খেইবার শেকান থেকে সেজ্জিল— ইরানের ‘মিসাইল আর্সেনাল’ কতটা ভয়ঙ্কর? আকাশ প্রতিরক্ষাতেও কতটা শক্তিশালী তেহরান

খেইবার শেকান, শাহাব, সেজ্জিল— ৩০০০-এর বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডার ইরানের। সঙ্গে রয়েছে S-300, বাভার-৩৭৩ ও খোরদাদ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে। ইজ়রায়েল ও আমেরিকার ধারাবাহিক হামলার জবাবে ইরানও পাল্টা শক্তি প্রদর্শন শুরু করেছে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন হামলা এবং উন্নত সামরিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তেহরান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে— তাদের হাতে রয়েছে বিপুল অস্ত্রভান্ডার। খেইবার শেকান, শাহাব, সেজ্জিল থেকে শুরু করে নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা— সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, বাস্তবে কতটা শক্তিশালী ইরানের সামরিক ক্ষমতা?

পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাতের দ্বিতীয় সপ্তাহে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। মার্কিন ও ইজ়রায়েলি বাহিনীর হামলায় ইরানের তেল ডিপো ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হলেও, পাল্টা আঘাতে ইরানও একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে বলে দাবি। এমনকি উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘THAAD’-এর রাডার ধ্বংস করার কথাও জানিয়েছে তেহরান।

ইরানের সামরিক বাহিনী সম্প্রতি একাধিক ভিডিও প্রকাশ করে দাবি করেছে, ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ়–৪’-এর অংশ হিসেবে তারা খেইবার শেকান, এমাদ ও গাদর ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে।

খেইবার শেকান থেকে সেজ্জিল— ইরানের ‘মিসাইল আর্সেনাল’ কতটা ভয়ঙ্কর? আকাশ প্রতিরক্ষাতেও কতটা শক্তিশালী তেহরান
খেইবার শেকান থেকে সেজ্জিল— ইরানের ‘মিসাইল আর্সেনাল’ কতটা ভয়ঙ্কর? আকাশ প্রতিরক্ষাতেও কতটা শক্তিশালী তেহরান

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার কত বড়

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের হাতে ৩,০০০-এরও বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। যদিও এই অস্ত্রগুলির বেশিরভাগই স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার।

এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলির পাল্লা সাধারণত ৩০০ কিলোমিটার থেকে ২,৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। এর ফলে পশ্চিম এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল ইরানের আঘাতের আওতায় পড়ে।

স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র

ইরানের অস্ত্রভাণ্ডারে বেশ কিছু স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

  • শাহাব-১ (পাল্লা প্রায় ৩৫০ কিমি)

  • শাহাব-২ (প্রায় ৭৫০ কিমি)

  • কিয়াম-১ (প্রায় ৭৫০ কিমি)

এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলির অধিকাংশই তরল জ্বালানিচালিত এবং দ্রুত মোতায়েনযোগ্য।

এছাড়া ইরানের ফতেহ সিরিজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কঠিন জ্বালানিচালিত এই হাইপারসনিক প্রযুক্তির অস্ত্রগুলির মধ্যে রয়েছে—

  • ফতেহ-১১০ (৩০০ কিমি)

  • ফতেহ-৩১৩ (৫০০ কিমি)

  • জ়োলফাগার (৭৫০ কিমি)

খেইবার শেকান থেকে সেজ্জিল— ইরানের ‘মিসাইল আর্সেনাল’ কতটা ভয়ঙ্কর? আকাশ প্রতিরক্ষাতেও কতটা শক্তিশালী তেহরান
খেইবার শেকান থেকে সেজ্জিল— ইরানের ‘মিসাইল আর্সেনাল’ কতটা ভয়ঙ্কর? আকাশ প্রতিরক্ষাতেও কতটা শক্তিশালী তেহরান

মাঝারি ও দূরপাল্লার অস্ত্র

ইরানের হাতে এমন কিছু মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে যা পশ্চিম এশিয়ার বহু গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে আঘাত হানতে সক্ষম।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

  • শাহাব-৩

  • গাদর-১১০

  • সেজ্জিল

এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলির পাল্লা সাধারণত ১২০০ থেকে ৩০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বলে বিভিন্ন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

‘দুর্গ ধ্বংসকারী’ খেইবার শেকান

ইরানের সাম্প্রতিক অস্ত্রভাণ্ডারের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ক্ষেপণাস্ত্রগুলির একটি খেইবার শেকান

ইরানি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (IRGC Aerospace Force) নিয়ন্ত্রণে থাকা এই ক্ষেপণাস্ত্রটি একটি কঠিন জ্বালানিচালিত মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল

‘খেইবার শেকান’ শব্দের অর্থ ‘দুর্গ ধ্বংসকারী’ (Castle Buster)

ইরানি সূত্রের দাবি, এর পাল্লা প্রায় ১,৪৫০ কিলোমিটার। ফলে পশ্চিম ইরান থেকে নিক্ষেপ করলে সহজেই পশ্চিম এশিয়ার বহু গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা সম্ভব।

প্রায় ৪ মিটার লম্বা এবং ১৫০০ কেজি ওজনের এই ক্ষেপণাস্ত্র বায়ুমণ্ডলের মধ্যে প্রায় ১৯,৫০০ কিমি প্রতি ঘণ্টা গতিতে আঘাত হানতে পারে বলে দাবি করা হয়। এই উচ্চগতির কারণে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষেও একে আটকানো কঠিন হতে পারে।

ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা

শুধু আক্রমণাত্মক অস্ত্রই নয়, ইরান গত কয়েক বছরে নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছে

আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল কাজ হল শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, রকেট বা যুদ্ধবিমান শনাক্ত করে মাঝ আকাশেই ধ্বংস করা।

এই ব্যবস্থায় সাধারণত চারটি প্রধান উপাদান থাকে—

  • রেডার

  • সেন্সর

  • কমান্ড সিস্টেম

  • ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র

রাশিয়ার S-300

ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে রাশিয়ার তৈরি S-300 PMU2

এটি একটি দূরপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যা একাধিক লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করে আঘাত হানতে সক্ষম।

তবে ২০২৪ সালে ইজ়রায়েলি হামলায় এই ব্যবস্থার কিছু ক্ষতি হয়েছিল বলে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

খেইবার শেকান থেকে সেজ্জিল— ইরানের ‘মিসাইল আর্সেনাল’ কতটা ভয়ঙ্কর? আকাশ প্রতিরক্ষাতেও কতটা শক্তিশালী তেহরান

দেশীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা

বিদেশি প্রযুক্তির উপর নির্ভরতা কমাতে ইরান নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও তৈরি করেছে।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

বাভার-৩৭৩
ইরানের তৈরি দূরপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এতে ব্যবহৃত সৈয়দ-৪বি ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা প্রায় ৩০০ কিলোমিটার বলে দাবি করা হয়।

খোরদাদ-১৫
মাঝারি পাল্লার একটি মোবাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এটি প্রায় ৮৫ কিলোমিটার দূরত্বে স্টেলথ বিমান শনাক্ত করতে পারে বলে দাবি।

সেভম খোরদাদ
এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রায় ১০৫ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। ২০১৯ সালে একটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করার পর এটি আন্তর্জাতিক নজর কেড়েছিল।

খেইবার শেকান থেকে সেজ্জিল— ইরানের ‘মিসাইল আর্সেনাল’ কতটা ভয়ঙ্কর? আকাশ প্রতিরক্ষাতেও কতটা শক্তিশালী তেহরান
খেইবার শেকান থেকে সেজ্জিল— ইরানের ‘মিসাইল আর্সেনাল’ কতটা ভয়ঙ্কর? আকাশ প্রতিরক্ষাতেও কতটা শক্তিশালী তেহরান

প্রযুক্তির লড়াই

ইরান দাবি করে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানকেও লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। তবে সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিগত দিক থেকে এখনও ইজ়রায়েল ও আমেরিকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই এগিয়ে

তবুও বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার এবং ক্রমশ উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির কারণে পশ্চিম এশিয়ার সামরিক সমীকরণে ইরান একটি বড় শক্তি হিসেবেই বিবেচিত হয়।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহুর্তে। আমাদের ফলো করুন
Google News Google News

সদ্য প্রকাশিত