অর্ক সানা: মাসে ৩ হাজার টাকার আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজ্য সরকার প্রকাশ করেছে অন্নপূর্ণা যোজনার ১১ পাতার আবেদনপত্র। কিন্তু এই ফর্ম ঘিরে এখন বড় প্রশ্ন— শুধু সামাজিক প্রকল্পের সুবিধা দিতেই কি এত বিপুল ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, নাকি এর আড়ালে তৈরি হচ্ছে নাগরিকদের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ডাটাবেস?
নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, ভবিষ্যতের বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে দ্রুত সুবিধা পৌঁছে দিতেই এই বিশদ তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনলাইন ও অফলাইন— দুইভাবেই আবেদন করা যাবে। পাশাপাশি যাঁরা নিজেরা ফর্ম পূরণ করতে পারবেন না, তাঁদের সাহায্যের জন্য সরকারি কর্মীরা বাড়ি বাড়ি যাবেন বলেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।


তবে বাস্তব ছবিটা অনেক বেশি জটিল। কারণ, এই ফর্ম শুধুমাত্র পরিচয়পত্রের তথ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আবেদনকারীর পরিবারে কে কী করেন, কত জমি আছে, বাড়ি পাকা না কাঁচা, চার চাকার গাড়ি আছে কি না— এমনকি পরিবারের শিশুদের টিকাকরণ ও স্কুলের তথ্য পর্যন্ত চাওয়া হয়েছে।
সরকারের যুক্তি স্পষ্ট— একবার তথ্য সংগ্রহ করা গেলে ভবিষ্যতে একাধিক প্রকল্পে আলাদা করে আবেদন করতে হবে না। প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ভাবনা অবশ্যই আধুনিক ও কার্যকর। ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের যুগে একক পরিবারভিত্তিক তথ্যভান্ডার সরকারের কাজ সহজ করতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে তথ্যের পরিমাণ ও তার ব্যবহারের সীমা নিয়ে। একজন সাধারণ গ্রামীণ মহিলা, যিনি মাসিক আর্থিক সহায়তার আশায় আবেদন করবেন, তিনি কি আদৌ জানেন তাঁর দেওয়া তথ্য ভবিষ্যতে কীভাবে ব্যবহার হবে? সেই তথ্য কতটা সুরক্ষিত থাকবে? কারা সেই ডেটা অ্যাক্সেস করতে পারবে?


বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সামাজিক প্রকল্পের সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা জরুরি হলেও নাগরিকের গোপনীয়তার অধিকারের বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আধার, ব্যাঙ্ক, প্যান, জমির খতিয়ান— সব তথ্য একসঙ্গে যুক্ত হলে একটি পরিবারের পূর্ণ আর্থিক ও সামাজিক প্রোফাইল সরকারের হাতে চলে যায়।
এখানেই আরও একটি বাস্তব সমস্যা সামনে আসছে। রাজ্যের বহু প্রান্তে এখনও ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব রয়েছে। ১১ পাতার দীর্ঘ ফর্ম, অসংখ্য নথি, জটিল তথ্য— সব মিলিয়ে অনেকেই বিভ্রান্ত হতে পারেন। বিশেষ করে প্রবীণ, কম শিক্ষিত বা গ্রামীণ আবেদনকারীদের জন্য এই প্রক্রিয়া সহজ হবে না বলেই আশঙ্কা।
যদিও সরকার জানিয়েছে, বিধায়ক থেকে প্রশাসনিক আধিকারিক— সকলেই এই কাজে যুক্ত থাকবেন এবং প্রয়োজনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সহায়তা করা হবে। কিন্তু এত বিশাল পরিসরে সেই সহায়তা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
অন্নপূর্ণা যোজনার মতো প্রকল্প নিঃসন্দেহে বহু মহিলার আর্থিক নিরাপত্তার নতুন দরজা খুলে দিতে পারে। কিন্তু নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, তথ্য সুরক্ষা এবং আবেদন প্রক্রিয়ার সরলীকরণ— এই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব না দিলে ভবিষ্যতে এই উদ্যোগ নিয়েই নতুন বিতর্ক তৈরি হতে পারে।
সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে
Google News এবং Google Discover-এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।



