চিরনিদ্রায় পরিচালক রাজা সেন, ৭০-এ প্রয়াণে শোকস্তব্ধ বাংলা সিনেমা মহল

প্রয়াত জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিচালক রাজা সেন। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর এসএসকেএম হাসপাতালে ৭০ বছর বয়সে মৃত্যু, ‘দামু’ পরিচালককে হারিয়ে শোকস্তব্ধ বাংলা সিনেমা।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

রবিবার সকালে বাংলা চলচ্চিত্র জগতে নেমে এল গভীর শোক। প্রয়াত জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিচালক রাজা সেন (Raja Sen)। দীর্ঘদিন ধরে নানা শারীরিক জটিলতার সঙ্গে লড়াই করার পর কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। তাঁর স্ত্রী অভিনেত্রী পাপিয়া সেন মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। রাজা সেনের প্রয়াণে বাংলা সিনেমা ও টেলিভিশন জগতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন পরিচালক। সাম্প্রতিক সময়ে নিউমোনিয়া ও ফুসফুসের সমস্যার কারণে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়। কিন্তু চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

রাজা সেনের শারীরিক সমস্যা অবশ্য নতুন নয়। কয়েক বছর আগে শুটিং চলাকালীন দুর্ঘটনায় চোট পেয়েছিলেন তিনি। চলতি বছর স্নায়ুর সমস্যার কারণে কোমর ও শিরদাঁড়ায় অস্ত্রোপচারও হয়েছিল। চিকিৎসার পর কিছুটা সুস্থ হলেও পরবর্তীতে ফের শারীরিক জটিলতা বাড়ে। শেষ পর্যন্ত ফুসফুসের সমস্যা তাঁকে গুরুতর অসুস্থ করে তোলে।

পরিচালকের প্রয়াণের খবর সামনে আসতেই শোকবার্তা আসতে শুরু করেছে টলিউডের বিভিন্ন মহল থেকে। অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ও শ্রদ্ধা জানিয়েছেন প্রয়াত পরিচালককে। তাঁর কথায়, রাজা সেনের সৃষ্টি ও স্মৃতি দীর্ঘদিন বাংলা সিনেমার সঙ্গে বেঁচে থাকবে।

বাংলা সিনেমায় রাজা সেনের পথচলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ‘দামু’। ১৯৯৬ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবিই ছিল তাঁর পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে পরিচালনার অভিষেক। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘পঞ্চাননের হাতি’ অবলম্বনে তৈরি ছবিটি দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা পায়। সেরা শিশুচলচ্চিত্র হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও জেতে ‘দামু’।

‘দামু’র পর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ছবি ও টেলিভিশন ধারাবাহিক পরিচালনা করেন রাজা সেন। ‘আত্মীয় স্বজন’, ‘চক্রব্যূহ’, ‘দেশ’-এর মতো ছবির পাশাপাশি তাঁর কাজের তালিকায় ছিল একাধিক জনপ্রিয় ধারাবাহিক। পরিবার, সম্পর্ক এবং মধ্যবিত্ত বাঙালির জীবন তাঁর ছবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছিল।

‘দেশ’ ছবিতেও ছিল উল্লেখযোগ্য তারকাসমাবেশ। জয়া বচ্চন (Jaya Bachchan) এবং অভিষেক বচ্চন (Abhishek Bachchan)-সহ একাধিক শিল্পী অভিনয় করেছিলেন ছবিটিতে। বাংলা চলচ্চিত্রের পাশাপাশি তথ্যচিত্র নির্মাণেও বিশেষ আগ্রহ ছিল রাজা সেনের। সুচিত্রা মিত্র, তপন সিংহ, শম্ভু মিত্র-সহ বাংলার শিল্প-সংস্কৃতির একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছিলেন তিনি।

শুধু ‘দামু’র জন্যই নয়, জাতীয় পুরস্কারের মঞ্চে রাজা সেনের সাফল্য একাধিকবার এসেছে। তাঁর ‘আত্মীয় স্বজন’ ছবিও জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিল। অর্থাৎ বাংলা চলচ্চিত্রের মূলধারার পাশাপাশি পরিবার ও সমাজকেন্দ্রিক সংবেদনশীল গল্প বলার ক্ষেত্রেও নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছিলেন তিনি।

পরিচালক হিসেবে শেষ দিকের কাজগুলির মধ্যে ছিল ‘ভালবাসার গল্প’। ২০১৯ সালের পর আর কোনও পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি নিয়ে পরিচালকের আসনে তাঁকে দেখা যায়নি। দীর্ঘ কেরিয়ারে টেলিভিশন, চলচ্চিত্র এবং তথ্যচিত্র—তিন ক্ষেত্রেই কাজের স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন তিনি।

রাজা সেনের দুই কন্যার মধ্যে এক জন বিদেশে থাকেন বলে জানা গিয়েছে। বাবার অসুস্থতার সময়ে তিনি দেশে এসে পরে ফের বিদেশে ফিরে যান। ফলে শেষযাত্রায় তাঁর উপস্থিত থাকা সম্ভব নাও হতে পারে। পরিবারের কাছে এই মুহূর্তে শোকের পাশাপাশি সেই বিচ্ছেদও আরও বেদনাদায়ক।

বাংলা সিনেমায় এমন এক সময়ে রাজা সেনের প্রয়াণ হল, যখন তাঁর প্রজন্মের বহু পরিচালক-শিল্পীর কাজ ধীরে ধীরে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠছে। ‘দামু’ থেকে শুরু করে টেলিভিশন ও তথ্যচিত্র—বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁর সৃষ্টির যে উত্তরাধিকার, তা বাংলা বিনোদন জগতে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। রাজা সেন আর নেই, কিন্তু তাঁর তৈরি চরিত্র, গল্প ও ছবিগুলি বাংলা সিনেমার দর্শকের মনে থেকে যাবে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

Advertisementspot_img

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর