অর্ক সানা, সম্পাদক(নজরবন্দি.ইন): বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার পালাবদল নতুন কোনও ঘটনা নয়। কিন্তু প্রতিবারই নতুন সরকারকে ঘিরে জন্ম নেয় নতুন প্রত্যাশা, নতুন প্রতিশ্রুতি এবং নতুন বিতর্ক। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন ডবল ইঞ্জিন সরকারের এক মাস পূর্ণ হল। সময়টা খুব বেশি নয়, কিন্তু এতটুকু সময়েও প্রশাসনের অগ্রাধিকার ও রাজনৈতিক দর্শনের একটি প্রাথমিক ছবি স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।
নতুন সরকারের প্রথম মাসের সবচেয়ে বড় বার্তা এসেছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযানে। দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যের সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যে যে ক্ষোভ জমে উঠেছিল, সেই জায়গাতেই হাত দিয়েছে প্রশাসন। একের পর এক গ্রেফতারি, তদন্ত কমিটি, পুরনো মামলার ফাইল খুলে দেখা— সব মিলিয়ে সরকার বুঝিয়ে দিতে চেয়েছে যে তারা আপাতত কোনও রকম নরম অবস্থানে নেই। তবে এখানেই প্রশ্নও রয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই যদি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগে ঢাকা পড়ে যায়, তবে সেই লড়াইয়ের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।


একইভাবে সীমান্ত ও অনুপ্রবেশের প্রশ্নে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ করেছে। নির্বাচনী প্রচারে যে বিষয়টি বিজেপির অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক অস্ত্র ছিল, ক্ষমতায় এসেই সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে হাঁটার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। তবে মানবিকতা ও নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাও প্রশাসনের বড় দায়িত্ব। সংখ্যার হিসাব যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, রাষ্ট্রের আচরণ যেন কখনও মানবিকতার সীমা অতিক্রম না করে।
সামাজিক প্রকল্পের ক্ষেত্রে নতুন সরকারের কৌশলও লক্ষণীয়। একদিকে কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলিকে রাজ্যে কার্যকর করার উদ্যোগ, অন্যদিকে রাজ্যের নিজস্ব ভাতা প্রকল্পগুলির সম্প্রসারণ। আয়ুষ্মান ভারত থেকে অন্নপূর্ণা যোজনা— সব ক্ষেত্রেই বার্তা স্পষ্ট, উন্নয়ন ও কল্যাণনীতির রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় সরকার পিছিয়ে থাকতে চায় না। কিন্তু প্রকল্প ঘোষণা আর বাস্তব সুবিধা মানুষের হাতে পৌঁছানোর মধ্যে যে দূরত্ব থাকে, সেই পরীক্ষাই এখন সবচেয়ে বড়।
স্বাস্থ্য, শিল্প ও পরিকাঠামো ক্ষেত্রেও সক্রিয়তার ছাপ দেখা যাচ্ছে। বিনিয়োগের বার্তা, রেল ও মেট্রো প্রকল্পে গতি, জনঔষধি কেন্দ্র চালুর পরিকল্পনা— সবই ইতিবাচক ইঙ্গিত। তবে বাংলার মানুষ বহুবার বড় বড় ঘোষণার সাক্ষী থেকেছেন। তাই এখন তাঁরা ফল দেখতে চান, প্রতিশ্রুতি নয়।


সরকারি চাকরি ও ডিএ-র মতো সংবেদনশীল বিষয়েও সরকার দ্রুত পদক্ষেপ করেছে। দীর্ঘদিনের ক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা স্পষ্ট। কিন্তু কর্মসংস্থানের প্রকৃত চিত্র বদলাতে গেলে শুধু সরকারি নিয়োগ যথেষ্ট নয়। শিল্প ও বেসরকারি বিনিয়োগের বাস্তব ফলাফলও সমান জরুরি।
অন্যদিকে উচ্ছেদ অভিযান এবং বুলডোজার রাজনীতি নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা সরকারকে সতর্কবার্তা দিচ্ছে। আইন প্রতিষ্ঠার নামে যদি সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে সেই ক্ষোভ একসময় রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ায় রূপ নিতে পারে। প্রশাসনের শক্তি যেমন প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন সংবেদনশীলতা।
এক মাসের মূল্যায়নে তাই সরকারকে পূর্ণ নম্বর দেওয়া যেমন সম্ভব নয়, তেমনই ব্যর্থতার তকমাও দেওয়া যায় না। বরং বলা যায়, নতুন সরকার দ্রুত গতিতে নিজের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অগ্রাধিকার স্পষ্ট করেছে। এখন দেখার, আগামী মাস ও বছরগুলিতে এই গতি কতটা স্থায়িত্ব পায় এবং সাধারণ মানুষের জীবনে তার বাস্তব প্রতিফলন কতটা দেখা যায়।
কারণ শেষ পর্যন্ত কোনও সরকারের সাফল্য গ্রেফতারের সংখ্যায়, ঘোষণার বহরে বা রাজনৈতিক স্লোগানে নির্ধারিত হয় না। তা নির্ধারিত হয় মানুষের জীবন কতটা সহজ হল, কর্মসংস্থান কতটা বাড়ল, প্রশাসনের উপর আস্থা কতটা ফিরল— সেই কঠিন পরীক্ষাতেই।
সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে
Google News এবং Google Discover-এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।



