নজরবন্দি ব্যুরোঃ নিজের জালে কি নিজেই জড়াচ্ছেন শুভেন্দু? জল মাপতে মাপতে কি দেরী করে ফেলছেন শুভেন্দু? নিজের ওজন কি নিজেই কমিয়ে ফেলছেন মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র? রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে এই জল্পনাই কারণ শুভেন্দু অধিকারী ঠিক কি করতে চলেছেন তা তিনি এখনও স্পষ্ট করছেন না। হতদ্যম হয়ে পড়ছে অনুগামীরাও! ভবিষ্যতে কোনদিকে ঝুঁকবেন তাদের নেতা তা নিয়ে ধোঁয়াশায় তারা। গত প্রায় দুই মাস ধরেই চলছে শুভেন্দু-তৃনমূল দ্বন্দ। তৃনমূলের অন্দরে মমতা ব্যানার্জির পর একমাত্র ক্রাউড পুলার হিসেবে পরিচিত শুভেন্দুর উত্থান সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম পর্ব থেকেই।
আরও পড়ুনঃ সামনে ভোট, মহারাষ্টের মতোই প্রত্যাঘাতে জোটবদ্ধ রাজ্যের শিক্ষককূল!


বিশেষ করে নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এরপর পূর্ব মেদিনীপুরের গন্ডি ছাড়িয়ে পশ্চিমেও তৎকালীন শাসক দল সিপিআই(এম) এর সাথে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।এ হেন শুভেন্দুকে একসময় সাতটি জেলার দায়িত্ব দিয়েছিলেন দলনেত্রী। মূর্শিদাবাদ সহ একাধিক কঠিন জেলায় চলেছিল শুভেন্দু ম্যাজিক। শক্তিশালী হয়েছিল তৃনমূল। কিন্তু তারপরই ঘটে ছন্দপতন। ডানা ছাঁটা শুরু হয় তার। এর পেছনে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা ছিল বলেই মনে করেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। বহুদিন অবধি প্রকাশ্যে কিছু না বললেও গত দুইমাস ধরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত। দলের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কার্যত যুদ্ধ ঘোষনা করে একেরপর এক ‘অরাজনৈতিক’ সভা করেছেন শুভেন্দু৷
বলেছেন, “হেলিকপ্টারেও নামিনি, প্যারাশুটেও নামিনি” র মত ইঙ্গিতপূর্ণ কথা। ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিয়েছেন দলের সাথে সরাসরি বিরোধেই যাচ্ছেন তিনি৷ এই সভার প্রায় প্রতিটিটেই প্রচুর ভিড় হয়েছে অথচ স্পষ্ট কোনো রাজনৈতিক বার্তা আসেনি মঞ্চ থেকে। শুভেন্দু কি বিজেপিতে যাচ্ছেন নাকি শেষমেশ থেকে যাবেন তৃনমূলেই? বিজেপি নেতাদের পাশাপাশি কেন অধীর চৌধুরীও দিনরাত প্রসংসা করছেন মূর্শিদাবাদে তৃনমূলের হয়ে কংগ্রেস ভাঙার কারিগর শুভেন্দুর? এইসব নানা প্রশ্নে দ্বিধাবিভক্ত থেকেছে রাজনৈতিক মহল।
ঘনিষ্ঠ মহলে তিনি জানিয়েছিলেন অভিষেকের পাশাপাশি পিকে কে নিয়েও তার অসোয়াস্তির কথা। এরপরই সটান পিকে চলে যান শুভেন্দুর বাড়ি। তার সাথে দেখা না হলেও কথা হয় তার বাবা শিশির অধিকারীর সাথে। ফোনে কথা হয় শুভেন্দুর সাথে। তারপর থেকেই বরফ গলার কিছু ইঙ্গিত ছিল। তৃনমূলের তরফে সৌগত রায় টানা চেষ্টা করে গিয়েছেন মধ্যস্ততার৷ অবশেষে তিনি সফল হন। সবাইকে চমকে দিয়ে উত্তর কলকাতার এক বাড়িতে সৌগত রায়, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে শুভেন্দু মুখোমুখি বসেন অভিষেকের সাথে। থাকেন পিকেও। ফোনে কথা হয় মমতার সাথেও। খাবারদাবার সহযোগে বৈঠক ইতিবাচক ও সফল বলে জানিয়ে দেয় দল। সৌগত রায় বলেন, ‘সব মিটে গেছে, একসাথে কাজ করতে হবে’। হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন তৃনমূল কর্মীরা। কিন্তু পাশা উল্টাতে সময় লাগে মাত্র ১৪ ঘন্টা।


