আমেরিকা ও ইজরায়েল ফের ইরানে হামলা চালালে সংঘাতের নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে সমুদ্রের তলদেশে থাকা ইন্টারনেট কেবল। পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীর গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ পরিকাঠামোকে নিশানা করার পরিকল্পনা করেছে তেহরান, এমনই দাবি দুই ইরানি নিরাপত্তা আধিকারিকের। ২৩ অক্টোবর রয়টার্সের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্ভাব্য হামলার পাশাপাশি কেবল মেরামতের কাজও আটকে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন এক আধিকারিক।
অন্যদিকে, ফ্লরিডায় এক সভায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও ভয়ংকর হামলার সম্ভাবনার কথা বলেছেন বলে আপনার দেওয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ, যুদ্ধবিরতি চললেও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা কমার স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই। তবে নতুন করে হামলা শুরু হবে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তের কথা এই তথ্য থেকে বলা যায় না।
কেন সমুদ্রের তলার ইন্টারনেট কেবল গুরুত্বপূর্ণ?
বিশ্বের ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থার বড় অংশ নির্ভর করে সমুদ্রের তলদেশে বসানো ফাইবার-অপটিক কেবলের উপর। আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ট্র্যাফিক, আর্থিক লেনদেন, ক্লাউড পরিষেবা এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে তথ্য আদানপ্রদানে এই কেবল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
ইরানের হুঁশিয়ারির কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালী। এই জলপথ পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশ্বের জ্বালানি পরিবহণের পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও এই এলাকার কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে টেলিযোগাযোগ গবেষণা সংস্থা TeleGeography-র তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ১ শতাংশেরও কম প্রবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলের কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে উপসাগরীয় দেশগুলিতে বড় সমস্যা তৈরি হতে পারে, কিন্তু তাতেই গোটা বিশ্বের ইন্টারনেট ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়।
ইরানের পরিকল্পনা ঠিক কী?
রয়টার্সের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত দুই ইরানি নিরাপত্তা আধিকারিকের দাবি, আমেরিকা ও ইজরায়েল ফের হামলা চালালে সমুদ্রের তলদেশে থাকা যোগাযোগ কেবলকে নিশানা করার পরিকল্পনা রয়েছে তেহরানের। একজন আধিকারিকের বক্তব্য অনুযায়ী, হামলার পর কেবল মেরামত করার কাজ আটকে দেওয়ার চেষ্টা করা হতে পারে, যাতে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘ্ন দীর্ঘস্থায়ী হয়।
এর আগে ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পসের (IRGC) রাজনৈতিক বিষয়ক উপপ্রধান ইয়াদোল্লাহ জাভানি হরমুজ প্রণালীর নিচে থাকা গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারনেট কেবলকে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। ইরানি আধিকারিকদের বক্তব্যে সাতটি বড় কেবলের কথা উঠে এসেছে। তবে কেবলগুলি কীভাবে বা ঠিক কোন জায়গায় আক্রমণের শিকার হতে পারে, তার বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ্যে আসেনি।
এই হুঁশিয়ারির তাৎপর্য শুধু ইন্টারনেট সংযোগে সীমাবদ্ধ নয়। উপসাগরীয় অঞ্চলের আর্থিক লেনদেন, অনলাইন ব্যবসা, ক্লাউড পরিষেবা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির ডিজিটাল কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কেবল মেরামতে দেরি হলে সেই সমস্যা আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে কি ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাবে?
ইরানের হুঁশিয়ারির পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, সমুদ্রের নিচে ইন্টারনেট কেবল ধ্বংস হলে কি গোটা পৃথিবীর ইন্টারনেট ব্যবস্থা স্তব্ধ হয়ে যাবে?
এর সরাসরি উত্তর—এমনটা অবশ্যম্ভাবী নয়। সমুদ্রের তলদেশে অসংখ্য আন্তর্জাতিক কেবল নেটওয়ার্ক রয়েছে। কোনও একটি কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিছু ক্ষেত্রে বিকল্প রুট দিয়ে তথ্যপ্রবাহ চালানো সম্ভব। তবে একই অঞ্চলের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কেবল একসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিকল্প সংযোগের উপর চাপ বাড়তে পারে। ফলে নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলে ইন্টারনেটের গতি কমে যাওয়া, সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া কিংবা অনলাইন পরিষেবায় সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলিতে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, ব্যাঙ্কিং, ব্যবসা এবং ক্লাউড পরিষেবা ব্যাহত হতে পারে। মেরামতের কাজ যুদ্ধের পরিস্থিতিতে কঠিন হয়ে পড়লে সমস্যা আরও বাড়তে পারে। তবে বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার দাবি সমর্থন করার মতো তথ্য বর্তমানে নেই।
ট্রাম্পের পালটা হুঁশিয়ারি, সংঘাত কি আবার বাড়বে?
ইরানের তরফে নতুন করে হামলার সম্ভাবনার কথা বলা হলেও আমেরিকার অবস্থানও নরম হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে না। আপনার দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্লরিডার সভায় ট্রাম্প সম্ভাব্য আরও ভয়ংকর হামলার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্যে তেহরানের সঙ্গে সমঝোতা নিয়ে সংশয়ও প্রকাশ পেয়েছে।
এর আগে ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘাচি আমেরিকার হুমকির জবাবে কড়া বার্তা দিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, ফের সামরিক সংঘাতের পথে হাঁটলে ইরান প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
তবে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যের সম্পূর্ণ সরকারি প্রতিলিপি বা নির্ভরযোগ্য স্বাধীন প্রতিবেদন ছাড়া নির্দিষ্ট উদ্ধৃতির ভাষা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তাই বক্তব্যের মূল অর্থ প্রকাশের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।
ইন্টারনেটের পাশাপাশি অর্থনীতিতেও পড়তে পারে প্রভাব
সমুদ্রের তলার যোগাযোগ কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব প্রযুক্তির বাইরেও ছড়াতে পারে। আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন, বহুজাতিক সংস্থার তথ্যপ্রবাহ, অনলাইন বাণিজ্য এবং ডিজিটাল পরিষেবার উপর চাপ তৈরি হতে পারে। উপসাগরীয় অঞ্চলে কাজ করা সংস্থাগুলির জন্য বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যবহার করার খরচও বাড়তে পারে।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, হরমুজ প্রণালীর কেবলগুলির ক্ষতি এবং লোহিত সাগরের মতো অন্য গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক যোগাযোগপথে বিঘ্নের প্রভাব এক নয়। কোন এলাকায় কতগুলি কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং বিকল্প রুট কতটা সচল থাকছে, তার উপরই সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ নির্ভর করবে।
সব মিলিয়ে, ইরান-আমেরিকা সংঘাত নতুন করে বাড়লে সমুদ্রের তলার ইন্টারনেট কেবল গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু ইরানের হুঁশিয়ারি মানেই বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। আপাতত নজর কূটনৈতিক পরিস্থিতি, সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ পরিকাঠামোর নিরাপত্তার দিকে।



