মিল্টন রশিদ। এবারের লোকসভা নির্বাচনে বীরভূমের বাম-কংগ্রেস সমর্থিত প্রার্থী। ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে ততই লালমাটিতে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছেন তিনি। এমনকি শুধু তাই নয়, রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ এও মনে করছেন, মিল্টন রশিদ তিন বারের তৃণমূল সাংসদ শতাব্দী রায়কে হারিয়ে পর্যন্ত দিতে পারেন! যার নেপথ্যে যথেষ্ট কারণও রয়েছে। কেন মিল্টন এবারের লোকসভায় বীরভূমের গেম চেঞ্জার? আলোচনা করা যাক!
আরও পড়ুন: এবারও হলনা জামিন, আরও আড়াই মাস তিহাড় জেলেই থাকতে হবে অনুব্রতকে


২০০৯ সাল থেকে বীরভূমে জিতে আসছেন অভিনেত্রী শতাব্দী রায়। হ্যাটট্রিক করা হয়েছে। এবার মূলত তাঁর প্রেস্টিজ ফাইট। কিন্তু, যে দাপুটে নেতার উপস্থিতিতে লালমাটিতে তৃণমূলের জয়জয়কার হত বা শতাব্দী রায় মূল ‘সাপোর্ট’ পেতেন সেই অনুব্রত মণ্ডল এবারের লোকসভায় নেই, গরু পাচার মামলায় তিনি বন্দী তিহাড় জেলে।
ফলে, কেষ্ট-হীন বীরভূমে ভোটের লড়াই তৃণমূলের জন্য এবার কিছুটা হলেও কঠিন। অনুব্রত না থাকলেও কাজল শেখ রয়েছেন, কিন্তু কেষ্টর বিকল্প নেই! দলের সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যপাধ্যায়ও অনুব্রত গ্রেফতার হবার পর বীরভূমের ‘কন্ট্রোল’ নিজের হাতে রাখেন। জেলা তৃণমূলের অন্দরে কানাঘুষো শোনা যায়, কেষ্টদা’র মতো করে কেউ পার্টি চালাতে পারে না।

এসবের মধ্যেই আবার উঠে আসছে মিল্টন রশিদের নাম। বীরভূমের রাজনীতিতে এই নামটা নতুন নয়। বিগত কয়েক বছরে মিল্টনের জনপ্রিয়তাও অনেকটা বেড়েছে এরকমও মনে করেন একাংশ। ২০১৬ বিধানসভায় হাঁসন কেন্দ্র থেকে জিতে বিধায়ক হন তিনি। যদিও আবার একুশের বিধানসভাও হেরেও যান। তা সত্ত্বেও মিল্টন ময়দান ছেড়ে পালিয়ে যাননি। তাঁকে বীরভূম জেলা কংগ্রেসের সভাপতিও করা হয়।


রামপুরহাট কলেজে ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক হয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করা মিল্টন পেশায় আইনজীবী। এলাকায় যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। তাছাড়া তিনি ভূমিপুত্র। মানুষের বিপদে-আপদে তাঁকে সর্বদা পাশে পাওয়া যায় এই ধরনের একটা সুনামও রয়েছে। তৃণমূলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদও করেন। মূলত নির্ভীক। তাছাড়া তিনি ধর্মে ইসলাম, রাজনীতির ভাষায় সংখ্যালঘু। আর এই সংখ্যালঘু ভোট একটা বড় ফ্যাক্টর বীরভূমে।
ভূমিপুত্র-কাজের ছেলে-প্রতিবাদী মুখ, বীরভূমে শতাব্দীর প্রেস্টিজ ফাইটে কাঁটার নাম মিল্টন রশিদ!

২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের পরিসংখ্যান বলছে, শতাব্দী রায় গতবারই সবচেয়ে বেশি ব্যবধানে জেতেন নিজের কেরিয়ারে। ৮৯ হাজারের কিছু বেশি। তবে, সেক্ষেত্রে বড় ভূমিকা ছিল, মুরারই, নলহাটি এবং হাঁসন। এই তিনিটি কেন্দ্রই সংখ্যালঘু অধ্যুষিত। সেখানে মিল্টন রশিদ একটা বড় অংশে ভাগ বসাতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে। তবে, এই সংখ্যালঘু ভোটের বাইনারী ভাঙতে চান মিল্টন। তাঁর মতে, তিনি সব ধর্মের মানুষের প্রতিনিধি।
কিন্তু, ভোটের অঙ্কে, মিল্টন যদি সংখ্যালঘু এলাকার ভোটে ভাগ বসান তাহলে ভোট কাটাকুটিতে উল্টে সুবিধা পেয়ে যাবে না তো বিজেপি? সেটাও ভাবার বিষয়। একুশের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী, বীরভূমের সাতটি বিধানসভার মধ্যে কেবল দুবরাজপুর বিজেপির দখলে যায়। বাকী ছ’টাই তৃণমূলের। কিন্তু, মানুষ ভোট দিতে পারেননি একটা অভিযোগ রয়েছে। আর উনিশেও শতাব্দীকে বিপাকে ফেলে এই দুবরাজপুর। সঙ্গে সিউড়ি, সাঁইথিয়া এবং রামপুরহাট থেকেও ভোট কম পান অভিনেত্রী।

ফলে, একটা দুশ্চিন্তা কিন্তু থাকছে শতাব্দীর। প্রচারে বেরিয়েও অনেক সময় মানুষের ক্ষোভের মুখে পড়েছেন তিনি। কখনও ধমকাতে শোনা গিয়েছে দলেরই কর্মীকে। আবার প্রকাশ্যে ক্ষমাও চেয়েছেন। এদিকে, ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত বীরভূম ছিল কংগ্রেসের দখলে। এরপর ২০০৯ সাল পর্যন্ত চলে বাম-জামানা। আর এবার দুই দলই একসঙ্গে। ফলে, মিল্টনের পক্ষে ভোট পড়তে পারে।
বিজেপি আবার প্রথমে প্রাক্তন আইপিএস দেবাশিস ধরকে বীরভূমের টিকিট দিলেও তাঁর মনোনয়ন বাতিল করে নির্বাচন কমিশন। বর্তমানে তাঁদের প্রার্থী দেবতনু ভট্টাচার্য। গত বারের প্রার্থী দুধ কুমার মণ্ডল বেশ ভালো পরিমাণ ভোট পান। এবার তাঁকে টিকিটই দেয়নি বিজেপি। ফলে, বাম-কংগ্রেস জোটের একটা সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। শেষমেশ ফলাফল কি হয় তা জানা যাবে আগামী ৪ঠা জুন। তার আগে বীরভূমের মানুষের দাবি, শান্তিপূর্ণ এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ।








