অর্ক সানা, সম্পাদক(নজরবন্দি.ইন): ফলতার ভোট যেন এক ধাক্কায় বদলে দিল ডায়মন্ড হারবারের রাজনৈতিক সমীকরণ। দু’বছর আগে যেখানে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল পেয়েছিল প্রায় ৮৯ শতাংশ ভোট, সেখানে পুনর্নির্বাচনে দল নেমে এল মাত্র চার শতাংশে। বিজেপির ঝুলিতে গেল ৭১ শতাংশ ভোট। কিন্তু এই বিপর্যয়ের মধ্যেও গোটা ডায়মন্ড হারবার লোকসভা সেগমেন্টে এখনও এগিয়ে রয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়— যদিও ব্যবধান আগের তুলনায় নাটকীয় ভাবে কমেছে।
ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই ফলতা থেকেই তৃণমূল প্রায় এক লক্ষ ৬৮ হাজার ভোটে বিজেপিকে পিছনে ফেলেছিল। সেই কেন্দ্রেই এবার বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পান্ডা জিতলেন এক লক্ষ ন’হাজারেরও বেশি ভোটে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এবারের ভোটে কারচুপি বা বুথদখলের অভিযোগ কার্যত শোনা যায়নি। নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে পুনর্নির্বাচনের পর ভোটারদের বুথমুখী হওয়ার ছবিও ছিল অনেকটাই স্বতঃস্ফূর্ত। দিনের শেষে ভোটদানের হার পৌঁছে যায় ৮৮ শতাংশেরও বেশি।

এই ফলকে ঘিরেই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ডায়মন্ড হারবার এলাকায় যে বিপুল ব্যবধানে জয় এসেছিল, তার পিছনে থাকা ‘সংগঠিত ভোট ম্যানেজমেন্ট’-এর ধারণা এবার বড় ধাক্কা খেল। কারণ, ফলতার মতো কেন্দ্রে তৃণমূলের ভোট সরাসরি ১ লক্ষ ৮৩ হাজার থেকে নেমে দাঁড়াল মাত্র ৭ হাজার ৭৮৩-এ।
অন্যদিকে, বিজেপির ভোট ১৫ হাজারের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে গেল প্রায় দেড় লক্ষে। সিপিআইএমও উল্লেখযোগ্য উত্থান ঘটিয়ে ৪০ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছে। যদিও সামগ্রিক হিসাবে বাম ভোট বৃদ্ধির পরিমাণ খুব বেশি নয়, তবুও ফলতায় বিরোধী ভোটের একত্রিত হওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে।
ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত বাকি ছ’টি বিধানসভা কেন্দ্রে অবশ্য তৃণমূল এখনও নিজেদের শক্ত ঘাঁটি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ডায়মন্ড হারবার, বিষ্ণুপুর, মহেশতলা, বজবজ এবং মেটিয়াবুরুজে তৃণমূল এগিয়ে থাকলেও বিজেপি প্রায় প্রতিটি কেন্দ্রে নিজেদের ভোট উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়িয়েছে।
বিশেষ করে সাতগাছিয়ায় লড়াই ছিল অত্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি। সেখানে তৃণমূল পেয়েছে ১ লক্ষ ১০ হাজার ৬২২ ভোট, আর বিজেপি ১ লক্ষ ১১ হাজার ২৩ ভোট। এই ফলই দেখিয়ে দিচ্ছে, একসময় একতরফা বলে পরিচিত ডায়মন্ড হারবার অঞ্চলেও এখন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা অনেক বেশি তীব্র।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ডায়মন্ড হারবার সেগমেন্টে তৃণমূলের মোট ভোট ছিল ১০ লক্ষ ৪৮ হাজারের বেশি। বিজেপি পেয়েছিল মাত্র ৩ লক্ষ ৩৭ হাজার ভোট। সেই ব্যবধানেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জিতেছিলেন প্রায় ৭ লক্ষ ১১ হাজার ভোটে।
কিন্তু ২০২৬ সালের বিধানসভা ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, তৃণমূলের মোট ভোট কমে দাঁড়িয়েছে ৭ লক্ষ ৩৮ হাজারে। বিজেপি উঠে এসেছে ৬ লক্ষ ৪৪ হাজার ভোটে। ফলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্ভাব্য ব্যবধান নেমে এসেছে মাত্র ৯৩ হাজার ৫৪৯ ভোটে।
অর্থাৎ, ডায়মন্ড হারবার এখনও পুরোপুরি হাতছাড়া হয়নি তৃণমূলের। কিন্তু ফলতা দেখিয়ে দিল, রাজনৈতিক জমি আর আগের মতো একমুখী নেই। ভোটারদের আচরণ বদলাচ্ছে, বিরোধী ভোটের সমীকরণও নতুন আকার নিচ্ছে। আর সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সংকেত হয়তো রেখে গেল ফলতার এই পুনর্নির্বাচন।



