রাজ্যসভার উপনির্বাচনে তিনটিতেই জিতবে বিজেপি? নাকি ঋতব্রত-কালীঘাট ভাঙনে লুকিয়ে অন্য অঙ্ক?

বিধানসভার বিন্যাস বলছে বিজেপির দুটি আসন নিশ্চিত, তৃতীয়টিতে তৃণমূলের সুযোগ ছিল। কিন্তু ঋতব্রত-কালীঘাট বিভাজন, হুইপের বৈধতা ও ক্রস ভোটিং— সব মিলিয়ে সমীকরণ এখন জটিল। বুঝে নিন সম্পূর্ণ অঙ্ক।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

রাজ্যসভার উপনির্বাচন নিয়ে এখন জোর চর্চা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে। তিন তৃণমূল সাংসদের ইস্তফায় খালি হওয়া আসনগুলোয় বড় অঘটন না ঘটলে বিজেপিই জিতবে— এমনটাই সরল অঙ্ক। কিন্তু বাস্তব কি এত সরল? তৃণমূলের অন্তর্দ্বন্দ্ব, হুইপের বৈধতা, ক্রস ভোটিং-এর বাস্তবতা মিলিয়ে সমীকরণ এখন ধাঁধার আকার নিয়েছে। বিধানসভার বর্তমান বিন্যাসই বলছে, বিজেপির পক্ষে তিনটিতেই জেতা সম্ভব। কিন্তু ঋতব্রত-কালীঘাটের ভাঙন কি সেটা হতে দেবে? নাকি উল্টে একটা আসন কেড়ে নেবে বিরোধীরা?

বিধানসভার বিন্যাস: সরল অঙ্কে বিজেপির দখলে দুটো

পশ্চিমবঙ্গে রাজ্যসভার আসন সংখ্যা ১৬। এ বছর বিধানসভা নির্বাচনের মাসখানেক আগে পাঁচটি আসনে ভোট হয়েছিল। তৎকালীন শাসকদল তৃণমূলের হাতে ছিল চারটে আসন জেতার মতো সংখ্যা, একটি গিয়েছিল বিজেপির দখলে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পাঁচজন নির্বাচিতও হয়ে গিয়েছিলেন। সাধারণত পরবর্তী নির্বাচন হওয়ার কথা দু’বছর পরে, আরও পাঁচটি আসনে। কিন্তু ৪ মে-র পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলেছে আমূল। তৃণমূলের তিন রাজ্যসভা সাংসদ— সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেব এবং প্রকাশ চিক বরাইক— দলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে ইস্তফা দিয়েছেন। ফলত, মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানেই ফের উপনির্বাচন হচ্ছে রাজ্যসভায়। আর এবারের সমীকরণ পুরোপুরি পাল্টে গেছে।

বিধানসভার বর্তমান আসন বিন্যাসের দিকে তাকানো যাক। বিজেপির হাতে ২০৮টি আসন (মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রাম ছাড়ায় আপাতত ২০৭)। তৃণমূল পেয়েছে ৮০টি। কংগ্রেস ও হুমায়ুন কবীরের এজেইউপি পেয়েছে দুটি করে আসন। সিপিএম ও আইএসএফ একটি করে। সব মিলিয়ে বিরোধী শিবিরের আসন আপাতত ৮৫। এই বিন্যাসের ভিত্তিতে তিনটি রাজ্যসভা আসনে ভোট হলে স্বাভাবিক অঙ্ক বলছে— বিজেপি পাবে দুটি, বিরোধী তৃণমূল পাবে একটি। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না।

যে ভাঙনে তৃতীয় আসনটাও বিজেপির

তৃণমূলের টিকিটে জয়ী বিধায়করা এখন দুটি শিবিরে বিভক্ত— ঋতব্রত শিবির ও কালীঘাট শিবির। ঋতব্রতর শিবিরে রয়েছেন ৬৫ জন বিধায়ক, কালীঘাট শিবিরে মাত্র ১৫ জন। এই ভাঙনের জেরে রাজ্যসভায় কাউকে জেতাতে যে পরিমাণ ভোট দরকার, সেটা কোনও শিবিরের হাতেই নেই। ঋতব্রতপন্থীরা প্রার্থী দিলে পেতে পারেন ৬৫টি ভোট। কালীঘাটপন্থীরা সেই প্রার্থীকে ভোট দেবেন না, এটা ধরেই নেওয়া যায়। অন্যদিকে বিজেপি তাদের ভোট সমান তিন ভাগে ভাগ করলে প্রত্যেক প্রার্থী পাবেন ৬৯টি করে ভোট। ফলে তিনজনেই জিতে যাবেন। অর্থাৎ, তৃণমূলের ভাঙনই বিজেপিকে তৃতীয় আসনটি উপহার দিচ্ছে।

