বিহারের রাজনীতিতে বড়সড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। সূত্রের খবর, দীর্ঘদিনের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার শিগগিরই পদত্যাগ করতে পারেন এবং তাঁকে রাজ্যসভায় পাঠানোর পরিকল্পনা চলছে। বিজেপি থেকে নতুন মুখ্যমন্ত্রী বেছে নেওয়ার কথাও জোরালোভাবে আলোচনায়। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে তাঁর বড় ভূমিকা—সম্ভাব্য উপ-প্রধানমন্ত্রী পদ—নিয়ে জল্পনা বাড়ছে। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে।
প্রায় দুই দশক ধরে বিহারের রাজনীতিতে এক অদ্ভুত রাজনৈতিক মডেল চালু রেখেছেন নীতীশ কুমার। আশ্চর্যের বিষয়, তিনি গত প্রায় ২০ বছর কোনও বিধানসভা নির্বাচনে অংশ নেননি। তবুও বারবার মুখ্যমন্ত্রীর পদ তাঁর হাতেই থেকেছে।


অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক এই কৌশলকে বলেন—নীতীশের “নন প্লেয়িং ক্যাপ্টেন মডেল”। অর্থাৎ সরাসরি ভোটে না লড়েও দলের নেতৃত্ব এবং সরকার পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা।
বিহারে কুর্সি বদল, মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে রাজ্যসভায় নীতীশ, হবে উপ-প্রধানমন্ত্রী?

নীতীশ কুমারের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল বিহার বিধানসভা থেকেই। ১৯৮৫ সালে হারনৌত কেন্দ্র থেকে জিতে প্রথমবার বিধায়ক হন তিনি। ১৯৯৫ সালে একই কেন্দ্র থেকে লড়ে পরাজিত হওয়ার পর থেকেই তিনি আর বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি।
তবে লোকসভা নির্বাচনে তাঁকে নিয়মিত দেখা গেছে। ১৯৮৯, ১৯৯১, ১৯৯৬, ১৯৯৮, ১৯৯৯ এবং ২০০৪—এই ছ’বার তিনি লোকসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০০৪ সালে বাঢ় এবং নালন্দা—দুটি আসন থেকেই লড়েছিলেন। কিন্তু বাঢ় থেকে পরাজিত হন। সেই নির্বাচনই ছিল তাঁর শেষ সরাসরি ভোটের লড়াই।


২০০৫ সালের নভেম্বর থেকে, মাত্র কয়েক মাস বাদ দিলে, টানা বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর পদে থেকেছেন তিনি।
নীতীশ নিজেই বহুবার জানিয়েছেন কেন তিনি সরাসরি ভোটে দাঁড়াতে চান না। ২০১২ সালে তিনি বলেছিলেন, নিজের ইচ্ছাতেই তিনি বিধান পরিষদের সদস্য হয়েছেন এবং এটি অত্যন্ত সম্মানজনক একটি প্রতিষ্ঠান।
২০১৫ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচনের সময় তাঁর যুক্তি ছিল আরও স্পষ্ট। তিনি বলেন,
যদি তিনি নিজে কোনও আসনে প্রার্থী হন, তাহলে পুরো নির্বাচনী প্রচার সেই আসনকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকবে। ফলে জোটের নেতা হিসেবে গোটা রাজ্যের প্রচারে মন দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
এই কারণেই তিনি বিধান পরিষদের সদস্য হয়ে রাজ্যের প্রশাসনিক নেতৃত্বে থেকেছেন।
বিহার এমন কয়েকটি রাজ্যের মধ্যে একটি যেখানে বিধান পরিষদ (Legislative Council) রয়েছে। এটি বিধানসভার উচ্চকক্ষ। বিধান পরিষদের সদস্য হলেও কেউ মন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেন। এই সাংবিধানিক ব্যবস্থাকেই দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন নীতীশ কুমার।
এই কৌশলের ফলে তাঁর কয়েকটি রাজনৈতিক সুবিধা তৈরি হয়েছে—
• সরাসরি নির্বাচনী ঝুঁকি কমেছে
• বিরোধী ঢেউ এলেও রাজনৈতিক অবস্থান নিরাপদ থেকেছে
• গোটা রাজ্যে প্রচার চালানোর সুযোগ পেয়েছেন
• প্রশাসনে দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পেরেছেন
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত দুই দশকে একাধিকবার জোট বদল—এনডিএ থেকে মহাগঠবন্ধন, আবার এনডিএ—সবকিছুর মধ্যেও নীতীশের মুখ্যমন্ত্রী পদে ফিরে আসা তাঁর রাজনৈতিক দক্ষতারই প্রমাণ।
২০২৫ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচনে নীতীশ কুমারের দল পেয়েছে ৮৫টি আসন, আর বিজেপি পেয়েছে ৮৯টি আসন। ফলে জোট সরকারে বিজেপির শক্তি কিছুটা বেশি হওয়ায় এবার মুখ্যমন্ত্রীর পদে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, নীতীশ কুমারকে রাজ্যসভায় পাঠিয়ে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে বড় দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এমনকি উপ-প্রধানমন্ত্রী পদেও তাঁর নাম ঘুরছে রাজনৈতিক মহলে।
বিহারের দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের শেষে এবার কি জাতীয় রাজনীতির মঞ্চে আরও বড় ভূমিকায় দেখা যাবে নীতীশ কুমারকে—এই প্রশ্নই এখন ঘুরছে দেশের রাজনৈতিক মহলে।







