নজরবন্দি ব্যুরো: রাশিয়ার কাছ থেকে তেল ও গ্যাস কেনা দেশগুলির উপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক চাপানোর ক্ষমতা দিতে চাওয়া মার্কিন বিল পাস হয়ে গেল সেনেটে। শুক্রবারের চূড়ান্ত ভোটে ৮৬-১১ ব্যবধানে পাশ হয়েছে ‘Lindsey O. Graham Sanctioning Russia Act’। এর ফলে ভারত ও চিনের মতো রুশ জ্বালানির বড় ক্রেতাদের উপর নতুন করে মার্কিন শুল্কের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তবে এখনই ১০০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হচ্ছে না—বিলটি এখনও মার্কিন হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভসে পাশ হতে হবে এবং তার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষর প্রয়োজন।
বিলটির লক্ষ্য শুধু রাশিয়াকে শাস্তি দেওয়া নয়, রুশ তেল ও গ্যাসের সবচেয়ে বড় ক্রেতাদের উপর চাপ তৈরি করে মস্কোর জ্বালানি-রাজস্ব কমানো। মার্কিন আইনপ্রণেতাদের যুক্তি, রুশ জ্বালানি কিনে অন্য দেশগুলি পরোক্ষভাবে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করছে।
সেনেটে চূড়ান্ত ভোটাভুটিতে বিলটি ৮৬-১১ ভোটে অনুমোদিত হয়েছে। এর আগে প্রক্রিয়াগত বাধা সরানোর ভোটেও ৮৬ জন সেনেটর বিলটির পক্ষে এবং ১২ জন বিপক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। এবার সেনেটের পরবর্তী ধাপ হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভস। হাউসের অনুমোদন মিললে তবেই বিলটি প্রেসিডেন্টের কাছে যাবে।
নতুন আইনে প্রেসিডেন্টকে রুশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের শীর্ষ ক্রেতা দেশগুলির পণ্য আমদানির উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানোর ক্ষমতা দেওয়ার কথা রয়েছে। অর্থাৎ, শুল্কটি রুশ তেলের উপর সরাসরি বসবে না; রুশ জ্বালানি কেনা দেশ থেকে আমেরিকায় যাওয়া পণ্যের উপর তা আরোপ করা হতে পারে।
এই জায়গাতেই ভারতের জন্য বড় উদ্বেগ। রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কেনার ক্ষেত্রে ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রেতা এবং সংশোধিত মার্কিন প্রস্তাবের সম্ভাব্য লক্ষ্য পাঁচটি দেশের তালিকায় ভারত রয়েছে। এই তালিকায় ভারতের পাশাপাশি চিন, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি এবং আজ়ারবাইজানের নাম রয়েছে।
আগের খসড়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন ছিল। সেখানে রুশ জ্বালানি কেনা দেশগুলির উপর সর্বোচ্চ ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কের প্রস্তাব ছিল। সংশোধিত বিলে সেই সর্বোচ্চ সীমা কমিয়ে ১০০ শতাংশ করা হয়েছে এবং ব্যবস্থাটি মূলত রুশ তেল ও গ্যাসের শীর্ষ পাঁচ ক্রেতার দিকে কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে।
ওয়াশিংটনের যুক্তি, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের (Vladimir Putin) যুদ্ধযন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উৎস হল জ্বালানি বিক্রি থেকে পাওয়া রাজস্ব। তাই রাশিয়ার পরিবর্তে তার বড় ক্রেতাদের উপরেও চাপ তৈরি করলে মস্কোর তেল-রাজস্ব কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের একাংশ।
ইউক্রেনও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। বিলটি সেনেটে পাশ হওয়ার পর ইউক্রেনের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছে ওয়াশিংটন। একই সঙ্গে রাশিয়ার উপর আরও কড়া অর্থনৈতিক চাপ তৈরির জন্য এই আইনকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
ভারতের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল। রাশিয়ার কাছ থেকে তুলনামূলক সস্তায় অপরিশোধিত তেল কেনা গত কয়েক বছরে ভারতের জ্বালানি আমদানির কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে রুশ তেল কেনা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলে শুধু কূটনৈতিক সমীকরণ নয়, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও আমদানি খরচের উপরও প্রভাব পড়তে পারে।
এর মধ্যেই আমেরিকা ভারতীয় পণ্যের উপর রুশ তেল আমদানির কারণে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ব্যবস্থা করেছিল ২০২৫ সালে। নতুন মার্কিন আইন কার্যকর হলে সেই চাপের সঙ্গে নতুন শুল্ক-ঝুঁকি যুক্ত হতে পারে।
তবে এই মুহূর্তে ভারতের উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক চূড়ান্ত বা কার্যকর সিদ্ধান্ত নয়। প্রথমে মার্কিন হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভসে বিলটি পাশ হতে হবে। তার পর ট্রাম্প তাতে স্বাক্ষর করবেন কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি আইন হয়ে গেলেও শুল্ক আরোপের বিষয়টি প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত ও আইনে দেওয়া ক্ষমতার প্রয়োগের উপর নির্ভর করবে।
নয়াদিল্লির সামনে তাই এখন বড় প্রশ্ন—রুশ তেল কেনা অব্যাহত রেখে মার্কিন শুল্কের ঝুঁকি নেওয়া হবে, নাকি আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সমীকরণ মাথায় রেখে জ্বালানি আমদানির কৌশলে পরিবর্তন আনা হবে। ভারতের নীতি নির্ধারণে জাতীয় স্বার্থ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং দেশের বিপুল অভ্যন্তরীণ চাহিদাই যে প্রধান বিবেচনা হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সেনেটের ভোটে বিলটি বড় ব্যবধানে পাশ হওয়ায় চাপ অবশ্যই বেড়েছে। কিন্তু ১০০ শতাংশ শুল্কের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। আগামী ধাপে মার্কিন হাউসে কী হয় এবং ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত কী অবস্থান নেন, তার উপরই নির্ভর করবে ভারতের উপর এই নতুন বাণিজ্যিক চাপ বাস্তবে কতটা বাড়ে।