কিন্তু আছে ‘হুইপ’-এর ফাঁদ

এখানেই লুকিয়ে রয়েছে বড় ‘কিন্তু’। খাতায়-কলমে বিধানসভায় তৃণমূল ভেঙে যায়নি। ঋতব্রত শিবিরের আখরুজ্জামানকে মুখ্যসচেতক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন স্পিকার। তিনি যদি হুইপ জারি করেন, তাহলে কালীঘাটপন্থী তৃণমূল বিধায়করা তা মানতে বাধ্য। না মানলে তাঁদের বিধায়ক পদ খারিজ হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে বিজেপির তৃতীয় প্রার্থীর পক্ষে জেতা সম্ভব নয়। কিন্তু বিধানসভায় ইতিমধ্যেই ঋতব্রতপন্থী ও কালীঘাটপন্থী তৃণমূল বিধায়কদের বসার ব্যবস্থা আলাদা করে দেওয়া হয়েছে। তাই ঋতব্রতদের হুইপ কালীঘাটপন্থীদের ওপর আদৌ কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে আইনি তর্ক রয়েছে।

তৃতীয় মেরুকরণ: বিরোধী ঐক্যের সম্ভাবনা

আরও একটি সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ঋতব্রতপন্থীরা যদি একটি আসনে প্রার্থী দেন এবং কালীঘাটপন্থীদের সমর্থন না চেয়ে অন্য বিরোধী দলগুলির সমর্থন চান, তাহলে অঙ্কটা কেমন দাঁড়ায়? ধরে নেওয়া যাক, অন্য বিরোধী দলগুলি সেই প্রার্থীকে সমর্থন করল। সেক্ষেত্রে তিনি পেতে পারেন ৭০টি ভোট (ঋতব্রতপন্থী তৃণমূল ৬৫, কংগ্রেস ২, সিপিএম ১, আইএসএফ ১, হুমায়ুন কবীর ১)। আর তাতেই জিতে যাবেন তিনি।

এমতাবস্থায় বিজেপিকে নিজেদের দুই প্রার্থীকে অন্তত ৭০টি করে ভোট পাইয়ে দিতে হবে। না হলে ঋতব্রতদের প্রার্থী তো জিতবেনই, উল্টে বিজেপির তিন প্রার্থীর মধ্যে ‘টাই’ হয়ে যেতে পারে। তখন ‘টাই’ ভেঙে দু’জনকে বেছে নেওয়ার জন্য দ্বিতীয় পছন্দের ভোট গুনতে হবে। সেই জটিলতায় না গিয়ে দুই প্রার্থীকে ৭০টি করে ভোট দিয়ে বিজেপি দুটি আসন নিশ্চিত করতে চাইবে। তাদের তৃতীয় প্রার্থী সেক্ষেত্রে ৬৭টি ভোট পাবেন এবং হারবেন। অর্থাৎ, বিরোধী ঐক্য হলে বিজেপির তিনটির বদলে দুটি আসনেই আটকে যাওয়ার সম্ভাবনা।

ক্রস ভোটিং: সব হিসেব ওলট-পালটের চাবিকাঠি

অবশ্য ‘ক্রস ভোটিং’ হলে এই সব সম্ভাবনাই উড়ে যেতে পারে। সাম্প্রতিককালে একের পর এক রাজ্যে রাজ্যসভা নির্বাচনে ‘ক্রস ভোটিং’ প্রায় দস্তুর হয়ে উঠেছে। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সেই ‘ক্রস ভোটিং’ গিয়ে পড়েছে বিজেপির পক্ষে। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় বর্তমান আবহাওয়া দেখলে, বিজেপি তিনটি আসনে প্রার্থী দেওয়ার পর বিরোধী শিবির থেকে কাউকে প্রার্থী করা হলে, সেই প্রার্থীর ঘর ভেঙে নিজেদের প্রার্থীদের জন্য ভোট জোগাড় করা বিজেপির পক্ষে খুব কঠিন হবে না— এমনটাই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

তাহলে শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াল? সরল অঙ্ক বলছে বিজেপির তিনটিতেই জয়। কিন্তু তৃণমূলের দুই শিবিরের অবস্থান, হুইপের বৈধতা, বিরোধী ঐক্যের সম্ভাবনা এবং ক্রস ভোটিং— এই চার ফ্যাক্টর মিলিয়ে সমীকরণ এখনও তরল। রাজনীতির এই অঙ্ক শেষ পর্যন্ত কেমন ফল দেয়, সেটাই এখন দেখার।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর