অর্ক সানা: মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের এই বড় জয় শুধু আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতি, ইরান যুদ্ধ এবং বাণিজ্যনীতিতেও নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। বিশেষ নজর ভারতের, কারণ ওয়াশিংটনের শুল্কনীতি ও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে দীর্ঘ টানাপড়েনের মধ্যে এই ফল দিল্লিকে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। তবে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেই যে ট্রাম্পের হাতে থাকা নির্বাহী ক্ষমতা শেষ হয়ে যাবে, এমন নয়।
এই নির্বাচনের রাজনৈতিক তাৎপর্য বুঝতে হলে প্রথমেই দেখতে হবে, আমেরিকার ভোটাররা ঠিক কোন প্রশ্নে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন। ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাত, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং আমদানি শুল্কের প্রভাব—সব মিলিয়ে অর্থনীতি ও যুদ্ধনীতি নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছিল। ডেমোক্র্যাটদের জয় তাই শুধু বিরোধী দলের আসন বৃদ্ধি নয়; ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের নীতির উপর ভোটারদের অসন্তোষেরও একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা।
কংগ্রেসে ক্ষমতার সমীকরণ বদল, কিন্তু ট্রাম্প কি ক্ষমতাহীন?
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভস এবং সেনেট—দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। এর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা, সরকারি ব্যয় অনুমোদন এবং গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের ক্ষেত্রে বিরোধীদের বাধা দেওয়ার ক্ষমতা বাড়ল। পাশাপাশি প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্ত, শুনানি এবং নথি তলবের মতো সাংবিধানিক নজরদারিও জোরদার করতে পারবে ডেমোক্র্যাটরা।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে থাকা ক্ষমতা কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠতার সঙ্গে সরাসরি শেষ হয়ে যায় না। বিদেশনীতি পরিচালনা, সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং নির্দিষ্ট আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করে শুল্ক আরোপের সুযোগ ট্রাম্পের হাতে থাকছে। কংগ্রেস কোনও বিল পাশ করলেও প্রেসিডেন্ট ভেটো দিতে পারেন। সেই ভেটো অতিক্রম করতে দুই কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন, যা ডেমোক্র্যাটদের বর্তমান জয়ের ফলেই নিশ্চিত হচ্ছে না।
অর্থাৎ, আগামী দিনে হোয়াইট হাউস ও কংগ্রেসের মধ্যে সংঘাত বাড়তে পারে, কিন্তু ট্রাম্পের নীতি রাতারাতি বদলে যাবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর কারণ নেই। বরং আইন, বাজেট এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক দরকষাকষি আরও কঠিন হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ইরান যুদ্ধ: শান্তির পথে চাপ বাড়বে, নাকি সংঘাত আরও তীব্র হবে?
নির্বাচনের ফলের আন্তর্জাতিক প্রভাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলির একটি ইরান। আট মাস ধরে চলা সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব আমেরিকার ভোটারদের উপর পড়েছে। বিশেষ করে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থন কমেছে বলে নির্বাচনী ফলের পর বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। ট্রাম্প নিজেও রিপাবলিকানদের নির্বাচনী ধাক্কার পিছনে ইরান যুদ্ধের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন।
রয়টার্সের (Reuters) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি সরকার মনে করছে, নির্বাচনী ধাক্কার পর ট্রাম্পের কাছে সংঘাত থামিয়ে সমঝোতায় পৌঁছনোর প্রণোদনা বাড়তে পারে। নতুন করে বড় আকারের সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনাও কমতে পারে বলে ওই সরকারগুলির সঙ্গে পরিচিত সূত্রের ধারণা। তবে এটি কোনও মার্কিন নীতিগত ঘোষণা নয়; পরিস্থিতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলির মূল্যায়ন মাত্র।
অন্যদিকে, ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ শুধু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলের উপর নির্ভর করছে না। সামরিক পরিস্থিতি, ইজরায়েলের অবস্থান, উপসাগরীয় দেশগুলির নিরাপত্তা এবং তেহরানের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা—সব কিছুর উপর নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপ। ট্রাম্প রাজনৈতিক চাপে পড়ে আলোচনার পথ বেছে নেবেন, নাকি সামরিক পদক্ষেপে আরও কঠোর হবেন, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
ভারতের জন্য স্বস্তির জায়গা কোথায়?
এই নির্বাচনের ফল ভারতের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কারণে। আমেরিকা ভারতের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি বাজার। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি সরাসরি প্রভাব ফেলে ভারতীয় পণ্য, উৎপাদক এবং রপ্তানিকারকদের উপর। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা চললেও কৃষি, ডিজিটাল বাণিজ্য এবং বাজারে প্রবেশাধিকারের মতো বিষয়গুলি নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।
ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের একতরফা শুল্কনীতি নিয়ে নজরদারি বাড়তে পারে। ভারতের প্রাক্তন বাণিজ্যসচিব অনুপ ওয়াধওয়ানের বক্তব্য অনুযায়ী, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদল ট্রাম্পের ইচ্ছামতো শুল্ক আরোপের ক্ষমতার উপর কিছুটা চাপ তৈরি করতে পারে। দিল্লির পক্ষে এটি আলোচনার ক্ষেত্রে স্বস্তির জায়গা হতে পারে।
তবে ভারতের বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আশাবাদী হওয়ার পাশাপাশি সতর্ক থাকার কারণও রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন অতীতে জাতীয় নিরাপত্তা বা অন্যায্য বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার যুক্তিতে বিভিন্ন আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করে শুল্ক আরোপ করেছে। মার্কিন বাণিজ্য আইনের ২৩২ ও ৩০১ ধারার মতো ব্যবস্থার মাধ্যমে কংগ্রেসের সরাসরি অনুমোদন ছাড়াও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আমদানি নিয়ন্ত্রণ বা শুল্ক আরোপের সুযোগ রয়েছে। ফলে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও ট্রাম্পের শুল্কনীতির সব পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না।
ভারতের জন্য আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল রাশিয়া থেকে তেল আমদানি। রাশিয়ার জ্বালানি কেনা নিয়ে ওয়াশিংটনের আপত্তি এবং সেই সূত্রে অতিরিক্ত শুল্কের সম্ভাবনা দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় চাপ তৈরি করেছে। অর্থাৎ, কংগ্রেসে ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হলেও রাশিয়া, জ্বালানি ও বাণিজ্য নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান যে বদলাবে, তার নিশ্চয়তা নেই।
বাণিজ্যচুক্তিতে কি ভারতের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়বে?
ভারত-মার্কিন বাণিজ্যচুক্তির আলোচনা দীর্ঘদিন ধরেই একাধিক জটিলতায় আটকে রয়েছে। আমেরিকার দাবি, ভারতীয় বাজারে মার্কিন পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়াতে হবে। অন্যদিকে, কৃষি ও দুগ্ধ-সহ সংবেদনশীল ক্ষেত্রগুলিতে দেশীয় উৎপাদকদের স্বার্থ রক্ষা করতে চায় নয়াদিল্লি। ডিজিটাল বাণিজ্য এবং শিল্পপণ্যের বাজার নিয়েও দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্য আলোচনার উপর রাজনৈতিক নজরদারি বাড়তে পারে। এতে ভারতের পক্ষে একতরফা শর্তের বিরোধিতা করা বা আলোচনায় সময় নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন। তবে আমেরিকার বাণিজ্যনীতিতে সুরক্ষাবাদী মনোভাব শুধু রিপাবলিকানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেও দেশীয় শিল্প ও কর্মসংস্থান রক্ষায় শুল্কের পক্ষে সমর্থন রয়েছে। ফলে কংগ্রেসে দল বদলালেই আমেরিকার সামগ্রিক বাণিজ্যনীতি উদার হয়ে যাবে, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
চিন, রাশিয়া ও ইউরোপের জন্য কী বার্তা?
ট্রাম্পের নির্বাচনী ধাক্কা শুধু ভারত নয়, আমেরিকার অন্য বাণিজ্যিক অংশীদার এবং কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। শুল্কের হুমকি ও বাণিজ্যিক চাপের মুখে থাকা দেশগুলি এখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় কিছুটা বেশি সময় নিতে পারে। চিনের ক্ষেত্রেও এই পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাণিজ্য ও প্রযুক্তি নিয়ে দুই দেশের বিরোধে মার্কিন কংগ্রেসের ভূমিকা বাড়তে পারে।
ইউরোপের দেশগুলির কাছেও নির্বাচনের ফল নতুন হিসাব তৈরি করছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, প্রতিরক্ষা ব্যয়, বাণিজ্যিক শুল্ক এবং প্রযুক্তি সংক্রান্ত বিধিনিয়ন্ত্রণ—এই সব ক্ষেত্রেই ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতপার্থক্য রয়েছে। কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ইউরোপের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কের উপর কিছুটা ভারসাম্য আনতে পারে, যদিও বিদেশনীতি নির্ধারণে প্রেসিডেন্টের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
এই নির্বাচনের পর ভারতের সামনে একই সঙ্গে সুযোগ এবং অনিশ্চয়তা—দুই-ই রয়েছে। একদিকে, কংগ্রেসে বিরোধীদের নিয়ন্ত্রণ ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি ও বিদেশনীতি নিয়ে চাপ বাড়াতে পারে। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্টের হাতে থাকা নির্বাহী ক্ষমতা এবং আমেরিকার দুই দলের মধ্যেই বাণিজ্য সুরক্ষাবাদের সমর্থন ভারতের জন্য ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করছে না।
ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে সংঘাত কমানোর রাজনৈতিক চাপ তৈরি হলেও সামরিক পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক সমীকরণই শেষ পর্যন্ত বড় ভূমিকা নেবে। আর ভারত-মার্কিন বাণিজ্যচুক্তির ক্ষেত্রে দিল্লির মূল লক্ষ্য থাকবে কৃষি ও দেশীয় শিল্পের স্বার্থ বজায় রেখে আলোচনায় অগ্রসর হওয়া।
সুতরাং, ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলকে ট্রাম্পের নীতির সম্পূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা যাবে না। বরং তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথে নতুন রাজনৈতিক বাধা, কংগ্রেসের নজরদারি এবং আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে পরিবর্তিত পরিস্থিতি—এই তিনটি বিষয়ই আগামী দিনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।



