনও লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত করা সম্ভব কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তার জন্য উৎক্ষেপণস্থলের নির্ভরযোগ্য তথ্য, ক্ষেপণাস্ত্রের বাস্তব পাল্লা এবং সামরিক গোয়েন্দা মূল্যায়ন প্রয়োজন। প্রকাশ্যে আসা তথ্যের ভিত্তিতে ভারত সীমান্তের কাছে নতুন করে ডিএফ-১৭ মোতায়েন হয়েছে বলে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোরও অবকাশ নেই।

ভারতও হাইপারসনিক প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে। প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (DRDO) ২০২৪ সালের নভেম্বরে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি দূরপাল্লার হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষার কথা জানিয়েছিল। তবে পরীক্ষামূলক প্রযুক্তি ও কার্যকর সামরিক ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ভারতের সক্ষমতাকে চিনের ডিএফ-১৭-এর সঙ্গে সরাসরি তুলনা করতে হলে পাল্লা, গতি, নির্ভুলতা, মোতায়েনের মাত্রা এবং বাস্তব ব্যবহারের প্রস্তুতি—সব দিকের নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।

ডিএফ-১৭ নিয়ে উদ্বেগের মূল কারণ, এই ধরনের অস্ত্র প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ও সামরিক পরিকল্পনাকে জটিল করে তুলতে পারে। কিন্তু চিনের সামরিক তথ্যচিত্রে ক্ষেপণাস্ত্রের উপস্থিতি দেখেই আমেরিকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়েছে, কিংবা তাইওয়ানে আক্রমণ আসন্ন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো তথ্যনির্ভর সাংবাদিকতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হবে না।

ইরান যুদ্ধের মধ্যে আমেরিকার মনোযোগের সম্ভাব্য বিভাজন এশিয়ার সামরিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। চিন সেই পরিস্থিতিকে কীভাবে মূল্যায়ন করছে, তা নিয়ে বিশ্লেষণ চলতে পারে। কিন্তু বেজিংয়ের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হলে আরও নির্ভরযোগ্য সামরিক তথ্য এবং সরকারি অবস্থান প্রয়োজন।

চিনের ডিএফ-১৭ তাইওয়ান ঘিরে সামরিক চাপ বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হতে পারে। ভারতের জন্যও চিনের ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীর আধুনিকীকরণ নজরে রাখার বিষয়। কিন্তু মূল প্রশ্ন শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা নয়—এই অস্ত্রের বাস্তব সক্ষমতা, কোথায় তার মোতায়েন এবং আঞ্চলিক সংঘাতের পরিস্থিতিতে তা কীভাবে ব্যবহৃত হতে পারে, তার নির্ভরযোগ্য মূল্যায়নই এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি বুঝতে সবচেয়ে জরুরি।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর