নজরবন্দি ব্যুরো: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে বৈঠকের পর এবার নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দেখা করলেন এনসিপিআই-এর দুই সাংসদ। শনিবার বেলায় নবান্নে পৌঁছন মুর্শিদাবাদের সাংসদ আবু তাহের খান এবং জঙ্গিপুরের সাংসদ খলিলুর রহমান। তাঁদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠক ঘিরে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে বাংলার রাজনীতিতে।
সূত্রের খবর, বৈঠকে মূলত মুর্শিদাবাদ জেলার বিভিন্ন সমস্যা এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (SIR) ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি দুই সাংসদ তাঁদের নিজ নিজ লোকসভা এলাকার একাধিক দাবি ও সমস্যার কথাও মুখ্যমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেছেন বলে জানা যাচ্ছে।
এসআইআর নিয়ে মুর্শিদাবাদে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া বিভিন্ন সমস্যা ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতরের ওয়েবসাইটেও ২০২৬ সালের SIR-এর ফাইনাল রোল, ডিলিশন লিস্ট, সাপ্লিমেন্টারি তালিকা এবং দাবি-আপত্তির তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে খলিলুর ও আবু তাহেরের শনিবারের নবান্ন-সাক্ষাৎ শুধুমাত্র প্রশাসনিক বিষয়েই সীমাবদ্ধ কি না, তা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তৃণমূলের একাধিক সাংসদের রাজনৈতিক অবস্থান ঘিরে যে টানাপড়েন চলছে, তার অন্যতম আলোচিত নাম এই দুই সাংসদ।
সম্প্রতি তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদদের একটি বড় অংশ এনসিপিআই-এর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই তালিকায় আবু তাহের খান এবং খলিলুর রহমানের নামও ছিল। পরে তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে একাধিক জল্পনা তৈরি হয়।
এই আবহেই দিল্লিতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁদের একাধিক সাক্ষাৎ তাৎপর্য পায়। রিপোর্ট অনুযায়ী, অমিত শাহের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি এনডিএ সাংসদদের প্রাতরাশ বৈঠকেও তাঁরা উপস্থিত ছিলেন। তবে এই উপস্থিতিকে সরাসরি বিজেপিতে যোগদানের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তাঁদের পক্ষ থেকে আগেই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল, দলীয় অবস্থান যাই হোক, নিজেদের নির্বাচনী এলাকার মানুষের স্বার্থে কেন্দ্র ও রাজ্য—দুই সরকারের সঙ্গেই প্রশাসনিক যোগাযোগ রাখা হবে।
আবু তাহের এবং খলিলুরের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাঁরা দু’জনেই মুর্শিদাবাদ জেলার গুরুত্বপূর্ণ লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে আবু তাহের খান মুর্শিদাবাদ এবং খলিলুর রহমান জঙ্গিপুর থেকে তৃণমূলের প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়েছিলেন।
তৃণমূলের অন্দরে তাঁদের ‘বেসুরো’ অবস্থান নিয়ে জল্পনা তৈরি হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল এনডিএ-ঘনিষ্ঠ সাংসদদের বিভিন্ন বৈঠকে তাঁদের উপস্থিতি এবং দলীয় সাংসদদের একটি পৃথক রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করার উদ্যোগ। যদিও প্রকাশ্যে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাঁরা ঘোষণা করেননি। বরং তাঁদের অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘ইস্যুভিত্তিক সহযোগিতা’ এবং নির্বাচনী এলাকার উন্নয়নের প্রশ্ন।
এর আগে শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসনিক বৈঠকেও বিভিন্ন দলের জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। সেই বৈঠকের পর খলিলুর রহমান প্রকাশ্যে দলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্যও করেছিলেন।
শনিবারের নবান্ন বৈঠকে এসআইআর প্রসঙ্গ সামনে আসার পিছনেও মুর্শিদাবাদের বাস্তব পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ভোটার তালিকার সংশোধন নিয়ে জেলার মানুষের মধ্যে যে প্রশ্ন বা সমস্যা তৈরি হয়েছে, সেগুলি প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে দেওয়াই দুই সাংসদের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বলে সূত্রের দাবি।
নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, SIR-এর আওতায় ভোটার তালিকায় নাম সংক্রান্ত দাবি, আপত্তি, সংযোজন ও বাদ পড়া নাম নিয়ে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের পোর্টালে SIR 2026-এর চূড়ান্ত তালিকা এবং সংশ্লিষ্ট নথিও প্রকাশিত হয়েছে।
রাজনৈতিক তাৎপর্যের দিক থেকে অবশ্য এই বৈঠকের অন্য একটি দিকও রয়েছে। দিল্লিতে মোদী-শাহের সঙ্গে যোগাযোগের পর একই সাংসদদের কলকাতায় ফিরে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক—এই ধারাবাহিকতা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলছে, তাঁদের পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থান কোন দিকে যাবে।
তবে আপাতত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সময় আসেনি। আবু তাহের খান এবং খলিলুর রহমানের নবান্ন-সাক্ষাৎকে তাঁদের রাজনৈতিক দলবদলের চূড়ান্ত ইঙ্গিত হিসেবে দেখার মতো প্রকাশ্য ঘোষণা এখনও নেই। বরং তাঁদের বক্তব্য এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক গতিবিধি থেকে যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হল—দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি নিজেদের লোকসভা এলাকার প্রশাসনিক ও জনস্বার্থের বিষয়কে সামনে রাখছেন তাঁরা।
মোদী-শাহের সঙ্গে বৈঠকের পর নবান্নে শুভেন্দুর সঙ্গে সাক্ষাৎ তাই আপাতত বাংলার রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। মুর্শিদাবাদে এসআইআর নিয়ে আলোচনা যত এগোবে, আর এনসিপিআই-এর সাংসদদের রাজনৈতিক অবস্থান যত স্পষ্ট হবে, ততই এই নবান্ন বৈঠকের প্রকৃত তাৎপর্যও পরিষ্কার হবে।