পরেরদিন সকালেই সৌগত বাবুকে হ্যোয়াটস্যাপ করেন শুভেন্দু। জানান, তিনি কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই বা তার সমস্যা সমাধানের আগেই দলের তরফে বলে দেওয়া হল সব ঠিক হয়ে গেছে। এতে তিনি অসন্তুষ্ট। এও জানান, এরপরে আর একসাথে কাজ করা সম্ভব নয়৷ নাটকীয়ভাবে আবার তৈরি হয় টানাপোড়েন। শুভেন্দুর উপর চরম বিরক্ত হয় দলের হাইকম্যান্ড। সৌগত জানিয়ে দেন শুভেন্দুর সাথে আর কথা বলা হবে না। বার্তা স্পষ্ট করেন দলনেত্রীও। এদিন দলীয় এক সভায় পূর্ব মেদিনীপুরের তৃনমূল সভাপতি শুভেন্দুর বাবা শিশির অধিকারীকে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দেন যে দলে থেকে যারা দলের ক্ষতি করছেন, যাদের দলে থাকার ইচ্ছে নেই তাদের দল থেকে তাড়িয়ে দিন। শুভেন্দু ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের বিরুদ্ধে এই কদিজে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নিয়েছে তৃনমূল। সুতরাং শুভেন্দুকে খরচের খাতায় ধরে নিয়েই আক্রমনাত্মক হচ্ছেন মমতা। আর এখানেই প্রশ্ন উঠছে শুভেন্দুর অবস্থান নিয়ে।
নিজের জালে কি নিজেই জড়াচ্ছেন শুভেন্দু? অনেকেই বলছেন দলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নেমে ওজন বাড়ানোর যে খেলায় শুভেন্দু নেমেছিলেন তাতে অনেকখানি সফলও হয়েছিলেন। এরপর সেদিনের বৈঠকের পর আবার দলের কাজে ফিরে গেলেই তা শুভেন্দুর জন্য সম্মানজনক হত৷ কিন্তু তা না করে তিনি যে পথ নিলেন তাতে কতখানি লাভ হবে তা নিয়ে সন্দিহান শুভেন্দুর সমর্থকরাও। তারা বলছেন, প্রথমত তৃনমূলের যে অগণিত সমর্থক যারা শুভেন্দুকে ভালোবাসে তারাও বিরাগভাজন হলেন সেদিনের বৈঠকের পরেও আবার তাঁর বেঁকে বসায়। দ্বিতীয়ত ক্রমশ দিশাহীন হয়ে পড়ছেন শুভেন্দুর অনুগামীরাও। কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশ তাদের সামনে নেই। এছাড়াও রাজনৈতিক মহল যেটা মনে করছেন চাইলেও বিজেপিতে যাওয়া মুশকিল শুভেন্দুর পক্ষে।
দুই মেদিনীপুর সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় শুভেন্দুর সমর্থকদের মধ্যে একটা বড় অংশ সংখ্যালঘু। বিজেপিতে গেলে তাদের সমর্থন হারানোর সম্ভাবনা। দরজা বন্ধ না করলেও দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান স্পষ্ট না করায় শুভেন্দু সম্পর্কে খানিকটা অনাগ্রহী হয়ে পড়ছে বিজেপিও। পুরোনো দল কংগ্রেসে ফিরে যাওয়া বা নতুন দল গড়ার কথা ভাবাও এই পরিস্থিতিতে তেমন বুদ্ধিমানের কাজ নয় বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা৷ এই পরিস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত যদি তাকে তৃনমূলেই থেকে যেতে হয় তাহলে তা হবে তার পক্ষে নিতান্তই অসম্মানের।
তাই ‘দাদার অনুগামীরা’ও এবার মনে করছেন বিরাট প্রত্যাশার ফানুস উড়িয়েও নিজেরই ভুল রাজনৈতিক পদক্ষেপে নিজের খেলা নিজেই গুলিয়ে দিচ্ছেন শুভেন্দু। অযথা কঠিন করছেন নিজের পথ। তাই রাজ্য রাজনীতির নজর এখন ক্ষুদিরামের মাটিতে জন্ম নেওয়া এক রাজনীতিকের দিকেই। জননেতা থেকে ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক হওয়ার দিকে এগোবেন শুভেন্দু নাকি শেষ মুহূর্তে অপেক্ষা করছে কোন্য চমক। উত্তর লুকিয়ে রয়েছে সময়ের গর্ভেই৷







