তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে প্রায় ১৭ বছরের রাজনৈতিক সম্পর্কের ইতি টেনে লোকসভায় বিদ্রোহী সাংসদদের ব্লকে নাম লিখিয়েছেন শতাব্দী রায়। কেন এই সিদ্ধান্ত? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা ও আবেগ অটুট থাকার পরেও কেন দল থেকে দূরত্ব বাড়ল? একান্ত সাক্ষাৎকারে সেই প্রশ্নেরই জবাব দিলেন বীরভূমের সাংসদ। একইসঙ্গে নতুন বিজেপি সরকার এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাজেরও প্রশংসা করলেন তিনি।
বিদ্রোহী সাংসদদের নতুন ব্লক গঠনের প্রসঙ্গে শতাব্দী স্পষ্ট জানান, তিনি কাউকে ডাকেননি, বরং তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তাঁর কথায়, এই নতুন ব্লক কোনও ব্যক্তিগত স্বার্থের জায়গা নয়, বরং দলের বর্তমান কার্যপদ্ধতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক। তিনি বলেন, “আমরা বোঝাতে চাইছি, যেসব ভুল হচ্ছে তার সঙ্গে আমরা একমত নই।”
তবে রাজনৈতিক অবস্থান বদলালেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি আবেগে কোনও ভাটা পড়েনি বলে দাবি করেছেন শতাব্দী। তিনি বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রয়েছে। এখনও বিশ্বাস করতে পারি না যে আমি তাঁর সঙ্গে নেই। মুখ্যমন্ত্রী বলতে গেলেও একবার থামি, ভাবি কার কথা বলছি।”
বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর কোনও সরাসরি কথা হয়নি বলেও জানান সাংসদ। কিছুটা অভিমান প্রকাশ করে তিনি বলেন, “এখানে আসার আগে দিদি যদি একবার ফোন করতেন, ভালো লাগত। হয়তো অনেক অভিমান কমে যেত। কিছু কথা বলার সুযোগ পেতাম।”
দল ছাড়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শতাব্দী বলেন, তৃণমূলের ভিতরে ধীরে ধীরে এমন পরিবেশ তৈরি হয়েছিল যেখানে কর্মী বা জনপ্রতিনিধিদের মতামত গুরুত্ব পেত না। তাঁর অভিযোগ, দলের ভেতরে সঠিক পরামর্শ উপেক্ষা করে বারবার ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং সেই ভুলের সংশোধনের চেষ্টাও হয়নি।
শতাব্দীর কথায়, “কেউ যদি আমার কথা না শুনে সঠিক কাজ করে, আমি তার সঙ্গেই থাকব। কিন্তু ভুলের পর ভুল করে যদি সেটাকেই সমর্থন করা হয়, তাহলে সেখানে থাকার অর্থ কী?” তিনি আরও দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরে দলের অভ্যন্তরীণ সমস্যার কথা বলা হলেও কার্যকর কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে বাংলায় নতুন বিজেপি সরকারের কাজ নিয়েও ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন শতাব্দী। তাঁর মতে, ক্ষমতায় আসার পর অল্প সময়ের মধ্যেই একাধিক জনমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। মহিলাদের জন্য বিনামূল্যে বাস পরিষেবা এবং অন্নপূর্ণা যোজনার মতো উদ্যোগের উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমি ভেবেছিলাম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হয়তো জুমলা হবে, কিন্তু সরকার কাজ শুরু করেছে এবং মানুষ তা দেখতে পাচ্ছেন।”
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সম্পর্কেও প্রশংসাসূচক মন্তব্য করেন বীরভূমের সাংসদ। দিল্লিতে বিদ্রোহী সাংসদদের সঙ্গে বৈঠকের প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানান, উন্নয়নমূলক কাজের ক্ষেত্রে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন শুভেন্দু। সাংসদ তহবিলের বাইরেও উন্নয়নের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর তহবিল থেকে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
শুভেন্দুর রাজনৈতিক দক্ষতার প্রসঙ্গ টেনে শতাব্দী বলেন, “ও একজন লড়াকু নেতা। রাজনীতি ওর রক্তে। রাজনীতি ছাড়া ওর জীবনে আর কিছু নেই। প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মতো রাজনৈতিক বোধ রয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, ওদের দলে টিমওয়ার্ক আছে।”
তৃণমূলের সঙ্গে আবেগের সম্পর্ক অটুট রেখেও দলের বর্তমান নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন শতাব্দী রায়। তাঁর বক্তব্যে যেমন অভিমানের সুর স্পষ্ট, তেমনই নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে নিজের অবস্থানও পরিষ্কার করেছেন তিনি। ফলে বাংলার রাজনীতিতে এই মন্তব্যের প্রভাব আগামী দিনে আরও গভীর হতে পারে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।



