রাশিয়া থেকে তেল কেনা নিয়ে ভারত ও আমেরিকার মধ্যে ফের চাপানউতোর শুরু হয়েছে। মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস সম্প্রতি এমন একটি নিষেধাজ্ঞা বিল পাস করেছে, যাতে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস কেনা দেশগুলির উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে। সম্ভাব্য এই পদক্ষেপের মুখে ভারত অবশ্য নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে—দেশের ১৪০ কোটি মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই নয়াদিল্লির প্রধান অগ্রাধিকার।
‘Lindsey O. Graham Sanctioning Russia and Iran Act of 2026’ নামে বিলটি ১৬ সেপ্টেম্বর মার্কিন হাউসে ২৬২-১৫৯ ভোটে পাস হয়েছে। এর আগে মার্কিন সেনেটেও বিলটি অনুমোদিত হয়েছিল। এখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Donald Trump) স্বাক্ষরের পরই তা আইনে পরিণত হবে। বিলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, রাশিয়ার জ্বালানি কিনছে এমন দেশগুলির উপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা মার্কিন প্রশাসনকে দেওয়া। ভারত ও চিন এই ব্যবস্থার সম্ভাব্য লক্ষ্যগুলির মধ্যে রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার ভারতের বিদেশ মন্ত্রক (Ministry of External Affairs) জানিয়ে দিয়েছে, জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে ভারত নিজের প্রয়োজন ও আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দিয়েই সিদ্ধান্ত নেবে। মন্ত্রকের বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্বের তেল সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বাজারের গতিপ্রকৃতি বিবেচনা করে বিভিন্ন উৎস থেকে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ চালিয়ে যাবে ভারত।
নয়াদিল্লির বক্তব্যে আরও উঠে এসেছে, এই বিষয়টি নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে আমেরিকার সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হয়েছে। ভারত আগেই ওয়াশিংটনকে জানিয়েছে, রুশ তেল আমদানির উপর এমন পদক্ষেপ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারতের অবস্থানের নেপথ্যে রয়েছে দেশের বিপুল অপরিশোধিত তেলের চাহিদা। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল আমদানিকারক হিসেবে ভারত আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামা এবং সরবরাহের ধারাবাহিকতার উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। ফলে কোনও একটি উৎস থেকে আমদানি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত সরাসরি দেশের জ্বালানি বাজার এবং বৃহত্তর অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
রাশিয়া থেকে তুলনামূলক সুবিধাজনক দামে অপরিশোধিত তেল কেনার ফলে গত কয়েক বছরে ভারতের তেল আমদানির চিত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে। একইসঙ্গে ভারত বরাবরই বলে এসেছে, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি এবং দেশের জ্বালানি চাহিদার কথা মাথায় রেখেই আমদানির উৎস বেছে নেওয়া হয়। রাশিয়া থেকে তেল কেনা নিয়ে পশ্চিমা চাপের মধ্যেও সেই অবস্থান পুরোপুরি বদলায়নি।
তবে সম্ভাব্য মার্কিন শুল্কের প্রভাব শুধু তেল আমদানিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আমেরিকার বাজারে ভারতীয় পণ্যের উপর অতিরিক্ত শুল্ক চাপলে রফতানিকারকদের খরচ বাড়তে পারে এবং দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কেও তার প্রভাব পড়তে পারে। ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, দেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে নয়াদিল্লি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
অন্য দিকে, মার্কিন পদক্ষেপের প্রভাব নিয়ে ভারতের তেল পরিশোধন সংস্থাগুলির মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে। অতিরিক্ত শুল্ক বা রুশ তেল আমদানিতে বাধা তৈরি হলে বিকল্প উৎস থেকে তেল কেনার খরচ বাড়তে পারে বলে শিল্পমহলের আশঙ্কা। সেই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের উপরও চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এই মুহূর্তে ১০০ শতাংশ শুল্ক ভারতের উপর কার্যকর হয়ে যায়নি। মার্কিন কংগ্রেসের পাস করা আইনে এমন শুল্ক আরোপের আইনি ক্ষমতা তৈরি হয়েছে; পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করবে ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তের উপর। একইসঙ্গে আইনে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে প্রেসিডেন্টের কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক বা নিষেধাজ্ঞা মওকুফ করার সুযোগও রাখা হয়েছে।
ফলে আপাতত নজর মার্কিন প্রেসিডেন্টের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং ভারত-মার্কিন কূটনৈতিক আলোচনার দিকে। রুশ তেল নিয়ে চাপ বাড়লেও দিল্লির অবস্থান আপাতত স্পষ্ট—দেশের জ্বালানি সরবরাহ, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং ১৪০ কোটি মানুষের প্রয়োজনকে সামনে রেখেই তেল আমদানির নীতি নির্ধারণ করা হবে।



