১৮ বছরের কম বয়সিদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে নতুন নিয়ন্ত্রণ আনতে চলেছে কেন্দ্রীয় সরকার। শিশু ও কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য, পড়াশোনা এবং ডিজিটাল আসক্তি নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের মধ্যে এবার বয়সভিত্তিক আলাদা নিয়ম চালু করার পরিকল্পনা করছে নরেন্দ্র মোদী সরকার। সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, ১৮ বছরের নিচে ব্যবহারকারীদের জন্য তিনটি আলাদা বয়সের বিভাগ তৈরি করে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের নিয়ম নির্ধারণ করা হতে পারে। এই বিষয়ে একটি নতুন আইন সংসদের আসন্ন বাদল অধিবেশনে পেশ করা হতে পারে বলেও সূত্রের খবর।
সরকারি মহলের মতে, সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং বয়স অনুযায়ী ধাপে ধাপে নিয়ন্ত্রণই বেশি কার্যকর হতে পারে। সেই কারণেই শিশু ও কিশোরদের জন্য তিনটি বয়সভিত্তিক শ্রেণি তৈরির পরিকল্পনা চলছে—
৮ থেকে ১২ বছর, ১২ থেকে ১৬ বছর, এবং ১৬ থেকে ১৮ বছর। প্রতিটি বয়সের ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের নিয়ম ও সীমাবদ্ধতা আলাদা হতে পারে।


আইটি মন্ত্রক ইতিমধ্যেই এই বিষয়ে একাধিক বৈঠক করেছে। সেখানে শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের জন্য সময়সীমা নির্ধারণের প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে। যেমন—দিনে নির্দিষ্ট সময়ের বেশি ব্যবহার করা যাবে না, রাতের দিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় লগ-ইন নিষিদ্ধ থাকতে পারে, এবং প্রতিদিনের ব্যবহারের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হতে পারে।
এছাড়াও অপ্রাপ্তবয়স্কদের অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিভাবকের সম্মতি বাধ্যতামূলক করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা আরও জোরদার করা সম্ভব হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণের দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া ইতিমধ্যেই শিশুদের জন্য কঠোর আইন চালু করেছে, আর ইন্দোনেশিয়া ১৬ বছরের নিচে ব্যবহারকারীদের জন্য ইনস্টাগ্রামসহ কয়েকটি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা করছে। সম্প্রতি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁও ভারতের কাছে ১৫ বছরের নিচে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছেন।


সরকারি সূত্রের মতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষতিকর কনটেন্ট, ভুয়ো তথ্য এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি বিভ্রান্তিকর বিষয়বস্তুর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য, আচরণগত সমস্যা এবং ডিজিটাল আসক্তি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
২০২৫-২৬ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষাতেও শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে বয়সভিত্তিক সীমা নির্ধারণ এবং বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ করা হয়েছিল। সেখানে আরও বলা হয়েছিল, শিশুদের জন্য সাধারণ ফোন বা শুধুমাত্র শিক্ষামূলক ডিভাইস ব্যবহারের প্রচার করা উচিত।
তবে প্রযুক্তি সংস্থাগুলির একাংশ মনে করছে, যদি বিভিন্ন রাজ্য আলাদা নিয়ম চালু করে, তবে তা বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হবে। উদাহরণস্বরূপ, কর্ণাটক ১৬ বছরের নিচে সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার কথা ভাবছে, আবার অন্ধ্রপ্রদেশে সেই সীমা ১৩ বছর।
অন্যদিকে ডিজিটাল অধিকার কর্মীদের মতে, পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা সমস্যার সমাধান নয়। তাদের আশঙ্কা, এতে শিশুদের তথ্য পাওয়ার অধিকার এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে ভারতে মেয়েদের ডিজিটাল প্রবেশাধিকার তুলনামূলক কম হওয়ায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা ডিজিটাল লিঙ্গ বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
সরকারি সূত্র জানিয়েছে, সম্ভাব্য আইনের ক্ষেত্রে সরকারের মূল লক্ষ্য হবে শিশুদের সুরক্ষা এবং নাগরিকের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিল সংসদে পেশ হওয়ার পর তা স্থায়ী কমিটির কাছে পাঠানো হবে এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে পরে সারা দেশে অভিন্ন আইন চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।







