বিজয়া মানেই কি শুধু বিদায়ের বিষণ্ণতা!চারপাশে বিষাদের মেঘ, চোখের কোণে জমে থাকা জল, ঢাকের শেষ বোল আর বিসর্জনের পথে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাওয়া এক অপরূপ মুখ! নাকি বিজয়া এক অন্যরকম উপলব্ধি, যেখানে হারিয়ে যাওয়ার মধ্যেও থেকে যায় ফিরে পাওয়ার প্রতিশ্রুতি?
মা চলে যান, অথচ তাঁর চলে যাওয়ার পথেই ছড়িয়ে থাকে থেকে যাওয়ার কত আয়োজন। মণ্ডপের শূন্যতা, ধূপের শেষ ধোঁয়া, ফুলের শুকিয়ে যাওয়া পাপড়ি, সিঁদুরের রঙে রাঙানো মুখগুলো আর একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বলা— ‘শুভ বিজয়া’— সবকিছুতেই যেন এক অদ্ভুত মায়া জড়িয়ে থাকে। যে মায়া চোখ ভেজায়, অথচ বেঁচে থাকার সাহসও জোগায়।
বিজয়া আসলে এক বিচিত্র সন্ধিক্ষণ। একদিকে উৎসবের সমাপ্তি, অন্যদিকে অপেক্ষার নতুন সূচনা। কয়েকটা দিনের হাসি, আনন্দ, নতুন পোশাক, প্রিয়জনের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো যখন স্মৃতির অ্যালবামে বন্দি হতে থাকে, তখনই মানুষ বুঝতে শেখে— আনন্দের স্থায়িত্বে নয়, তার গভীরতায় জীবনের সার্থকতা। কিছু মুহূর্ত চিরকাল পাশে থাকে না, কিন্তু তাদের স্পর্শ থেকে যায় হৃদয়ের গভীরে।
আমরা প্রত্যেকেই তো কোনো না কোনোভাবে বিজয়া পালন করি। কখনও প্রিয় মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে গিয়ে, কখনও সম্পর্কের পুরোনো অধ্যায় বন্ধ করে, কখনও নিজের একান্ত ইচ্ছেগুলোকে বিসর্জন দিয়ে। প্রতিটি বিদায় আমাদের একটু একটু করে বদলে দেয়। যে মানুষটা গতকালও ভাঙনের শব্দে কেঁপে উঠত, সে-ই একদিন বুঝে যায়— সব হারানো মানেই নিঃস্ব হয়ে যাওয়া নয়। কিছু হারানো আমাদের নিজের কাছে ফিরিয়ে আনে, কিছু বিচ্ছেদ শেখায় আত্মসম্মানের ভাষা, আর কিছু অপেক্ষা বুঝিয়ে দেয়, জীবনের সব দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও কোথাও না কোথাও একটি জানালা খোলা থাকে।
বিজয়ার প্রণাম তাই শুধু বড়দের পায়ে হাত রেখে আশীর্বাদ নেওয়া নয়, বিজয়া হলো নিজের অহংকারকে একটু নত করা, পুরোনো অভিমানগুলোকে আলতো করে সরিয়ে রাখা, সম্পর্কের ধুলো ঝেড়ে আবার নতুন করে মানুষকে চিনতে শেখা। মিষ্টিমুখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা আন্তরিকতাটুকু চিনে নেওয়া। কে পাশে ছিল, কে দূরে থেকেও মনে রেখেছিল, আর কে ভিড়ের মধ্যে থেকেও অচেনা হয়ে গিয়েছিল— এসব হিসেবের ঊর্ধ্বে উঠে নিজের হৃদয়কে একটু উদার করে তোলা।
তবে সব বিজয়া যে আনন্দের হয়, তা নয়। কারও বাড়িতে হয়তো এ বছরও মায়ের ছবি দেওয়ালে টাঙানো রয়েছে, কিন্তু আশীর্বাদ করার মানুষটি আর নেই। কারও ফোনের পর্দায় প্রিয় মানুষের নামটি ভেসে ওঠে না। কেউ হয়তো হাজার মানুষের ভিড়েও একা, কেউ আবার হাসিমুখে সবার সঙ্গে মিষ্টি বিনিময় করতে করতে বুকের মধ্যে বহন করে চলে এক অদৃশ্য শূন্যতা। উৎসব সবার দরজায় সমান আলো নিয়ে আসে না। তবু বিজয়া আমাদের শেখায়, অন্ধকারেরও একটা নিজস্ব ভাষা আছে, আর সেই ভাষা বুঝতে পারলে অন্যের কষ্টের পাশে নীরবে বসে থাকা যায়।
