অর্ক সানা: ভারতের বাজারে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা চালু করতে গিয়ে কেন বারবার অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে ইলন মাস্কের সংস্থা স্টারলিঙ্ককে (Starlink)? এই প্রশ্ন তুলেই এবার সরাসরি রিলায়্যান্স ইন্ডাস্ট্রিজের (Reliance Industries) চেয়ারম্যান মুকেশ আম্বানিকে (Mukesh Ambani) নিশানা করেছেন বিশ্বের অন্যতম ধনী শিল্পপতি। সমাজমাধ্যমে তাঁর কটাক্ষ, “আম্বানিই কি ভারতের আসল বস?” এর আগে মাস্কের অভিযোগ ছিল, কয়েক জন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নিজেদের একচেটিয়া আধিপত্য বজায় রাখতে স্টারলিঙ্কের ভারতে প্রবেশ আটকে দিচ্ছেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার সেই অভিযোগ খারিজ করে জানিয়েছে, স্যাটেলাইট যোগাযোগ পরিষেবার অনুমোদন প্রক্রিয়ায় কোনও সংস্থার প্রতি পক্ষপাত করা হচ্ছে না।
বিতর্কটি তাই শুধু দুই ধনকুবেরের ব্যক্তিগত বাকযুদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভারতের টেলিকম বাজারে প্রতিযোগিতা, সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত শর্ত, আর প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের কাছে দ্রুতগতির ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়ার প্রশ্ন। একদিকে রয়েছে জিওর মতো প্রতিষ্ঠিত সংস্থার বিশাল গ্রাহকভিত্তি, অন্যদিকে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেট পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার স্টারলিঙ্কের পরিকল্পনা। এই দুইয়ের মধ্যে প্রতিযোগিতা কীভাবে গড়াবে, তার উপর নির্ভর করতে পারে আগামী দিনে ভারতের ডিজিটাল পরিষেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মাস্কের অভিযোগের সূত্রপাত ৭ অক্টোবর। তাঁর দাবি, কিছু ‘অলিগার্ক’ বা বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী নিজেদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে স্টারলিঙ্কের প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। তবে প্রথম পোস্টে তিনি নির্দিষ্ট করে কারও নাম করেননি, এমন কোনও প্রকাশ্য প্রমাণও দেননি যা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে কোনও নির্দিষ্ট শিল্পগোষ্ঠী অনুমোদন আটকে দিয়েছে। পরে ভারতে স্টারলিঙ্কের পরিষেবা চালুর অনুমতি না পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলতে গিয়ে আম্বানির নাম সরাসরি সামনে আনেন তিনি।
মাস্কের বক্তব্য, স্টারলিঙ্ক ১৬৫টিরও বেশি দেশে পরিষেবা দেওয়ার অনুমতি পেয়েছে এবং ভারতে কাজ শুরু করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে সরকারি নিয়ম মেনে চলার চেষ্টা করছে। তা সত্ত্বেও বাণিজ্যিক পরিষেবা চালুর চূড়ান্ত অনুমোদন না মেলায় তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ভারতীয় গ্রাহকদের সামনে নতুন একটি বিকল্প আসতে বাধা কোথায়। ১০ অক্টোবরের পোস্টে আম্বানিকে ব্যঙ্গ করে ‘প্রধানমন্ত্রী আম্বানি’ সম্বোধনও করেন তিনি। এই মন্তব্যের মাধ্যমে ভারতের ব্যবসা ও নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে বড় শিল্পপতিদের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মাস্ক। তবে তাঁর বক্তব্যকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা জরুরি—এটি কোনও প্রমাণিত সিদ্ধান্ত নয়।
কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য অবশ্য সম্পূর্ণ আলাদা। যোগাযোগ মন্ত্রক জানিয়েছে, ভারতের স্যাটেলাইট যোগাযোগ পরিষেবার নিয়ন্ত্রক কাঠামো ন্যায্য এবং বৈষম্যহীন। স্টারলিঙ্ক, জিও স্যাটেলাইট কমিউনিকেশনস (Jio Satellite Communications) এবং ইউটেলস্যাট ওয়ানওয়েব (Eutelsat OneWeb)—এই সংস্থাগুলি নিরাপত্তা মূল্যায়ন-সহ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। সরকারের দাবি, কোনও সংস্থাকে আলাদা করে আটকে রাখা হয়নি; বাণিজ্যিক পরিষেবা চালুর আগে সংশ্লিষ্ট নিয়ম ও নিরাপত্তার শর্ত পূরণ করা বাধ্যতামূলক।
স্টারলিঙ্কের পরিষেবা চালু করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির মধ্যে রয়েছে নিরাপত্তা ছাড়পত্র ও স্পেকট্রাম বরাদ্দ। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তথ্য কোথা দিয়ে চলাচল করবে, নেটওয়ার্কের উপর ভারতীয় কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ থাকবে কি না এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে কীভাবে সহযোগিতা করা হবে—এসব বিষয় সরকারকে খতিয়ে দেখতে হয়। তাই প্রাথমিক অনুমোদন বা লাইসেন্স পাওয়ার অর্থ এই নয় যে কোনও সংস্থা সঙ্গে সঙ্গেই সাধারণ গ্রাহকদের কাছে পরিষেবা বিক্রি শুরু করতে পারবে।
এখানেই রয়েছে বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ ফারাক। মাস্ক অনুমোদনে বিলম্বকে প্রতিযোগিতা আটকে দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। কেন্দ্র বলছে, সব সংস্থাকেই নিরাপত্তা সংক্রান্ত শর্ত পূরণ করতে হবে। প্রকাশ্যে পাওয়া তথ্য থেকে এখনও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে আম্বানি বা রিলায়্যান্সের হস্তক্ষেপেই স্টারলিঙ্কের পরিষেবা চালু হতে দেরি হচ্ছে। একই সঙ্গে, অনুমোদন প্রক্রিয়ার সময়সীমা ও শর্ত নিয়ে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা থাকলে এই বিতর্কের অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে।
ভারতের টেলিকম বাজারে মুকেশ আম্বানির প্রভাব অবশ্য অস্বীকার করার উপায় নেই। রিলায়্যান্সের জিও দেশের বৃহত্তম মোবাইল পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলির একটি। বিপুল গ্রাহকভিত্তি, বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এবং ডিজিটাল পরিষেবার পরিসর জিওকে বাজারে শক্তিশালী অবস্থান দিয়েছে। পাশাপাশি, জিও নিজেও স্যাটেলাইট যোগাযোগের ব্যবসায় প্রবেশ করতে চাইছে। ফলে স্টারলিঙ্কের সঙ্গে ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থার ব্যবসায়িক স্বার্থ থাকা আর সেই সংস্থা সরকারি অনুমোদন আটকে দিচ্ছে—এই দুইয়ের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। দ্বিতীয় দাবিটির পক্ষে নির্দিষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন।
স্টারলিঙ্কের প্রযুক্তি প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ফাইবার ব্রডব্যান্ডের থেকে আলাদা। নিম্ন-পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা উপগ্রহের মাধ্যমে ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়াই এই পরিষেবার মূল পদ্ধতি। পাহাড়ি এলাকা, প্রত্যন্ত গ্রাম, দ্বীপাঞ্চল কিংবা যেখানে ফাইবার সংযোগ বসানো কঠিন, সেখানে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট কার্যকর বিকল্প হতে পারে। দুর্যোগের সময় প্রচলিত যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এই প্রযুক্তি সংযোগ বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে—যদিও বাস্তবে তা নির্ভর করবে পরিষেবার পরিকাঠামো, কভারেজ ও পরিস্থিতির উপর।
তবে স্টারলিঙ্ক এলেই ভারতের ডিজিটাল বৈষম্য দূর হয়ে যাবে, এমন ধারণাও ঠিক নয়। গ্রাহকের বাড়িতে প্রয়োজনীয় যন্ত্র বসানোর খরচ, মাসিক পরিষেবা মূল্য, বিদ্যুৎ এবং নির্ভরযোগ্য সংযোগ—সবই ব্যবহারযোগ্যতার উপর প্রভাব ফেলবে। সাধারণ মোবাইল ডেটার তুলনায় স্যাটেলাইট ইন্টারনেট কতটা সাশ্রয়ী হবে, তা পরিষেবা চালু হলে বাস্তব মূল্য ও শর্তের ভিত্তিতেই বিচার করা সম্ভব। প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের কাছে সংযোগ পৌঁছনোর সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমনই খরচ বেশি হলে তার ব্যবহার সীমিতও থাকতে পারে।
এই বিতর্কে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। স্যাটেলাইট যোগাযোগ সীমান্ত পেরিয়ে কাজ করতে পারে; ফলে নেটওয়ার্ক পরিচালনা, তথ্যের অবস্থান, নজরদারি ও জরুরি পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতার মতো বিষয়গুলি উপেক্ষা করা যায় না। স্টারলিঙ্কের তরফে ভারতে পরিকাঠামো তৈরির কথা বলা হলেও, বাণিজ্যিক পরিষেবা চালুর জন্য সরকারের নির্ধারিত সব শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, সেটিই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার স্বার্থে নিরাপত্তা যাচাই বাদ দেওয়া যেমন যুক্তিযুক্ত নয়, তেমনই নিরাপত্তার কথা বলে অনুমোদন অনির্দিষ্টকাল ঝুলিয়ে রাখার ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন।
আম্বানি ও মাস্কের এই সংঘাতের প্রভাব তাই দুই সংস্থার ব্যবসার বাইরেও যেতে পারে। ভারতের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট বাজারে একাধিক সংস্থা কাজ করতে পারলে গ্রাহকদের বিকল্প বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। তবে সেই প্রতিযোগিতা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে লাইসেন্স, স্পেকট্রাম, নিরাপত্তা ছাড়পত্র, দাম এবং পরিষেবার মানের উপর। শুধু নতুন সংস্থা বাজারে ঢুকলেই দাম কমবে বা পরিষেবা উন্নত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
শেষ পর্যন্ত, “আম্বানি কী ভারতের আসল বস?”—মাস্কের এই প্রশ্ন যতটা রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হল ভারতের নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা কতটা স্বচ্ছ এবং প্রতিযোগিতার সুযোগ কতটা সমান। স্টারলিঙ্কের প্রবেশে বিলম্বের ব্যাখ্যা সরকারকে দিতে হবে নিয়ম ও প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে; আর মাস্কের অভিযোগের পক্ষে প্রমাণও প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন। ব্যক্তিগত কটাক্ষের বাইরে এই দুই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে, ভারতের স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে।



