জেপি আন্দোলন থেকে আন্না হাজারে, এবার CJP: সরকারবিরোধী প্রতিবাদে বারবার কেন ওঠে ‘বিদেশি হাতের’ অভিযোগ?

জেপি আন্দোলন, আন্না হাজারের অনশন ও সাম্প্রতিক প্রতিবাদ—তিন ভিন্ন রাজনৈতিক পর্বে ‘বিদেশি হাত’ অভিযোগের প্রেক্ষাপট কী?

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

অর্ক সানা: ভারতের রাজনীতিতে সরকারবিরোধী আন্দোলন নতুন নয়। দুর্নীতির অভিযোগে গণআন্দোলন, নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রতিবাদ কিংবা সরকারের নীতির বিরোধিতা—বিভিন্ন সময়ে এমন আন্দোলনের মুখে পড়েছে দেশের ক্ষমতাসীন সরকার। আর সেই আন্দোলনকে ঘিরে বারবার সামনে এসেছে একটি পরিচিত অভিযোগ—‘বিদেশি হাত’।

জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলন থেকে আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন, আর সাম্প্রতিক সময়ে সরকারবিরোধী প্রতিবাদ—প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও আন্দোলনের পিছনে বিদেশি শক্তির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার নজির রয়েছে ভারতীয় রাজনীতিতে। কখনও এই অভিযোগ তুলেছেন শাসক দলের নেতারা, কখনও বিদেশি প্রভাবের আশঙ্কা সামনে এসেছে রাজনৈতিক বিতর্কে। কিন্তু কোন পরিস্থিতিতে এই অভিযোগ ওঠে? অতীতের ঘটনাগুলির সঙ্গে বর্তমান বিতর্কের মিল ও অমিল কোথায়?

জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলন ও ‘বিদেশি হাত’-এর বিতর্ক

১৯৭০-এর দশকে দুর্নীতি, মূল্যবৃদ্ধি ও সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষকে কেন্দ্র করে বিহারে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন ক্রমে জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে। জয়প্রকাশ নারায়ণ—যিনি জেপি নামেই বেশি পরিচিত—এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। তাঁর নেতৃত্বে আন্দোলন দেশের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করে।

১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা জারির আগে ও পরে বিরোধী আন্দোলনকে ঘিরে বিদেশি শক্তির ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ সামনে আসে। তৎকালীন সরকার ও তার সমর্থকদের একাংশ আন্দোলনকে দেশের স্থিতিশীলতার জন্য বিপজ্জনক বলে তুলে ধরেছিলেন। অন্যদিকে, আন্দোলনের নেতৃত্বের বক্তব্য ছিল, দুর্নীতি ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গণতান্ত্রিক অধিকার।

তবে কোনও আন্দোলনকে বিদেশি শক্তির প্রভাবাধীন বলে দাবি করা এবং সেই দাবির পক্ষে যাচাইযোগ্য প্রমাণ থাকা এক বিষয় নয়। জেপি আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বুঝতে গেলে সেই সময়ের সরকার-বিরোধী অসন্তোষ, বিরোধী দলগুলির ভূমিকা এবং জরুরি অবস্থার মতো ঘটনাকেও বিবেচনায় রাখতে হয়।

আন্না হাজারের আন্দোলন: দুর্নীতিবিরোধী প্রতিবাদ ঘিরে প্রশ্ন

২০১১ সালে আন্না হাজারের নেতৃত্বে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন জাতীয় রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলেছিল। লোকপাল আইন প্রণয়নের দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তর ও রামলীলা ময়দানে তাঁর অনশন এবং আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে সমর্থন তৈরি হয়। তৎকালীন ইউপিএ সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে জনপরিসরে তীব্র আলোচনা চলছিল।

সেই আন্দোলন ঘিরেও বিদেশি সমর্থন ও প্রভাবের প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। কংগ্রেসের কয়েকজন নেতা আন্দোলনের পদ্ধতি এবং তার পিছনে থাকা সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তখন স্পষ্ট করা হয়েছিল, আন্না হাজারের আন্দোলনে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন বা হস্তক্ষেপের অভিযোগের ভিত্তি নেই।

এই পর্বে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল দুর্নীতির অভিযোগ, লোকপাল গঠনের দাবি এবং আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের উপর চাপ তৈরির কৌশল। বিদেশি প্রভাব নিয়ে যে বক্তব্যগুলি সামনে এসেছিল, সেগুলিকে সংশ্লিষ্ট নেতাদের অভিযোগ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন; সেগুলি নিজে থেকেই বিদেশি হস্তক্ষেপের প্রমাণ হয়ে ওঠে না।

বর্তমান বিতর্কে কেন ফিরে আসছে ‘বিদেশি হাত’ প্রসঙ্গ?

