অর্ক সানা: ভারত এবং ভারতীয়দের স্মৃতি থেকে ২৬/১১ মুম্বই হামলা কোনওদিনই মুছে যাবে না। আজ দেড় দশক পরেও সেই রাতের আতঙ্ক, সেই গুলির শব্দ, সেই আগুনের দাহ যেন এখনও জীবন্ত। শহর বদলেছে, সময় এগিয়েছে, কিন্তু ২৬/১১ মুম্বই হামলা ভারতের বুকে রেখে গেছে এমন এক ক্ষত, যার দাহ আজও কমেনি। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রকে উদ্দেশ্য করে পাকিস্তান মদতপুষ্ট লস্কর-ই-তৈবার পরিকল্পিত আঘাত শুধু ১৬৬টি প্রাণ কেড়ে নেয়নি—কেড়ে নিয়েছে নির্ভরতার অনুভূতিও।
২০০৮ সালের সেই রাত। ব্যস্ত বাণিজ্যনগরী মুম্বই সেদিন এক মুহূর্তে রূপান্তরিত হয়েছিল যুদ্ধক্ষেত্রে। তাজহোটেলের প্রাচীন সৌন্দর্য, ওবেরয় ট্রাইডেন্টের অভিজাত পরিবেশ, ছত্রপতি শিবাজি টার্মিনাসের কোলাহল—সবকিছুই ডুবে গেছিল রক্ত আর ধোঁয়ার অন্ধকারে। ৬০ ঘণ্টার টানা অভিযানের পর NSG কমান্ডোরা শেষ পর্যন্ত জঙ্গিদের নিস্তেজ করতে সক্ষম হলেও ২৬/১১ মুম্বই হামলা-র বিভীষিকা টেলিভিশন পর্দা ছাড়িয়ে মানুষের মনে স্থায়ী হয়ে গেছে।
২৬/১১ মুম্বই হামলা: যে ক্ষত আজও টাটকা, ভারত ভোলেনি সেই রক্তাক্ত রাত
আজও শহরবাসী ভুলতে পারেন না, কীভাবে সাধারণ মানুষকে নিশানা করে নির্বিচারে গুলি চালিয়েছিল আজমল কাসভ ও তার সঙ্গীরা। রেলস্টেশন থেকে ক্যাফে, বিলাসবহুল হোটেল থেকে ধর্মীয় কেন্দ্র—শহরের প্রতিটি জায়গাই হয়ে উঠেছিল সন্ত্রাসীদের মৃত্যু-ফাঁদ। যারা বেঁচে ফিরেছিলেন, তাঁদের মনে সেই স্মৃতি আজও শিউরে ওঠার মতো। যাঁরা হারিয়েছেন পরিবার-পরিজন, তাঁদের কাছে এই দিনগুলি আরও বেদনার।

কিন্তু শুধু আবেগ নয়—২৬/১১ মুম্বই হামলা ভারতের নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতাকে নগ্ন করে দিয়েছিল। প্রশ্ন উঠেছিল গোয়েন্দা ব্যর্থতা, সীমান্ত নিরাপত্তা, এবং সন্ত্রাসবিরোধী ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে। দেশ তখন উপলব্ধি করেছিল, সন্ত্রাস মানচিত্রহীন। তার লক্ষ্য শুধুই বিশৃঙ্খলা, আতঙ্ক এবং রাষ্ট্রের ভিত চুরমার করা।
যদিও সময়ের সঙ্গে ভারত শক্তিশালী হয়েছে। সন্ত্রাস-বিরোধী আইনে পরিবর্তন এসেছে, গোয়েন্দা ব্যবস্থায় আধুনিকতা এসেছে, সীমান্তে নজরদারি কঠোর হয়েছে। কিন্তু যে প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত—২৬/১১ মুম্বই হামলা-র মাস্টারমাইন্ডরা এখনও মুক্ত বিহঙ্গ। পাকিস্তানের মাটিতে তাদের নিরাপদ আশ্রয় আন্তর্জাতিক রাজনীতির লজ্জাজনক সত্য।

প্রতিবার ২৬ নভেম্বর ফিরে আসে আরেকটি কঠিন স্মরণে—সন্ত্রাসবাদকে সমূলে উৎপাটন না করা পর্যন্ত কোনও দেশই নিরাপদ নয়। আফগানিস্তান থেকে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ থেকে আফ্রিকা—বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসের মুখোশ ক্রমাগত রূপ বদলাচ্ছে। ২৬/১১ সেই কঠিন সতর্কতারই চিরন্তন চিহ্ন।
ভারতের জন্য ২৬/১১ কেবল একটি দিন নয়—এটি একটি প্রতিজ্ঞা। শহরকে, দেশকে, ভবিষ্যতকে রক্ষার প্রতিজ্ঞা। আজও সেই রাতে নিহত নিরপরাধ মানুষের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়—নিরাপত্তার লড়াই কখনও শেষ হয় না। আর ন্যায়বিচারের পথও কখনও হালকা হতে পারে না।
২৬/১১ মুম্বই হামলা তাই দেশের ইতিহাসে শুধু এক ট্র্যাজেডি নয়, এক চিরস্থায়ী দায়। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এটি ভারতের লৌহপ্রতিজ্ঞ প্রতীক। আর প্রতিটি বছর, এই দিনটি আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয়—সংহতি, সতর্কতা এবং মানবিকতার মধ্য দিয়েই সন্ত্রাসের অন্ধকার থেকে বিশ্বকে রক্ষা করা সম্ভব।



