নজরবন্দি ব্যুরো: দিল্লিতে বায়ুসেনার এক উইং কমান্ডারকে গ্রেফতার ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। অভিযোগ, সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিচয়ের সূত্র ধরে তাঁকে ‘হানিট্র্যাপ’-এ ফাঁসিয়ে প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা হ্যান্ডলাররা। দিল্লি পুলিশের সূত্রের দাবি, ওই আধিকারিকের বিরুদ্ধে তথ্য পাচারের অভিযোগে মামলা হয়েছে এবং তাঁকে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি এখন বিস্তারিত তদন্ত করছে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সংস্থাগুলি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই উইং কমান্ডারকে ৩১ মে গ্রেফতার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’ (Official Secrets Act)-এর আওতায় মামলা দায়ের হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তদন্তকারীদের নজরে আসে, প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে একটি বড়সড় চক্র কাজ করছে। সেই তদন্তের সূত্র ধরেই বায়ুসেনার ওই আধিকারিকের ভূমিকা সামনে আসে বলে পুলিশ সূত্রের দাবি।
তদন্তকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, সোশ্যাল মিডিয়ায় এক মহিলার সঙ্গে ওই আধিকারিকের পরিচয় হয়েছিল। ধীরে ধীরে সেই যোগাযোগ ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে পরিণত হয়। নিয়মিত চ্যাট এবং ভিডিয়ো কলের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ চলত বলে জানা গিয়েছে।
পুলিশের দাবি, এই যোগাযোগের মাধ্যমেই ধীরে ধীরে ওই আধিকারিকের আস্থা অর্জন করা হয়। পরে তাঁর কাছ থেকে বায়ুসেনা ও প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য চাওয়া হতে থাকে। এমনকি ছবি ও ভিডিয়োও চাওয়া হয়েছিল বলে তদন্তকারী সূত্রের দাবি।
তদন্তের সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি উঠেছে অন্য একটি ঘটনায়। পুলিশ সূত্রের দাবি, ওই মহিলার কথায় নিজের এক সহকর্মীর মোবাইল ফোনে তথ্য সংগ্রহের একটি সফ্টওয়্যার ইনস্টল করে দিয়েছিলেন অভিযুক্ত উইং কমান্ডার।
তদন্তকারীদের সন্দেহ, সেটি স্পাইওয়্যার বা রিমোট-অ্যাকসেস ধরনের কোনও ম্যালওয়্যার হয়ে থাকতে পারে। এমন সফ্টওয়্যারের মাধ্যমে কোনও ডিভাইসের তথ্য, যোগাযোগ বা অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য গোপনে সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে ওই নির্দিষ্ট অ্যাপটি ঠিক কী ছিল এবং সেটি কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করেছিল, তা এখনও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের আরও দাবি, ঘটনাটি শুধু একজন বায়ুসেনা আধিকারিকের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বাহিনীর আরও সদস্যদের সম্পর্কে তথ্য জোগাড়ের চেষ্টা হয়েছিল কি না, সেই সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তকারী সূত্রের দাবি, উইং কমান্ডারের সঙ্গে যে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থেকে যোগাযোগ করা হয়েছিল, সেটি পাকিস্তান থেকে পরিচালিত হচ্ছিল। সেই অ্যাকাউন্টের পিছনে কারা ছিলেন এবং তাঁদের সঙ্গে আরও কোনও ব্যক্তি বা সংগঠনের যোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
বায়ুসেনার এক মুখপাত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই আধিকারিককে বেশ কিছুদিন ধরেই নজরদারিতে রাখা হয়েছিল। পরে তদন্তের ভিত্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও সে সময় কিছুটা টানাপড়েন চলছিল বলে তদন্তকারীদের সূত্রে উঠে এসেছে।
তবে এখনও পর্যন্ত ঠিক কতটা সংবেদনশীল তথ্য তাঁর মাধ্যমে বাইরে গিয়েছে, আদৌ কোনও গোপন সামরিক নথি বা গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল তথ্য পাচার হয়েছে কি না, তার স্পষ্ট উত্তর মেলেনি। তদন্তকারীরা সেই বিষয়টিই এখন খতিয়ে দেখছেন। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে দোষী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।
এই ঘটনায় ফের সামনে এল ‘হানিট্র্যাপ’ এবং সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো কৌশলের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা কর্মীদের টার্গেট করার আশঙ্কা। অতীতে ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থার তদন্তেও অনলাইন পরিচয়, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে প্রতিরক্ষা কর্মীদের ফাঁসানোর একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে।
বর্তমান ঘটনাতেও তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সেই একই প্রশ্ন—ব্যক্তিগত যোগাযোগের আড়ালে কতটা বড় নেটওয়ার্ক কাজ করছিল এবং তার লক্ষ্য কি শুধু একজন আধিকারিক, নাকি আরও অনেক প্রতিরক্ষা কর্মী। দিল্লি পুলিশের তদন্ত এগোলেই সেই প্রশ্নগুলির উত্তর স্পষ্ট হবে। আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, বায়ুসেনার ওই উইং কমান্ডারের মাধ্যমে ঠিক কী তথ্য বাইরে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল এবং এই চক্রের সঙ্গে আর কারা যুক্ত, তা নির্ধারণ করা।