সাম্প্রতিক সময়ে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR, পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ এবং বিভিন্ন সরকারবিরোধী প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোর হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আন্দোলন, বিরোধী দলের ভূমিকা এবং দেশের ভাবমূর্তি নিয়ে শাসক শিবিরের কয়েকজন নেতা বক্তব্য রেখেছেন। তাঁদের বক্তব্যে কখনও অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা, কখনও বিদেশি শক্তির মদতপুষ্ট ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উঠে এসেছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী-সহ বিজেপির একাধিক নেতা বিভিন্ন সময়ে বিরোধী প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিজেপি নেতাদের বক্তব্যে দেশের স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এবং সরকারের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রচারের প্রসঙ্গ এসেছে। অন্যদিকে, বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীরা তাঁদের প্রতিবাদকে গণতান্ত্রিক অধিকার, নির্বাচনী স্বচ্ছতা এবং সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে তুলে ধরেছেন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে: সরকারবিরোধী আন্দোলন, রাজনৈতিক প্রচার এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ—তিনটি আলাদা বিষয়। কোনও আন্দোলন সরকারের সমালোচনা করছে বলেই সেটিকে বিদেশি শক্তির পরিচালিত বলা যায় না। আবার বিদেশি হস্তক্ষেপের নির্দিষ্ট অভিযোগ উঠলে তার মূল্যায়নের জন্য প্রমাণ, তদন্তের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন।

একই অভিযোগ, কিন্তু সব আন্দোলনের প্রেক্ষাপট এক নয়

জেপি আন্দোলন, আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন এবং বর্তমান রাজনৈতিক প্রতিবাদকে একই ধরনের ঘটনা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। প্রতিটি আন্দোলনের সময়কাল, দাবি, নেতৃত্ব, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং জনসমর্থনের ধরন আলাদা।

জেপি আন্দোলন হয়েছিল জরুরি অবস্থার আগের রাজনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে। আন্না হাজারের আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল দুর্নীতি ও লোকপাল আইন। সাম্প্রতিক প্রতিবাদগুলির মধ্যে রয়েছে ভোটার তালিকা সংশোধন, পরীক্ষায় অনিয়ম এবং বিভিন্ন সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরোধিতা। ফলে ‘বিদেশি হাত’ শব্দবন্ধটি বিভিন্ন সময়ে ব্যবহৃত হলেও তার সঙ্গে যুক্ত অভিযোগ ও পরিস্থিতি আলাদা করে যাচাই করা জরুরি।

রাজনৈতিক বক্তব্যে এই শব্দবন্ধ ব্যবহারের ফলে আন্দোলনের দাবি থেকে আলোচনা সরে গিয়ে আন্দোলনের উৎস ও উদ্দেশ্য নিয়ে বিতর্ক তৈরি হতে পারে। তবে কোনও নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে এমন প্রভাব পড়েছে কি না, তা বুঝতে সংশ্লিষ্ট বক্তব্য, ঘটনাক্রম এবং প্রামাণ্য তথ্যের দিকে নজর দিতে হয়।

অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রমাণই মূল বিষয়

ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘বিদেশি হাত’ অভিযোগের পুনরাবৃত্তি একটি লক্ষণীয় বিষয়। কিন্তু এই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য প্রমাণের গুরুত্ব রয়েছে। কোনও আন্দোলনে বিদেশি অর্থায়ন, সংগঠন বা নির্দেশনার অভিযোগ উঠলে তার সমর্থনে নির্দিষ্ট তথ্য থাকা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে, সরকারবিরোধী প্রতিবাদকে শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে বিদেশি ষড়যন্ত্র বলে চিহ্নিত করাও তথ্যনির্ভর মূল্যায়নের বিকল্প নয়। আন্দোলনের দাবি, তার নেতৃত্ব, অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্য এবং সরকারি প্রতিক্রিয়া—সবকিছুকেই পৃথকভাবে যাচাই করতে হয়।

জেপি থেকে আন্না হাজারে, আর বর্তমানের সরকারবিরোধী প্রতিবাদ—ভারতের রাজনৈতিক পরিসরে ‘বিদেশি হাত’ শব্দবন্ধটি বারবার ফিরে এসেছে। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই মূল প্রশ্ন একটাই: অভিযোগটি কে তুলছেন, কোন তথ্যের ভিত্তিতে তুলছেন এবং সেই দাবির পক্ষে যাচাইযোগ্য প্রমাণ কতটা রয়েছে?

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর