বাংলা-সহ ১২ রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) চালাতে গিয়ে নির্বাচন কমিশনকে একের পর এক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে—এনুমারেশন ফর্ম বিলি থেকে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি, অতিরিক্ত কাজের চাপ থেকে জনমানসে আতঙ্ক—সব মিলিয়ে গোটা প্রক্রিয়াই ছিল চাপের মধ্যে। তবুও কমিশনের শীর্ষ মহল এবার সেই ‘মডেল’কেই সফল বলে ধরে নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত জানাল। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ঘোষণা—আগামী দিনে এই একই কাঠামোয় গোটা দেশ জুড়েই SIR চালু হবে।
শনিবার জাতীয় ভোটার দিবসের প্রাক্কালে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার জানান, দেশের যেসব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এখনও SIR প্রক্রিয়া শুরু হয়নি, সেগুলিতেও খুব শীঘ্রই এই কার্যক্রম চালু করা হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, “শুদ্ধ ভোটার তালিকা গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। আর সেটা নিশ্চিত করতে গোটা দেশেই SIR হবে।”
কমিশন সূত্রে দাবি করা হয়েছে, বিহারে SIR প্রক্রিয়ায় ইতিমধ্যেই ‘সাফল্য’ এসেছে। পাশাপাশি ঐতিহাসিকভাবে সেই রাজ্যে ভোটদানের হারও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে উল্লেখ করেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার। এই মুহূর্তে বাংলা-সহ মোট ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে SIR প্রক্রিয়া কার্যকর ভাবে চলছে বলেই কমিশনের দাবি। আগামী দিনে সেই একই পদ্ধতিতে বাকি রাজ্যগুলিতেও ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন চালানো হবে।
১২ রাজ্যে SIR শুরু: বাদ পড়েছে ৬.৫৯ কোটি নাম?
জানা যাচ্ছে, গত ২৭ অক্টোবর বাংলা-সহ ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে শুরু হয়েছিল বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR। একে একে বিভিন্ন রাজ্যের খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পর কমিশনের তরফে যে চিত্র সামনে এসেছে, তা যথেষ্ট চমকে দেওয়ার মতো।
খসড়া তালিকার ভিত্তিতে দেখা যাচ্ছে, এই ১২ রাজ্যে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০.৯৭ কোটি। কিন্তু SIR প্রক্রিয়ার পর সেই সংখ্যাটি আপাতত কমে দাঁড়িয়েছে ৪৪.৩৮ কোটি। অর্থাৎ প্রাথমিক হিসাবেই প্রায় ৬.৫৯ কোটি ভোটারের নাম বাদ পড়েছে।


তবে কমিশনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে—এটি এখনও প্রাথমিক তালিকা। সামনে আরও যাচাই-বাছাই, যাচাইকরণ এবং সংশোধন প্রক্রিয়া বাকি রয়েছে। ফলে বাদ পড়া নামের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে অনুমান।
প্রশ্ন উঠছে কমিশনের ভূমিকাতেই
এই বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়ার খবর সামনে আসতেই দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ঘিরে একাধিক প্রশ্ন উঠে আসছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যদি এত সংখ্যক ভোটার সত্যিই “অযোগ্য” বা “ভুয়ো” হয়ে থাকেন, তাহলে এতদিন তাঁদের নাম ভোটার তালিকায় ছিল কীভাবে?

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এই তথ্য কার্যত ভোটার তালিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ককেই নতুন করে উসকে দিচ্ছে। বিরোধীদের ‘ভোটচুরি’ বা ভোটার তালিকায় কারচুপির অভিযোগকে এই ঘটনাপ্রবাহ আরও শক্তি দিচ্ছে কি না, তা নিয়েও চর্চা শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে কমিশনের অবস্থান পরিষ্কার—তাদের লক্ষ্য ভোটার তালিকাকে আরও স্বচ্ছ ও নির্ভুল করা। কমিশনের অন্দরমহল সূত্রে ইঙ্গিত, গোটা দেশে SIR চালু করার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন হয়তো ভোটার তালিকা ব্যবস্থার ভিত আরও শক্ত করতে চাইছে।
তবে এই প্রক্রিয়া সর্বত্র কার্যকর হলে, ভোটার বাদ পড়া, পুনঃতালিকাভুক্তি, যাচাই সংক্রান্ত জটিলতা এবং জনমানসে বিভ্রান্তি—সবকিছু কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে, সেই প্রশ্নও আগামী দিনে আরও বড় হয়ে উঠতে পারে।








