‘এনসিপিআই এনডিএ শরিক নয়, লোকসভায় এখনও তারা তৃণমূল!’ নবান্নে বললেন আবু-খলিলুর

মোদী-শাহের সঙ্গে বৈঠকের পর নবান্নে শুভেন্দুর সঙ্গে আবু তাহের ও খলিলুর রহমান। ‘এনসিপিআই এখনও এনডিএ শরিক নয়’, দাবি করে SIR ও মাইক নিয়ে নিজেদের অবস্থান জানালেন তাঁরা।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

নজরবন্দি ব্যুরো: দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠকে যোগ দেওয়ার এক দিনের মধ্যেই নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বৈঠক করলেন আবু তাহের খান ও খলিলুর রহমান। শনিবারের বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি করলেন দুই সাংসদ। তাঁদের বক্তব্য, এনসিপিআই (NCPI) এখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে এনডিএ-র শরিক নয় এবং লোকসভার নথিতে তাঁরা এখনও তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ হিসেবেই রয়েছেন। ভবিষ্যতে এনসিপিআই-তে থাকবেন কি না, সেই সিদ্ধান্তও এখনই নিচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন তাঁরা।

শুক্রবার দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) সরকারি বাসভবনে আয়োজিত এনডিএ সাংসদদের প্রাতরাশ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন আবু তাহের ও খলিলুর। তার আগে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গেও তাঁদের বৈঠক হয়েছিল বলে জানা যায়। সেই ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই কলকাতায় ফিরে নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) সঙ্গে দেখা করেন দুই সাংসদ।

বৈঠকের পর নবান্নেই সাংবাদিকদের সামনে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন তাঁরা। আবু তাহেরের দাবি, সংসদে এখনও তাঁদের নামের পাশে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস বা AITC-র পরিচয়ই রয়েছে। লোকসভার স্পিকার তাঁদের তৃণমূল সাংসদ হিসেবেই ডাকছেন এবং সংসদীয় নথিতেও সেই পরিচয়ই রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

আবু তাহেরের বক্তব্য, এনসিপিআই-তে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও সেটিকে সরাসরি এনডিএ-র আনুষ্ঠানিক শরিক হওয়া হিসেবে দেখা ঠিক নয়। তাঁর দাবি, এনডিএ-র বৈঠকে তাঁদের আমন্ত্রণ জানানো হলে তাঁরা সেখানে যাবেন, কিন্তু বিজেপিতে যোগ দেওয়ার কোনও সিদ্ধান্ত তাঁরা নেননি।

দুই সাংসদ আরও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ঠিকানা নিয়েও এখনই কোনও চূড়ান্ত ঘোষণা নেই। তাঁদের বক্তব্যের সারকথা, ভবিষ্যতে তাঁরা এনসিপিআই-তেই থাকবেন কি না, সেই উত্তর সময়ই দেবে।

এই মন্তব্যের মধ্যেই অবশ্য গত কয়েক সপ্তাহের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তৈরি হয়েছে। জুন মাসে তৃণমূলের ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদ এনসিপিআই-তে মিশে যাওয়ার কথা লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে জানিয়েছিলেন। সেই গোষ্ঠীর তরফে এনডিএ-কে সমর্থনের কথাও প্রকাশ্যে বলা হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে এনসিপিআই-কে ঘিরে এনডিএ-র সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নটি রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। তবে আবু তাহের ও খলিলুরের শনিবারের বক্তব্যে সেই সম্পর্ককে ‘আনুষ্ঠানিক শরিকানা’ হিসেবে চিহ্নিত করতে আপত্তি দেখা গেল। ফলে তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে জল্পনা আরও বাড়ল।

নবান্নে শনিবারের বৈঠকের মূল বিষয় অবশ্য রাজনীতি নয়, একাধিক জনস্বার্থের প্রশ্ন—এমনটাই দাবি দুই সাংসদের। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (SIR) ঘিরে মুর্শিদাবাদে সাধারণ মানুষের যে সমস্যাগুলি তৈরি হয়েছে, তা মুখ্যমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরা হয়েছে।

বিশেষ করে দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া মানুষের একটি অংশ প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে যথেষ্ট অবহিত নন বলে দাবি করেন তাঁরা। প্রথম দফায় প্রায় সাত লক্ষ মানুষের নাম সংক্রান্ত প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন বলেও জানান দুই সাংসদ।

অন্যদিকে, বাকি প্রায় ২০ লক্ষ মানুষের ক্ষেত্রে আবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে বলে তাঁদের বক্তব্য। এই বিষয়ে কেন্দ্র ও রাজ্য—দুই সরকারের কাছেই তাঁরা আবেদন জানিয়েছেন বলে দাবি করেন আবু তাহের ও খলিলুর।

বৈঠকে মসজিদের মাইক ও লাউডস্পিকার খুলে দেওয়া নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান তাঁরা। তাঁদের অভিযোগ, পুলিশি তৎপরতার ক্ষেত্রে কোনও কোনও জায়গায় একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়কে বেছে নেওয়া হচ্ছে বলে মানুষের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের আশ্বস্ত করেছেন বলে দাবি দুই সাংসদের। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনও নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না এবং বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন।

আবু তাহের ও খলিলুর আরও জানান, এই উদ্বেগের কথা তাঁরা দিল্লিতে অমিত শাহ এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছেও জানিয়েছেন। অর্থাৎ, মুর্শিদাবাদের স্থানীয় সমস্যা নিয়ে কেন্দ্রের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং রাজ্য সরকারের সঙ্গে সমান্তরাল ভাবে যোগাযোগ রাখার অবস্থানই তাঁরা তুলে ধরতে চাইছেন।

তবে রাজনৈতিক বার্তাটিও তাঁরা এড়িয়ে যাননি। তাঁদের বক্তব্য, সরকার জনস্বার্থে ভালো কোনও পদক্ষেপ করলে তাঁরা তা সমর্থন করবেন। কিন্তু মুর্শিদাবাদ বা রাজ্যের মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর কোনও অন্যায় বা আঘাত আসে—এমন কোনও পদক্ষেপের বিরোধিতা তাঁরা করবেন।

সব মিলিয়ে, দিল্লিতে মোদী-শাহের সঙ্গে বৈঠক এবং তার পরেই নবান্নে শুভেন্দুর সঙ্গে সাক্ষাৎ—দুই সাংসদের পরপর এই দুই পদক্ষেপ বাংলার রাজনীতিতে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। তবে শনিবারের সাংবাদিক বৈঠকে বিজেপিতে যোগদানের সম্ভাবনা সরাসরি উড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি এনসিপিআই-তে তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়েও কোনও চূড়ান্ত বার্তা দেননি আবু তাহের ও খলিলুর। ফলে তাঁদের পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপের দিকেই এখন নজর থাকবে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন