ভারতীয় ক্রীড়াপ্রশাসনের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান। মোহন বাগান-এর প্রাক্তন সভাপতি ও প্রবাদপ্রতিম প্রশাসক স্বপনসাধন বোস, যিনি সকলের কাছে ‘টুটুবাবু’ নামেই পরিচিত, মঙ্গলবার গভীর রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হলেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। দীর্ঘদিনের অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করেও শেষরক্ষা হল না—ময়দানে রেখে গেলেন এক বিশাল শূন্যতা।
সূত্রের খবর, গত সোমবার সন্ধ্যাতেই আচমকা শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে তাঁর। তড়িঘড়ি তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে শুরু থেকেই ভেন্টিলেশন সাপোর্টে রাখা হয়। তাঁর অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়তেই হাসপাতালে ছুটে যান কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক। পাশাপাশি, All India Football Federation-এর সভাপতি কল্যান চৌবে-ও খোঁজ নেন তাঁর শারীরিক অবস্থার। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী-ও নিয়মিতভাবে পরিস্থিতির আপডেট নিচ্ছিলেন এবং চিকিৎসার জন্য বিশেষ মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছিল। তবে মঙ্গলবার রাতে দ্বিতীয়বার হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর আর তাঁকে বাঁচানো যায়নি। পরিবারের তরফে গভীর রাতে তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়।
মোহনবাগান ক্লাবের সঙ্গে টুটু বসুর সম্পর্ক ছিল অবিচ্ছেদ্য। ১৯৯১ সালে সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রায় তিন দশক ধরে ক্লাব প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তিনি। ২০১৮ সাল পর্যন্ত সভাপতির দায়িত্ব সামলানোর পর আবার সচিব এবং পরবর্তীতে দু’দফায় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৫ সালের আগে তিনি স্বেচ্ছায় পদ ছাড়লেও, তাঁর প্রভাব এবং উপস্থিতি কখনও ম্লান হয়নি।
তাঁর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেই মোহনবাগান পৌঁছয় নতুন উচ্চতায়। শিল্পপতি সঞ্জীব গোয়েঙ্কা-র হাতে ক্লাবের অংশীদারিত্ব তুলে দেওয়ার মতো সাহসী সিদ্ধান্ত যেমন নিয়েছিলেন, তেমনই ইতিহাস গড়েছিলেন বিদেশি ফুটবলার সই করিয়ে। নাইজেরিয়ান স্ট্রাইকার চিমা ওকেরি-কে দলে নিয়ে এসে মোহনবাগানের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় শুরু করেছিলেন তিনিই—যেখানে আগে বিদেশি ফুটবলারের উপস্থিতি ছিল অকল্পনীয়।
শুধু ক্লাব প্রশাসক নয়, টুটু বসুর পরিচয় ছিল বহুমাত্রিক। তিনি ছিলেন ব্যবসায়ী, সংবাদপত্রের মালিক এবং রাজ্য সভা-র প্রাক্তন সাংসদ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘদিন শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন তিনি, হুইলচেয়ারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন। ফলে সক্রিয় প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে কিছুটা দূরে সরে গেলেও, সমর্থকদের মনে তাঁর জায়গা ছিল অটুট।
গত বছর মোহনবাগান দিবসে তাঁকেই দেওয়া হয় ‘মোহনবাগান রত্ন’ সম্মান—যা তাঁরই উদ্যোগে চালু হয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সৌরভ গাঙ্গুলি, ভাইচুং ভুটিয়া, আই. এম. বিজয়ন, জোস ব্যারেটো এবং সুব্রত ভট্টাচার্যর-র মতো তারকারা। সেই সম্মান যেন তাঁর দীর্ঘ অবদানের স্বীকৃতি হয়ে রইল।
টুটু বসুর প্রয়াণে শুধু মোহনবাগান নয়, গোটা ভারতীয় ফুটবল হারাল এক দূরদর্শী সংগঠককে—যার শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।



