অর্ক সানা: বাংলার রাজনীতিতে গত আড়াই দশকের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা সম্ভবত এখন আর বিজেপি বনাম তৃণমূল নয়। প্রশ্নটা আরও গভীর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার কী? তৃণমূল কংগ্রেসের অস্তিত্ব রক্ষা, নাকি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করা?
একসময় যে দলটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত লড়াই, আপসহীন আন্দোলন এবং জনসমর্থনের উপর দাঁড়িয়ে বাংলার রাজনীতিকে বদলে দিয়েছিল, আজ সেই দলই অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের মুখে। বিধানসভায় একের পর এক বিধায়ক বিদ্রোহী শিবিরে নাম লিখিয়েছেন। লোকসভাতেও দলের সাংসদদের একটি বড় অংশ পৃথক ব্লক গঠনের পথে হাঁটছেন। রাজনীতির নির্মম বাস্তবতা হল, সংখ্যাই শেষ কথা বলে। আর সেই সংখ্যার হিসাবেই আজ তৃণমূলের অন্দরে তৈরি হয়েছে এক গভীর অনিশ্চয়তা।
এই পরিস্থিতির জন্য কেবল বিরোধীদের দায়ী করলে বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাওয়া হবে। তৃণমূলের ভেতরে ক্ষোভের ইতিহাস নতুন নয়। বহু পুরনো নেতা-কর্মী বহুদিন ধরেই অভিযোগ করে এসেছেন যে দলটি ধীরে ধীরে একটি গণদল থেকে পরিবারকেন্দ্রিক কাঠামোর দিকে এগিয়েছে। সেই অভিযোগের কেন্দ্রে বারবার উঠে এসেছে একটি নাম— অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

অভিষেকের রাজনৈতিক দক্ষতা, সাংগঠনিক ক্ষমতা বা জনসংযোগ নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে তাঁর উত্থান তৃণমূলের অনেক প্রবীণ নেতার রাজনৈতিক পরিসরকে সংকুচিত করেছে। যে নেতারা একসময় মমতার ছায়াসঙ্গী ছিলেন, তাঁদের অনেকেই ধীরে ধীরে প্রান্তিক হয়ে পড়েছেন। কেউ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করেছেন, কেউ নীরবে দূরে সরে গিয়েছেন, আবার কেউ আজ বিদ্রোহী শিবিরের মুখ হয়ে উঠেছেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর সংগঠনকে ধরে রাখার ক্ষমতা। কিন্তু গত কয়েক বছরে বারবার দেখা গিয়েছে, দলের মধ্যে মতভেদ দেখা দিলেও শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থেকেছেন অভিষেক। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে— তৃণমূল কি এখনও মমতার দল, নাকি মমতার মাধ্যমে অভিষেকের রাজনৈতিক প্রকল্প?
আজকের সঙ্কটের মূলেও সম্ভবত সেই প্রশ্নটাই লুকিয়ে রয়েছে। এখন যদি ধরে নেওয়া যায় যে বিদ্রোহ আরও বাড়বে, সাংগঠনিক কাঠামো আরও দুর্বল হবে এবং তৃণমূল আগের অবস্থায় ফিরতে পারবে না, তাহলে মমতার সামনে কী বিকল্প পথ খোলা রয়েছে?
এখানেই কংগ্রেসের প্রসঙ্গ সামনে আসে। ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থান আসলে কংগ্রেসের ভেতর থেকেই। প্রদেশ কংগ্রেসের নেত্রী থেকে সর্বভারতীয় রাজনীতির অন্যতম শক্তিশালী মুখ হয়ে ওঠার পথটা শুরু হয়েছিল হাত শিবিরেই। পরে মতাদর্শগত এবং সাংগঠনিক দ্বন্দ্বে তিনি বেরিয়ে এসে তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন। সেই সিদ্ধান্তই বাংলার রাজনীতির গতিপথ বদলে দেয়।

কিন্তু রাজনীতির ইতিহাসে স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী শত্রু বলে কিছু নেই। থাকে কেবল স্থায়ী স্বার্থ। সাম্প্রতিক সময়ে কংগ্রেস নেতৃত্বের কিছু পদক্ষেপ নতুন জল্পনা উসকে দিয়েছে। বিশেষ করে রাহুল গান্ধীর সঙ্গে অধীর রঞ্জন চৌধুরীর বৈঠক রাজনৈতিক মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেসে সাংগঠনিক পদ যাঁর হাতেই থাকুক, জনভিত্তি এবং রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার নিরিখে অধীর এখনও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ। আবার তিনিই দীর্ঘদিন ধরে মমতার সবচেয়ে কঠোর সমালোচকদের একজন।
তাই প্রশ্ন উঠছে— যদি ভবিষ্যতে কোনও বৃহত্তর সমঝোতার প্রয়োজন হয়, তবে কি কংগ্রেস প্রথমে নিজেদের ঘর গুছিয়ে নেবে? আর মমতা কি সেই সম্ভাব্য দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন?
রাজনীতিতে উত্তরাধিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ হয়তো আজও প্রশ্নের মুখে নয়। কিন্তু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিশ্চয়ই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যেখানে তৃণমূল আর সেই নিরাপদ রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম না থাকে, তাহলে জাতীয় স্তরের কোনও বৃহত্তর রাজনৈতিক ছাতার নিচে অভিষেকের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার ভাবনা অস্বাভাবিক নয়।
বিশেষত এমন সময়ে, যখন জাতীয় রাজনীতির সমীকরণ দ্রুত বদলাচ্ছে। বিজেপি আজ ক্ষমতায়, কিন্তু গণতন্ত্রে ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আগামী দশকের রাজনৈতিক মানচিত্র কেমন হবে, তা কেউ জানে না। সেই দীর্ঘমেয়াদি হিসাবই হয়তো আজ অনেক নেতাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কংগ্রেসে প্রত্যাবর্তন অবশ্যম্ভাবী। বাস্তবে সেই পথে অসংখ্য রাজনৈতিক, সাংগঠনিক এবং ব্যক্তিগত বাধা রয়েছে। কংগ্রেসের ভেতরেও অনেকের আপত্তি থাকবে। তৃণমূলের অবশিষ্ট নেতৃত্বের মধ্যেও তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে। কিন্তু রাজনীতির ইতিহাস বলে, অসম্ভবকে সম্ভব করার নামই রাজনীতি।
আজ যা নিছক জল্পনা, আগামীকাল সেটাই বাস্তব হতে পারে।
তাই প্রশ্নটা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যদি এমন এক সময় আসে যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে দুটি পথ খোলা থাকে— একদিকে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়া তৃণমূল, অন্যদিকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ— তাহলে তিনি কোন পথ বেছে নেবেন?
উত্তর ভবিষ্যতের গর্ভে। তবে এটুকু বলা যায়, বাংলার রাজনীতিতে যে অধ্যায়ের সূচনা কংগ্রেস ভেঙে হয়েছিল, তার শেষ অধ্যায় আবার কংগ্রেসে ফিরে গিয়েই লেখা হবে না— এমন নিশ্চয়তা আজ আর কেউ দিতে পারছে না।