মা দুর্গা ফিরে যান কৈলাসে। রেখে যান তাঁর দশভুজার শক্তি, সাহস, মায়ের মমতা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ানোর শিক্ষা।
আমরা কি সেই শিক্ষাকে নিজেদের জীবনে ধারণ করতে পারি? যদি পারি, তবে বিসর্জন শুধুই প্রতিমার বিসর্জন হয়ে থাকবে না,তা হয়ে উঠবে অশুভকে বিসর্জন দেওয়ার এক পবিত্র অঙ্গীকার।
হয়তো এ কারণেই বিজয়ার দিন মন খারাপ হলেও কোথাও একটা আশার প্রদীপ জ্বলে থাকে। আমরা জানি, আজ
যে আলো নিভে যাচ্ছে, আগামী দিনে সেই আলোর স্মৃতি থেকেই নতুন প্রদীপ জ্বালানো যাবে। আজ যে পথ ধরে মা বিদায় নিচ্ছেন, সেই পথেই একদিন আবার ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি রেখে যাচ্ছেন। আর এই প্রতিশ্রুতিই আমাদের অপেক্ষা করতে শেখায়।
জীবনও তো এমনই। প্রতিটি শেষের ভিতরে লুকিয়ে থাকে নতুন শুরুর বীজ। প্রতিটি বিদায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সময়কে আটকে রাখা যায় না, কিন্তু সময়ের মধ্যে ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখা যায়। মানুষ চলে যায়, উৎসব ফুরিয়ে যায়, সম্পর্কের রং বদলে যায়,তবু কিছু অনুভূতি থেকে যায় আজীবন— পুরোনো চিঠির ভাঁজে, আলমারিতে তুলে রাখা শাড়ির গন্ধে, বিকেলের বিষণ্ণ আলোয় কিংবা হঠাৎ বেজে ওঠা কোনও পরিচিত গানে।
তাই বিজয়ার দিনে আমি শুধু বিদায়ের কান্না দেখতে চাই না। দেখতে চাই ফিরে আসার স্বপ্ন, নতুন করে পথ চলার সাহস, ভেঙে যাওয়া সম্পর্কের মধ্যে সম্ভব হলে সেতু গড়ে তোলার ইচ্ছা। চাই, মানুষের ভিতরের অসুরগুলো পরাজিত হোক, হিংসার জায়গায় মমতা, অহংকারের জায়গায় বিনয় আর স্বার্থপরতার জায়গায় একটু নিঃস্বার্থ ভালোবাসা জন্ম নিক।
বিজয়া মানে শেষ হয়ে যাওয়া নয়, বিজয়া মানে ভালোবাসাকে সঙ্গে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
মা চলে যাবেন, ঢাক থেমে যাবে, মণ্ডপের আলো নিভে আসবে। তবু হৃদয়ের এক গোপন মন্দিরে তাঁর আসনটি শূন্য হবে না কখনও। সেখানে তিনি থেকে যাবেন শক্তি হয়ে, সাহস হয়ে, আশ্রয় হয়ে।
আর আমরা?
আমরা আবারও জীবনের ভিড়ে হারিয়ে যাব, প্রতিদিনের চেনা ব্যস্ততায় জড়িয়ে পড়ব, কখনও হাসব, কখনও কাঁদব, কখনও ভাঙব, কখনও নিজের ভাঙা টুকরোগুলো জুড়ে নিয়ে নতুন করে দাঁড়াব। শুধু বুকের গভীরে কোথাও একটুকরো অপেক্ষা বেঁচে থাকবে—
আবার এসো মা।
আবার আকাশে কাশফুল দুলবে, শিউলির গন্ধে ভোর ভরে উঠবে, ঢাকের শব্দে কেঁপে উঠবে হৃদয়। আবার আমরা আপনজনদের কাছে টেনে নেব, পুরোনো দুঃখ ভুলে নতুন করে আনন্দে মাতব।
কারণ, কিছু বিদায় আসলে প্রতিশ্রুতির অন্য নাম।
আর বিজয়া?
বিজয়া হলো চোখের জলে লেখা সেই চিরন্তন বিশ্বাস—
যে ভালোবাসা সত্যি, সে কখনও সম্পূর্ণ বিদায় নেয় না।
লিখিকা (সুস্মিতা)




